ছোটাচ্চু যখন বাসায় ফিরে এল তখন বাসার সব বাচ্চারা তাকে ঘিরে ধরল, জিজ্ঞেস করতে লাগল, কী হয়েছে ছোটাচ্চু? কী হয়েছে বল।
ছোটাচ্চু মুখ শক্ত করে বলল, তোরা না আমাকে ত্যাজ্য ঢাঢ় করে দিয়েছিস—এখন আবার আমার সাথে কথা বলতে এসেছিস, তোদের লজ্জা করে না?
একজন বলল, আমরা তোমাকে মাফ করে দিয়ে আবার টাচু হিসেবে নিয়ে নিয়েছি।
তোরা নিলেই তো হবে না আমাকেও তো নিতে হবে। আমি এখনো নেই নাই। ছোটাচ্চু তার মুখটা শক্ত করে দাড়িয়ে রই।
বাচ্চারা তখন ছোট ছোট লাফ দিতে দিতে বলতে লাগল, প্লিজ ছোটাচ্চু! প্লিজ।
আগে বল আর কোনোদিন আমাকে গোলাম আযমের ভাতিজা বলে গালি দিবি?
দিব না।
কানে ধর।
সবাই কানে ধরে ফেলল, ছোটাচ্চুর কাছ থেকে এই ধরনের শাস্তি তাদের জন্যে কোনো বিষয়ই না। শুধু একজন মিনমিন করে বলল, আমরা এইগুলো করি তোমাকে লাইনে রাখার জন্যে। এইভাবে তোমাকে শাসন না করলে তুমি বেলাইনে চলে যাও তো—সেইজন্যে।
ছোটাচ্চু হুংকার দিল, আমি বেলাইনে যাই?
সবাই হিহি করে হাসতে লাগল বলে ছোটাচ্চু আর বেশিক্ষণ রেগে থাকার ভান করতে পারল না।
ছোটাচ্চু তখন আকবর হোসেনের বাসায় কী হয়েছে সেটা বাচ্চাদের বলল। যেটুকু বলল তার থেকে বেশি অভিনয় করে দেখালো। ডলি খালার নাকি কান্নার অভিনয়টা এতো ভালো হল যে, বাচ্চাদের অনুরোধে সেটা কয়েকবার করে দেখাতে হল।
সব বাচ্চারা চলে যাবার পর টুনি বলল, ছোটাচ্চু।
বল।
তুমি কি ছেলেটার বাসায় দরকারি কিছু পেয়েছ?
কিছু খাতাপত্র পেয়েছি।
ডাইরি কি আছে?
একটা ডাইরি আছে কিন্তু সেটা কোনো কাজে লাগবে না।
কেন?
ডাইরির মাঝে নিজের কোনো কথা নাই, শুধু বিজ্ঞানের কথা।
বিজ্ঞানের কথা?
ছোটাচ্চু বলল, হ্যাঁ। পড়ে আমি কিছু বুঝিও না।
টুনি বলল, তোমার বোবার কথা না। বিত্তানের কি দেখলে তোমার জুর উঠে যায়।
ছোটাচ্চু বলল, শুধু জ্বর না, কেমন যেন এলার্জির মতো হয়। চামড়ার মাঝে লাল র্যাশ বের হয়। মাথা ঘোরায়।
টুনি বলল, ঐ ছেলেটার খাতাটা আমাকে একটু দেখাবে?
তুই দেখে কী করবি? তুই কি কিছু বুঝবি?
তোমার থেকে বেশি বুঝব।
ছোটাচ্চু খাতাটা বের করে টুনিকে দিল, টুনি তখন পালিয়ে যাওয়া ছেলেটার ডাইরিটা খুটিয়ে খুটিয়ে পড়ল। ভিতরে নানারকম বিজ্ঞানের প্রশ্ন, যেমন এক জায়গায় লেখা, প্রোটন আর ইলেকট্রন একটা আরেকটাকে আকর্ষণ করে, তাহলে ইলেকট্রন কেন প্রোটনের ভিতরে পড়ে যায় না, কেন চার্জ বিহীন কিছু একটা তৈরি হয় না? কেন হাইড্রোজেন পরমাণু হয়ে থাকে? কেন?
আরেক জায়গায় লেখা, গতিশীল বস্তুর কাছে দৈর্ঘ্যকে সংকুচিত মনে হয়। তাহলে কি আলোর কাছে পুরো বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সংকুচিত হয়ে একটা দ্বিমাত্রিক সমতল ভূমি হয়ে যায়?
