ছোটাচ্চু পুরোপুরি ভ্যাবাচেকা খেয়ে ডলি খালার দিকে তাকিয়ে রইল। এখানে যে ডলি খালা থাকবে আর তার এতো বড় সর্বনাশ করবে সেটা ছোটাচ্চু একবারও ভাবেনি। একজন মানুষ যে টানা এতোক্ষণ একভাবে কারো বিরুদ্ধে এতো খারাপ খারাপ কথা বলতে পারে, ছোটা নিজের চোখে না দেখলে সেটা বিশ্বাস করতো না। ছোটাচ্চু একবার ভাবল প্রতিবাদ করে কিছু একটা বলে, কিন্তু সে বুঝতে পারল বলে কোনো লাভ নেই, সে কখনোই এরকম তীব্র ভাষার বক্তব্যের ধারে কাছে যেতে পারবে না। দেখে কোটি কোটি মানুষ—তাদের ভিতরে একজন তাকে একটা কেস দিতে চাইছে কী কপাল, সেই মানুষটা কি না ডলি খালার পরিচিত। এর থেকে বড় ট্র্যাজেডি আর কী হতে পারে! ডলি খালার আক্রমণকে ঠেকানোর কোনো উপায় নেই। ছোটাচ্চু হাল ছেড়ে দিয়ে ডলি খালার দিকে তাকিয়ে, পরের আক্রমণের জন্যে অপেক্ষা করে রইল।
ডলি খালা ফোঁস ফোঁস করে কয়েকটা নিঃশ্বাস নিল, তারপর কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, বুঝলে দুলাভাই, যখন খবর পেয়েছি সুম হারিয়ে গেছে তখন আমার বুকটা ভেঙে গেছে। ছোটাচ্চু বুঝতে পারা সুমন নিশ্চয়ই আকবর হোসেনের পালিয়ে যাওয়া ছেলের নাম। আমরা সব জায়গায় সুমকে খুঁজে বেড়াচ্ছি তখন খবর পেলাম তুমি নাকি ইন্টারনেট থেকে ডিটেকটিভ এজেন্সি বের করে তাদেরকে লাগাচ্ছ, তখন আমি পাগলের মতো ছুটে এসেছি তোমাকে সাবধান করার জন্যে। এই ছেলে আমার সর্বনাশ করেছে তোমার যেন সর্বনাশ করতে না পারে। (এই সময় ডলি খালার গলা আবার ধরে এল, চোখ থেকে মনে হল দুই ফোঁটা পানিও বের হল।) ডলি খালা তখন উঠে দাঁড়িয়ে বলল, আমি গেলাম দুলাভাই, তুমি পরে আমাকে বলে না যে আমি তোমাকে সাবধান করি নাই। এই ছেলে আজকে গলায় টাই আর চোখে চশমা লাগিয়ে এসেছে, আসলে ভুসভুসে ময়লা টি শার্ট পরে ঘুরে বেড়ায়, চোখে নিশ্চয়ই জিরো পাওয়ারের চশমা। যে গাড়ি তাকে নামিয়ে দিয়েছে খোঁজ নিয়ে দেখো নিশ্চয়ই ভাড়া গাড়ি, না হলে কারো কাছ থেকে ম্যানেজ করেছে।
ছোটাচ্চু এখন এক ধরনের যুগ্ধ বিস্ময় নিয়ে ডলি খালার দিকে তাকিয়ে রইল। যখন বুঝে গেছে এখানে তার সর্বনাশ যা হবার তা হয়ে গেছে তখন
এই পুরো ব্যাপারটাকে একটা নাটক হিসেবে দেখে উপভোগ করা যেতেই পারে।
ডলি খালা ব্যাগ থেকে টিস্যু বের করে চোখ মুছতে মুছতে ঘর থেকে বের হয়ে গেল। ছোটাচ্চু লক্ষ করল চোখ মুছল খুব কায়দা করে যেন চোখের রং ল্যাপ্টে না যায়। একটু পরেই গাড়ির শব্দ শোনা গেল, বোঝা গেল ডলি খালা চলে গেছে।
আকবর হোসেন চুপচাপ কিছুক্ষণ বসে রইলেন, তারপর এক পায়ের উপর আরেক পা তুলে বসলেন। ছোটাচ্চুও তাই করল, তখন হঠাৎ মনে হল গলায় টাইটা ফাঁসের মতো আটকে আছে, নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে তাই তখন টাইয়ের নটটা প্রথমে একটু ঢিলে করল তারপর খুলেই ফেলল। আকবর হোসেন তখন এক পায়ের উপর তুলে রাখা অন্য পাটা সরিয়ে বসল, ছোটাচ্চুও তার পাটা সরিয়ে নিল। ছোটাচ্চুর তখন মনে হল সবকিছু মনে হয় ঝাপসা দেখা যাচ্ছে তখন জিরো পাওয়ারের চশমাটাও খুলে ফেলল। তার চশমা চোখে দেওয়ার অভ্যাস নেই তাই চশমাটা খুলতেই কানের উপর আর নাকের উপর থেকে চাপটা কমে গেল বলে মনে হল।
আকবর হোসেন একটু কেশে গলা পরিষ্কার করলেন, বললেন, ডলি যা যা বলেছে সব সত্যি?
