এরকম অবস্থায় ইন্টারনেটে আপনার প্রতিষ্ঠানের খোঁজ পেয়ে যোগাযোগ করছি। অনুগ্রহ করে আমার ছেলেকে খুঁজে বের করে দিলে কৃতজ্ঞ থাকব। এ জন্যে প্রয়োজনীয় যে কোনো ফী দিতে আমি প্রস্তুত—
ছোটাচ্চু এতোটুকু পড়ে আনন্দে আবার চিৎকার করে উঠল, কিন্তু তাকে ঘিরে থাকা বাচ্চা কাচ্চারা সেই আনন্দে অংশ নিল না, সবাই শীতল চোখে ছোটাচ্চুর দিকে তাকিয়ে রইল। বাচ্চাদের মাঝে যে একটু বড় সে ঠাণ্ডা গলায় বলল, ছোটাচ্চু। এরকম একটা চিঠি পড়ে তোমার আনন্দ হচ্ছে? তুমি কি গোলাম আযমের ভাতিজা?
ছোটাচ্চু থতমত খেয়ে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, তখন আরেকজন বলল, আমরা তোমার সাথে আর কোনোদিন খেলব না। তুমি হচ্ছ হৃদয়হীন, নিষ্ঠুর।
আরেকজন বলল, তোমার বুকে নিশ্চয়ই লোম নাই।
বুকে লোম না থাকা কিংবা গোলাম আযমের ভাতিজা হওয়া এই ব্যাপারগুলোর মাঝে সম্পর্কটা ছোটাচ্চু পুরোপুরি ধরতে না পারলেও বিজ্ঞানী হতে চাওয়া ছেলেটার বাড়ি থেকে পালিয়ে যাবার ঘটনাটা শুনে তার আনন্দ প্রকাশ করাটা যে ঠিক হয় নাই সেটা বুঝতে পারল। ব্যাপারটা সামলানোর জন্যে বলল, আহা! আমি কি ছেলেটার বাড়ি ছেড়ে চলে যাবার জন্যে আনন্দ করছি? আমি আনন্দ করছি কারণ এখন আমি ছেলেটাকে খুঁজে বের করে বাসায় নিয়ে আসব, তখন সবাই কতো আনন্দ করবে সেই কথা চিন্তা করে।
ছোট একজন বলল, কচু।
তার থেকে একটু বড় একজন বলল, আলু ভর্তা।
তার থেকে আরেকটু বড় একজন বলল, শুটকি ভাজি।
বড় একজন বলল, আমরা তোমাকে ত্যাজ্য ঢাঢ় করলাম। তোমার সাথে এখন আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই। তারপর সেটা প্রমাণ না জন্যে সবাই লাইন ধরে বের হয়ে গেল। টুনি ছাড়া।
সবাই বের হয়ে গেলে টুনি ছোটাচ্চুর চেয়ারটায় বসে তার চশমাটা একটু ঠিক করে বলল, কাজটা ঠিক হয় নাই, কিন্তু আমি তোমাকে এইবারের মতো মাফ করে দিলাম।
ছোটাচ্চু ভ্যাবাচেকা খেয়ে বলল, মাফ করে দিলি? তুই? আমাকে?
হ্যাঁ। কেন বুঝতে পারছ তো?
কেন?
তোমার এখন সাহায্য দরকার। তা না হলে তুমি এই কেস সলভ করতে পারবে না।
আমি পারব না?
এইটা তোমার একটা সুযোগ। তাই ছোটাচ্চু, তোমার যদি কোনো সাহায্য লাগে তাহলে আমাকে বল। লজ্জা করো না।
ছোটাচ্চু টুনির কথাগুলো হজম করে চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, ঠিক আছে ম্যাডাম টুনি। আমার যখন সাহায্য লাগবে আমি আপনার কাছে আসব, লজ্জা করব না।
টুনি বলল, থ্যাংকু। তারপর সেও বের হয়ে গেল।
ঘণ্টা খানেক পর দেখা গেল ছোটাচ্চু ফারিহার সাথে কথা বলছে, গলার স্বর খুবই নরম আর কাঁচুমাচু। কথা শুরু হল এভাবে
ফারিহা, তোমাকে একটা বিশেষ দরকারে ফোন করছি।
বল। টাকা ধার দিতে হবে?