আরেক জায়গায় লেখা, পৃথিবী থেকে কয়টা ইলেকট্রন চাঁদে নিয়ে গেলে চাদ প্রবল আকর্ষণে পৃথিবীতে আছড়ে পড়বে?
খাতার অনেক পাতায় নানা রকম গণিত, গণিতের শেষে মাঝে মাঝে প্রশ্নবোধক চিহ্ন। মাঝে মাঝে আশ্চর্যবোধক চিহ্ন। মাঝে মাঝে গোল বৃত্ত একে তার মাঝে হাসি মুখের ছবি। টুনি কিছুই বুঝল না শুধু টের পেল এই ছেলেটা ছোটখাটো একটা বৈজ্ঞানিক এবং তার মনের মাঝে নানা ধরনের প্রশ্ন অনেক প্রশ্নের উত্তর সে খুঁজে পেয়েছে, অনেক প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পায়নি।
ছোটাচ্চু জিজ্ঞেস করল, কিছু বুঝলি?
উঁহু। মনে হচ্ছে এখানে অনেক রকম বিজ্ঞানের প্রশ্ন।
বিজ্ঞানের প্রশ্ন নিয়ে আমার কী লাভ? আমার দরকার তার ঠিকানা। তার নিজের সম্পর্কে তথ্য।
টুনি কিছু বলল না, ভুরু কুঁচকে খাতাটার দিকে তাকিয়ে রইল।
ছোটাচ্চু পরদিন সকাল থেকেই কাজে লেগে গেল। আকবর হোসেনের কাছ থেকে তার পালিয়ে যাওয়া ছেলে সুমনের বেশ কয়েকজন বন্ধুর নাম ঠিকানা ফোন নম্বর নিয়েছিল, ছোটাচ্চু একজন একজন করে তাদের সবাইকে খুঁজে বের করল, তাদের সাথে কথা বলল কিন্তু লাভ হল না। তারা কেউ সুমনের খোঁজ দিতে পারল না। একজন বলল, দুই সপ্তাহ আগে যখন দেখা হয়েছে তখন কথাবার্তা বলছিল না। চুপ করে বসে থাকত। মনে হয় কিছু একটা চিন্তা করত। পালিয়ে যাবে আমাদের কাউকে বলেনি।
আরেকজন বলল, আমাকে একদিন জিজ্ঞেস করেছিল, ভাত কেমন করে রান্না করতে হয় আমি জানি কি না! আমি বললাম তোর আম্মুকে কেন জিজ্ঞেস করিস না। সুমন বলল, উঁহু, আম্মুকে জিজ্ঞেস করা যাবে না!
আরেকজন বলল, সুমন কোথায় আমি জানি না। কিন্তু আমি যদি জানতামও আমি আপনাকে বলতাম না। সুমনের ফিজিক্স পড়ার এতো সখ অথচ তার আবু তাকে জোর করে ইঞ্জিনি বানাবে! তার আব্দুর একটা শিক্ষা হওয়া দরকার।
কাজেই ছোটাচ্চুর সারাদিন পরিশ্রম করে বেলা মোটামুটি বিধ্বস্ত হয়ে ফিরে এলো। রাত্রি বেলা ছোটা তার বিছানায় চিৎ হয়ে শুয়ে ছাদের দিকে তাকিয়ে গভীর মনোযোগ দিয়ে চিন্তা করছিল, একম সময় টুনি এসে হাজির হল, ছোটাচ্চু টুনির পায়ের শব্দ শুনে টুনির দিকে ঘুরে তাকাল। টুনি জিজ্ঞেস করল, সুমনের কোনো খোঁজ পেলে?
ছোটাচ্চু মাথা নেড়ে বলল, এখনো পাই নাই। তার বন্ধুরা হয় কিছু জানে না, না হলে আমাকে কিছু বলছে না।
টুনি কিছু না বলে চুপ করে বসে রইল। ছোটাচ্চু আবার একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, বুঝলি টুনি, কোনো কেস সলভ করার আগে একটা কু দরকার হয়। সেই কু দিয়ে শুরু করলে সেখান থেকে অন্য কু বের হয়ে আসে। সেখান থেকে অন্য কু। তখন কুতে বুনতে সয়লাব হয়ে যায়। কেস সলভ করা তখন পানির মতো সোজা হয়ে যায়।
