ওই পাশ থেকে আকবর হোসেন বললেন, ইট ইজ অলরাইট।
ফারিহা বলল, আপনার কেসটা প্রসেস করার জন্যে আমাদের একজন রিপ্রেজেনটিটিভের আপনার সাথে কথা বলা দরকার। কখন আপনি সময় দিতে পারবেন?
এখনই চলে আসতে পারেন। আমরা আসলে খুবই অস্থির হয়ে আছি।
ফারিহা বলল, আমি একটু দেখি আমাদের কেউ ফ্রি আছে কি না। তারপর ছোটাচ্চুর মুখের দিকে তাকিয়ে একটু হাসল একটু খুট খাট শব্দ করল, তারপর বলল, আই এম সরি মি. হোসেন। আজকে কেউ ফ্রি নেই। কাল বিকেলের আগে আসলে কেউ যেতে পারবে না।
ওই পাশের আকবর হোসেন একটু হতাশ হলেন। বললেন, ঠিক আছে তাহলে কাল বিকেলেই।
ফারিহা খুট-খাট শব্দ করে বলল, আমাদের সিস্টেমে যে ঠিকানা দিয়েছেন সেটা আপ টু ডেট তো?
জি। এটা আপ টু ডেট।
ভেরি গুড। কাল বিকেলে একজন যাবে।
কে আসবে? কী নাম?
এক সেকেন্ড, আমি দেখি কাল কে ফ্রি আছে। ফারিহা খুট-খাট একটু শব্দ করে বলল, আপনার কাছে যাবে মিস্টার শাহরিয়ার। এ ভেরি ইয়াং এনার্জেটিক চ্যাপ। অলরেডি সে দুটো কেস সলভ করেছে। আকবর হোসেন অন্য পাশ থেকে বললেন, থ্যাংক ইউ। কাল বিকেলে আমি মিস্টার শাহরিয়ারের জন্যে অপেক্ষা করব।
ফোনটা রেখে দেবার পর ছোটাচ্চু হাতে কিল দিয়ে বলল, ফ্যান্টাস্টিক। ফারিহা, তুমি না থাকলে যে আমার আলটিমেট ডিটেকটিভ এজেন্সির কী হত!
ফারিহা বলল, কথাটা মনে রেখো।
রাতে বিছানায় শুয়ে শুয়ে ছোটাচ্চু যখন গভীর মনোযোগ দিয়ে তার হলুদ বইটায় হারানো মানুষ কেমন করে খুঁজে বের করতে হয় সেটা পড়ছে, তখন টুনি এসে হাজির হল। ছোটাচ্চু বই থেকে মুখ তুলে জিজ্ঞেস করল, কী খবর টুনি?
তুমি হারিয়ে যাওয়া ছেলেটার বাবার কাছে কখন যাবে?
কালকে বিকেলে।
আমাকে নিয়ে যাবে?
তোর নিশ্চয়ই মাথা খারাপ হয়েছে। তুই ভাবছিস এটা টুম্পার টিফিন চুরির কেস?
টুনি কথাটা না শোনার ভান করে বলল, তুমি ইন্টারভিউয়ে কী জিজ্ঞেস করবে?
সেটা তোর জানার দরকার নাই।
ছেলেটার ফটো, ই-মেইল এড্রেস, ফেসবুক একাউন্ট এই সব নিয়ে এসো।
তোকে সেটা বলে দিতে হবে না। আমি জানি।
বন্ধু বান্ধবের নাম। ফোন নম্বর।
আমি জানি।
যদি ওর ডাইরি থাকে। চিঠিপত্র সেগুলো।
ছোটাচ্চু মেঘ স্বরে বলল, আমি জানি।
তুমি কেমন করে জান?
ছোটাচ্চু হাতের বইটা দেখিয়ে বলল, এই বইয়ে সব লেখা আছে।
টুনি বলল, বইটা আমাকে পড়তে দিবে।
ইংরেজি বই। পড়তে পারবি?
আস্তে আস্তে পড়ব। ডিকশনারি দেখে দেখে।
ছোটাচ্চু একটু নরম হল, বলল, ঠিক আছে।
টুনি যখন চলে যাচ্ছে ছোটাচ্চু তখন বলল, টুনি, শোন।
কী?
আমার চেহারার মাঝে কি একটা ডিটেকটিভ ডিটেকটিভ ভাব আছে?
না। তোমাকে দেখে স্কুলের বাচ্চার মতো লাগে।
তাহলে?
মোচ রেখে দাও। মোচ থাকলে বয়স্ক লাগে।
ছোটাচ্চু নিঃশ্বাস ফেলে বলল, কাল বিকালের মাঝে মোচ উঠবে না। তাছাড়া–
তাছাড়া কী?
ফারিহা যে গোঁফ দুই চোখে দেখতে পারে না ছোটাচ্চু সেটা আর বলতে পারল না। কথাটা এড়িয়ে বলল, তাহলে কি একটা টাই পরে যাব?
