তখন একজন একটু ভয়ে ভয়ে বলল, ছোটাচ্চু কিন্তু তোমার ওয়েব সাইটের রংটা ভালো হয় নাই। দেখলে মনে হয় ইনফেকশান হয়ে গেছে।
ছোটাচ্চু তখন আরো জোরে ধমক দিয়ে বলে, ইনফেকশান? ওয়েবসাইটের আবার ইনফেকশান হয় কেমন করে?
কেমন যেন ঘা হয়ে গেছে মনে হয়।
ছোটাচ্চু হুংকার দিয়ে বলে, আমার সাথে ইয়ারকী করিস, ওয়েব সাইটের ঘা হয়েছে মনে হয়?
আলাপ আরো এগিয়ে যেতো কিন্তু টুনি পুরো ব্যাপারটাতে ঠাণ্ডা পানি ঢেলে দেয়, আস্তে আস্তে বলে, ওয়েব সাইট ভালো না খারাপ তাতে কিছু আসে যায় না। আসল কথা হচ্ছে কেস আসছে কি-না।
তখন সবাই ছোটাচ্চুর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে, ছোটাচ্চু, কেস কি আসছে?
ছোটাচ্চু তখন একটু আমতা আমতা করে বলে, মানে এখনো সেভাবে আসতে শুরু করেনি। লোকজন খোঁজ খবর নিচ্ছে। ভালো করে একবার প্রচার করতে পারলে তখন দেখবি কেস নিয়ে কুল পাব না।
একজন বলল, তুমি যদি কেস সলভ করো তাহলে প্রচার হবে।
আরেকজন বলল, প্রচার হলে তোমার কাছে কেস আসবে।
জ্ঞানী টাইপের একজন বুঝিয়ে দিল, কেস হচ্ছে মুরগি আর প্রচার হচ্ছে ডিম। মুরগি আগে না ডিম আগে?
যারা হাজির ছিল তাদের অর্ধেক চিৎকার করতে লাগল, ডিম! ডিম! অন্য অর্ধেক চিৎকার করতে লাগল, মুরগি! মুরগি। ছোটাচ্চু তখন দুই দলকেই ধমক দিয়ে তার ঘর থেকে বের করে দিল।
প্রত্যেকদিন মোটামুটি একই রকম ঘটনা, তার মাঝে একদিন একটা অসাধারণ ঘটনা ঘটে গেল, ছোটাচ্চু ঘুম থেকে উঠে তার ওয়েব সাইটে ঢুকে দেখল, একজন সেখানে তার জন্যে একটা লম্বা চিঠি লিখে লিখেছে, যে ফর্মটা রাখা আছে তার সবকিছু ঠিক ঠিক ভাবে পূরণ করেছে। যেখানে ঠিকানা লেখার কথা সেখানে ঠিকানা লিখেছে, যেখানে টেলিফোন নম্বর লেখার কথা সেখানে টেলিফোন নম্বর লিখেছে, যেখানে সমস্যার বর্ণনা দেয়ার কথা সেখানে সমস্যার বর্ণনা দিয়েছে। ছোটাচ্চু একবার পড়ল তারপর দুইবার পড়ল তারপর তিনবার পড়ল তারপর আনন্দে চিৎকার করে উঠল, ইয়া হু উ উ উ…!
বাসার বাচ্চা কাচ্চারা যে যেখানে ছিল সেখান থেকে ছুটে এল। একজন জিজ্ঞেস করল, কী হয়েছে ছোটাচ্চু?
ছোটাচ্চু তার বুকে থাবা দিয়ে বলল, তোরা ভেবেছিলি আমার ওয়েব সাইটে কোনোদিন কেস আসবে না। এই দেখ কেস এসে গেছে। হান্ড্রেড পার্সেন্ট খাটি কেস।
একজন জিজ্ঞেস করল, কী কেস ছোটাচ্চু? মার্ডার? সিংগেল না ডাবল?