ছোটাচ্চু বলল, না না। টাকা ধার দিতে হবে না। অন্য একটা দরকার।
বল, কী দরকার।
ছোটাচ্চু কেশে একটু গলা পরিষ্কার করে বলল, আমি আমার প্রথম কেসটা পেয়েছি। আমার ওয়েব সাইটে একজন কেস ফাইল করেছে।
কংগ্রাচুলেশান।
এই ব্যাপারে তোমার হেল্প লাগবে।
ফারিহা ভয় পাওয়া গলায় বলল, তোমায় কেস সলভ করে দিতে হবে?
ছোটাচ্চু মাথা নেড়ে বলল, উঁহু। কেস আমি নিজেই সলভ করব—কিন্তু পার্টির কাছে যাবার ব্যাপারে হেল্প লাগবে।
গাড়ি দিতে হবে?
ছোটাচ্চু একটু লজ্জা পেয়ে বলল, বুঝতেই পারছ, ক্লায়েন্টের কাছে যদি একটা রিকশা না হয় একটা সি.এন.জি দিয়ে যাই, ক্লায়েন্ট গুরুত্ব দেবে না। অনেক বাসা আছে গাড়ি ছাড়া ঢোকাই যাবে না।
ঠিক আছে। কখন লাগবে বল—আব্দুকে বলে ম্যানেজ করে দিতে হবে। আর কিছু?
গাড়ি হচ্ছে একটা। বলতে পার সোজা বিষয়টা। তোমার আরেকটু সাহায্য লাগবে।
ফারিহা বলল, বল, কী সাহায্য?
বুঝতেই পারছ আমার আলটিমেট ডিটেকটিভ এজেন্সিতে আমি একা।
তোমাদের টুনি আছে। খুবই স্মার্ট মেয়ে। ছোটাচ্চু এদিক সেদিক তাকিয়ে দেখল, টুনি তার কথা শুনে ফেলল কি, তারপর বলল, কিন্তু টুনি তো বাচ্চা মেয়ে, তাকে তো আমার কাজে লাগাতে পারি না। তুমি যদি একটু সাহায্য কর।
ঝেড়ে কাশো। পরিষ্কার করে বল।
ছোটাচ্চু এবারে ঝেড়ে কাশল অর্থাৎ পরিষ্কার করে বলল, আমার ক্লায়েন্টের সাথে তুমি যদি একটু কথা বল। ভান করো তুমি আলটিমেট ডিটেকটিভ এজেন্সির সেক্রেটারি। টিশ টাশ করে একটু ইংরেজি বাংলা মিশিয়ে কথা বলবে। একটু এপয়েন্টমেন্ট করবে। প্রফেশনাল একটা ভাব দেখাবে–
আমাকে কী দেবে?
তুমি কী চাও?
ফারিহা এবারে হেসে ফেলল, তোমার দেবার মতো কী আছে?
আউল ফাউল কয়টা সিম আছে। লাগলে দিতে পারি।
থাক। আমার নিজের টেলিফোনের যন্ত্রণাতেই বাঁচি না। এখন যদি আউল ফাউল সিমের যন্ত্রণা শুরু হয়, তাহলেই গেছি।
তাহলে কী চাও?
প্রথম বিল পেয়ে আমাকে দোলা খাইয়ে দিও। খুব ভালো একটা দোসার দোকান হয়েছে। ভয় পেয়ো না, বেশি বিল উঠবে না!
ছোটাচ্চু বলল, আমি মোটেই ভয় পাচ্ছি না।
সেদিন বিকেলেই ফারিহা ছোটাচ্চুর কাছে চলে এল। ছোটাচ্চু তাকে টেলিফোন নম্বর দিয়ে কী বলতে হবে বুঝিয়ে দিল। ফারিহা নাম্বারটা ডায়াল করে টেলিফোন কানে লাগায়, দুটো রিং হওয়ার পরই কেউ একজন ফোনটা ধরে বলল, হ্যালো।
ফারিহা জিজ্ঞেস করল, মিস্টার হোসেন? আকবর হোসেন?
কথা বলছি।
হায়! আমি আলটিমেট ডিটেকটিভ এজেন্সি থেকে বলছি। আমাদের ডাটাবেসে আপনার একটা এনট্রি হয়েছে। আই এম সরি আপনার সাথে যোগাযোগ করতে দেরি হল। আমরা সাধারণত আরো তাড়াতাড়ি যোগাযোগ করি, আনফরচুনেটলি লাস্ট ফিউ ডেজ হঠাৎ করে কাজের চাপ বেড়ে গেছে।