হ্যাঁ। টাই পরলে বয়স্ক লাগবে। আর চশমা।
আমার চোখ খারাপ না, চশমা কীভাবে পরব?
জিরো পাওয়ারের চশমা পাওয়া যায়।
পরদিন বিকালে ছোটাচ্চু ফারিহার ব্যবস্থা করা গাড়িতে জিরো পাওয়ারের চশমা আর টাই পরে আকবর হোসেনের বাসায় হাজির হল। ছোটাচ্চুর বুক ধুক ধুক করছে কিন্তু মুখের মাঝে একটা গাম্ভীর্য ধরে রেখে সে দরজার বেলে চাপ দিল। যে মানুষটি দরজা খুলে দিল। ছোটাচ্চু অনুমান করল সে নিশ্চয়ই আকবর হোসেন। চল্লিশ পয়তাল্লিশ বছর বয়স চেহারার মাঝে একটা সরকারি অফিসারের মতো ভাব। মানুষটা জিজ্ঞেস করল, শাহরিয়ার সাহেব?
ছোটাচ্চু তার চশমাটা ঠিক করে বলল, জি। আলটিমেট ডিটেকটিভ এজেন্সি থেকে এসেছি। আমাকে একটা এসাইনমেন্টের জন্যে পাঠানো হয়েছে।
আমি আকবর হোসেন, আপনার জন্যে অপেক্ষা করছি। আসেন। ভিতরে আসনে।
ছোটাচ্চু ভিতরে ঢুকল। ভিতরে একটা সোফা, সেই সোফায় একজন মহিলা বসে আছে। ছোটাচ্চুর ঘরে ঢোকার পর মহিলা ঘুরে তাকাল এবং তাকে দেখে ছোটাচ্চুর রক্ত হিম হয়ে গেল। মহিলাটি ডলি খালা—সেই ফর্সা নাদুস নুদুস চেহারা, সেই সিল্কের শাড়ি, সেই লিপস্টিক। চেহারাটা শুধু অন্যরকম, এখন একটা হিংস্র বাঘিনীর মতো। ছোটাচ্চুকে দেখেই ফেঁস করে নিঃশ্বাস ফেলে বলল, দুলাভাই! আমি যেটা সন্দেহ করেছিলাম তাই। এই সেই ছেলে। এর থেকে সাবধান।
ছোটাচ্চু কী করবে বুঝতে পারল না, একবার মনে হল একটা দৌড় দেয়, কিন্তু তার জন্যে দেরি হয়ে গেছে। ডলি খালা বলল, আমাদের জোবেদাবুর ছেলে। জোবেদাবু হচ্ছে ফিরেশতার মতো মানুষ। তার সব ছেলে মেয়ে মানুষ হয়েছে, এইটা ছাড়া (ডলি খালা এই সময় আঙুল দিয়ে ছোটাচ্চুকে দেখাল)। সব ছেলে মেয়ে বড় বড় চাকরি বাকরি করে আর ছোট ছেলের যা হয় তাই হয়েছে। টেনে টুনে পরীক্ষায় কোনোমতে পাস করেছে, কোনো চাকরি বাকরি পায় না তখন এই ডিটেকটিভগিরি শুরু করেছে। আমি যখন প্রথম শুনেছি তখন ভাবলাম ভালোই তো, সব দেশে থাকে আমাদের দেশে থাকবে না কেন? ও মা, খোঁজ নিয়ে আমার মাথা ঘুরে গেছে। বুঝলে দুলাভাই (ডলি খালা এই সময়ে আকবর হোসেনের দিকে তাকাল) এর ডিটেকটিভ এজেসি কী জান? এই ছেলে পকেটে একটা মোবাইল ফোন আর কয়েকটা বেআইনি সিম নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। আর কিছু নাই, কয়টা মেয়ে বন্ধু আছে তাদের দিয়ে মাঝে মধ্যে ফোন করায়। আমি সোজা সরল মানুষ (ডলি খালা এই সময় নিজের দিকে আঙুল দিয়ে দেখাল। আমার মেয়ের জন্যে জামাই খুঁজছি, এই ছেলেকে বিশ্বাস করে একটু খোঁজ খবর নিতে দিয়েছি। তখন তো বুঝি নাই তার কিছু নাই, ভেবেছিলাম আসলেই বুঝি অফিস আছে, লোকজন আছে, সরকারের পারমিশন আছে। সে আমার সর্বনাশ করে ছেড়ে দিয়েছে। সোনার টুকরা একটা ছেলে, আমেরিকা থেকে দেশে বিয়ে করতে এসেছে, তাকে এমন ভয় দেখালো। সেই ছেলে—(এই সময় ডলি খালার গলা ধরে এলো, ডলি খালা হেঁচকি তোলার মতো একটা শব্দ করল তারপর তার হতে পারতো জামাইয়ের সব ঘটনা স্মরণ করে কেমন যেন শিউরে উঠল।)