ছোটাচ্চু বলল, না মার্ডার না। কিন্তু মার্ডার থেকেও জটিল। সবাই জিজ্ঞেস করতে শুরু করল, কী কে? কী কেস? ছোটাচ্চু বলল, ঠিক আছে, শোন তাহলে, আমি পড়ে শোনাই।
ছোটাচ্চু তখন তার ইনফেকশান ওয়ালা ওয়েব সাইট থেকে চিঠিটা পড়ে শোনাতে আরম্ভ করল।
মহোদয়
আমি একজন সরকারি কর্মকর্তা, যথেষ্ট উচ্চ পদে আছি। আমি একটা বিশেষ বিপদে পড়ে আপনার শরণাপন্ন হয়েছি। আমাদের দেশে প্রাইভেট ডিটেকটিভ এজেন্সি আছে আমার জানা ছিল না, জেনে খুব খুশি হয়েছি।
প্রথমে আমার পরিবার সম্পর্কে বলি। আমি, আমার স্ত্রী এবং আমার দুই ছেলে মেয়ে নিয়ে আমার সংসার।
আমার স্ত্রী একটি বেসরকারি ব্যাংকে চাকরি করেন। আমার মেয়ে অষ্টম শ্রেণীর ছাত্রী, আমার ছেলে ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা দিয়েছে। আমার সমস্যাটি আমার ছেলেকে নিয়ে।
আমার ছেলে এবং মেয়ে দুজনেই মেধাবী ছাত্রছাত্রী। আমার ছেলে একাধিকবার বিভিন্ন গণিত অলিম্পিয়াডে মেডেল পেয়েছে। গণিত এবং বিজ্ঞান তার খুবই প্রিয় বিষয়। আমি আপনাদের এজেন্সির সাথে যোগাযোগ করছি আমার ছেলের সমস্যা নিয়ে।
আমি সবসময়েই স্বপ্ন দেখেছি আমার ছেলে একজন বড় ইঞ্জিনিয়ার হবে। একটি ভালো ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার জন্যে সে প্রস্তুতি নিবে। কিন্তু কোনো একটি অজ্ঞাত কারণে আমার ছেলে ইঞ্জিনিয়ার হতে চায় না, সে একজন বিজ্ঞানী হতে চায়। যখন ছোট ছিল আমি ভেবেছি এটা তার একটা ছেলেমানুষী স্বপ্ন। কিন্তু যখন ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা দিয়ে ঘোষণা দিল সে ইঞ্জিনিয়ারিং কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা দেবে না, সে বিজ্ঞানী হতে চায় তাই কোনো একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থ বিজ্ঞান পরীক্ষা দিয়ে ভর্তি হবে। তখন তার সাথে আমার এক ধরনের গোলমাল শুরু হয়। প্রথমে আমি তাকে বোঝানোর চেষ্টা করি, সে বুঝতে রাজি না হওয়ায় আমি বাধ্য হয়ে তাকে শাসন করা শুরু করি। কথাবার্তার এক পর্যায়ে আমি তাকে বলি যেহেতু সে আমার উপার্জনে আমার বাসায় আছে তাই তাকে আমার কথা শুনতে হবে। সে যদি স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে চায় তাহলে তাকে আমার বাসা থেকে বের হয়ে নিজের খরচ নিজেকে উপার্জন করতে হবে।
আমি রাগের মাথায় কথাটি বলেছিলাম কিন্তু আমার ছেলে সেটি আক্ষরিকভাবে নিয়েছে এবং দুই সপ্তাহ আগে বাসা থেকে বের হয়ে গেছে। তার নিজের ল্যাপটপ ছাড়া সে আর কিছুই সাথে নেয় নাই।
বাস্তব জীবনে পুরোপুরি অনভিজ্ঞ আমার ছেলে দুই একদিনের মাঝেই চলে আসবে বলে আমার ধারণা ছিল কিন্তু আজ প্রায় দুই সপ্তাহ হল সে ফিরে আসেনি এবং সম্ভাব্য অসম্ভাব্য সকল জায়গায় তাকে খুঁজে আমরা ব্যর্থ হয়েছি। আমি এখন আমার ছেলের নিরাপত্তার কথা ভেবে দুশ্চিন্তিত। আমার স্ত্রী খুব ভেঙে পড়েছেন এবং পারিবারিক ভাবে আমি অত্যন্ত বিপদগ্রস্ত। আমার মেয়েটিও আমার সাথে কথা বলা প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে।