ছোটাচ্চু কী বলবে একটু চিন্তা করল, তারপর বলল, অনেক কিছু সত্যি কিন্তু যেভাবে বলেছেন সেভাবে সত্যি না।
যদি সত্যি হয় তাহলে আমি তোমাকে দায়িত্বটা দিতে চাই।
ছোটাচ্চুর মনে হল সে কথাটা ঠিক করে শুনেনি। অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, কী বললেন?
বলেছি যে ডলির কথা সত্যি হলে আমি তোমাকে দায়িত্বটা দিতে চাই। তুমি করে বলছি দেখে কিছু মনে করোনি তো। তোমার টাই আর চশমা খোলার পর তোমাকে একটা বাচ্চা মানুষের মতোই লাগছে।
ছোটাচ্চু জোরে জোরে মাথা নাড়ল, বলল, না, না, কিছু মনে করি নাই। তুমি করেই তো বলবেন। আসলে ছোটাচ্চুকে অপরিচিত কোনো মানুয তুমি করে বললে সে খুব বিরক্ত হয়, এখন অবশ্যি অন্য ব্যাপার।
আকবর হোসেন আবার তার একটা পায়ের উপর আরেকটা পা তুলে বললেন, ডলির কথা যদি সত্যি হয় তাহলে তোমার এই ডিটেকটিভ এজেন্সি এখন একটা ব্যক্তিগত উদ্যোগ। আমি আসলে ঠিক এরকমই চাচ্ছিলাম, যে একটু সময় দেবে। আমার মনে হয় একটু সময় দিয়ে ঠিকভাবে খোঁজাখুঁজি করলেই সুমনকে বের করে ফেলা যাবে।
হঠাৎ করে ছোটাচ্চুর ভেতরে হুড় হুড় করে আত্মবিশ্বাস ফিরে আসতে শুরু করল। হাতে কিল দিয়ে বলল, অবশ্যই বের করে ফেলব।
আকবর হোসেন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, পাগল ছেলেটা কেমন যে আছে! আমার মতন হয়েছে, ছেলেটার মাথায় কিছু একটা ঢুকে গেলে আর বের করা যায় না।
আপনি চিন্তা করবেন না। আমরা—মানে আমি বের করে ফেলব। থ্যাংক ইউ শাহরিয়ার। তুমি কেমন করে অগ্রসর হতে চাও?
প্রথম ঘটনাটা আরেকটু বিস্তারিত বলেন, তারপর তার ঘরটা একটু দেখতে চাই। তার খাতাপত্র ডাইরি যদি থাকে সেগুলো একটা দেখতে চাই। তার বন্ধু বান্ধব যাদের আপনারা চিনেন, তাদের নাম ঠিকানা ফোন নম্বর যদি থাকে সেগুলো নিতে চাই। আপনাদের আত্মীয় স্বজন যাদের কাছে সে গিয়ে লুকিয়ে থাকতে পারে তাদের নাম ঠিকানা চাই। মোটামুটি এগুলো হলেই কাজ শুরু করে দিতে পারব।
গুড! আকবর হোসেন সোফায় হেলান দিয়ে বললেন, ঠিক আছে, আমি তাহলে শুরু করি। আকবর হোসেন তখন সবকিছু বলতে শুরু করলেন। ছোটা খুবই গম্ভীর ভাবে তার নোট বইয়ে মাঝে মাঝে কিছু কিছু কথাবার্তা টুকে নিতে লাগল।
