রেশমা খপ করে ইশতিয়াকের বুকের কাপড় ধরে ফেলল, তারপর ডান হাতটা ওপরে তুলল এবং টুনি বুঝতে পারল পরের মুহূর্তে হাতটা নেমে আসবে আর সে দেখবে যেখানে ইশতিয়াকের মাথাটা থাকার কথা সেখানে কিছু নেই!
ছোটাচ্চু চোখ বন্ধ করে বিড়বিড় করে বলল, হে খোদা! তুমি রক্ষা করো। আর মনে হলো খোদা ছোটাচ্চুর কথা শুনলেন। ইশতিয়াক হাসান হঠাৎ ঝাপটা মেরে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে উল্টোদিকে একটা দৌড় দিল। রেশমাও হুংকার দিয়ে তার পিছু পিছু ছুটতে লাগল। ইশতিয়াক ছুটতে ছুটতে একটা বুটিকের দোকানের এক দিক দিয়ে ঢুকে সমস্ত জামাকাপড় ছিটকে ফেলে অন্যদিকে বের হয়ে গেল, পেছনে পেছনে হুংকার দিতে দিতে রেশমাও গেল। বুটিকের দোকান থেকে বের হয়ে একটা খেলনার দোকান, সেখানকার সবকিছু ছিন্নভিন্ন করে একটা জুতার দোকান। সবাই দেখল জুতো-স্যান্ডেল উড়ে উড়ে যাচ্ছে, তার ভেতর দিয়ে একজন সুদর্শন যুবক ছুটে যাচ্ছে, পিছু পিছু লাল শাড়ি পরা একটা মেয়ে। শাড়ি-স্যান্ডেল পরে থাকার কারণে রেশমার একটা বিশাল অসুবিধা, তাই ইশতিয়াক হাসান একটা কম্পিউটারের দোকানে ঢুকে মাউস কি-বোর্ড উড়িয়ে অন্য দিক দিয়ে কোনোভাবে বের হয়ে মানুষের ভিড়ের মাঝে অদৃশ্য হয়ে গেল। শুধু তার একটা জুতো পা থেকে খুলে রয়ে গেল। রেশমা সেই জুতোটা হাতে নিয়ে হিংস্রভাবে সেটার দিকেই তাকিয়ে রইল।
টুনি বলল, ছোটাচ্চু, তুমি এখন তাকাতে পারো। ঘটনা শেষ।
ছোটাচ্চু জিজ্ঞেস করল, কেউ কি মারা গেছে?
না।
গুরুতর আহত?
না। হাত পা লিভার কিডনি এ রকম কিছু কি পড়ে আছে?
না। শুধু একটা জুতো।
ছোটাচ্চু তখন ভয়ে ভয়ে চোখ খুলল, শপিং মলের বিভিন্ন দোকান লণ্ডভণ্ড হয়ে আছে, এখানে-সেখানে বিস্মিত মানুষের জটলা। তার মাঝে রেশমা ইশতিয়াকের এক পাটি জুতো নিয়ে ফিরে আসছে। তাকে দেখে কেউ বুঝতেই পারবে না কিছু একটা হয়েছে।
ছোটাচ্চু ফিসফিস করে বলল, চল পালাই।
টুনি বলল, চলো।
ছোটাচ্চু গলা আরও নামিয়ে বলল, রেশমা আমাকে দেখে ফেললে কিন্তু কিছু একটা সন্দেহ করবে। তাহলে খবর আছে। বুঝেছিস?
বুঝেছি। কিন্তু–
কিন্তু কী?
আমি রেশমা আপুর একটা অটোগ্রাফ নিতে চাচ্ছিলাম।
ছোটাচ্চু ভয় পেয়ে বলল, আজকে না। আরেক দিন। আমি তোকে এনে দেব।
ঠিক তো?
ঠিক। খোদার কসম?
খোদার কসম। ছোটাচ্চু তখন টুনির হাত ধরে তাকে টেনে বের করে নিয়ে এল।
ডলি খালার কাছে ছোটাচ্চু তার আলটিমেট ডিটেকটিভ এজেন্সির পক্ষ থেকে রিপোর্ট পাঠিয়েছিল—বিলসহ।
ডলি খালা বিল তো দিলই না, উল্টো ছোটাচ্চু আর তার ডিটেকটিভ এজেন্সির ওপর ভয়ানক খেপে গেল। পারলে কাঁচা খেয়ে ফেলে। কারণটা কী, ছোটাচ্চু এখনো বুঝতে পারেনি।
শুধু ডলি খালার মেয়ে ছোটাচ্চুর কাছে দুই শব্দের একটা এসএমএস পাঠিয়েছে। শব্দ দুটি হলো থ্যাংক ইউ।
ছোটাচ্চু আপাতত এই শব্দ দুইটাই তার আলটিমেট ডিটেকটিভ এজেন্সির প্রথম উপার্জন হিসেবে ধরে নিয়েছে।
০৬. প্রত্যেকদিন সকালবেলা
প্রত্যেকদিন সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে ছোটাচ্চুর প্রথম কাজ হচ্ছে তার ওয়েব সাইটে ঢুকে দেখা, কেউ তার আলটিমেট ডিটেকটিভ এজেন্সিতে তার জন্যে কোনো কেস দিয়েছে কি-না। প্রায় দিনই কিছু না কিছু থাকে কিন্তু সেগুলো দেখে ছোটাচ্চুর মেজাজ গরম হয়ে যায়! যেরকম একদিন একজন লিখেছে।
তোমার কামের অভাব হইছে? রংবাজী কর?
ছোটাচ্চু কিছুতেই বুঝতে পারে না, সে যদি একটা ডিটেকটিভ এজেন্সি খুলে তাতে অন্য মানুষের সমস্যা কী? সবচেয়ে বড় কথা প্রশ্নটা যদি সত্যিই সে করতে চায় শুদ্ধ বাংলায় করলে কী দোষ হতো?
আরেকদিন আরেকজন লিখল।
আমার হৃদয় চুরি গিয়েছে। কে আমার হৃদয় হরণ করেছে খুঁজে বের করে দিতে পারবেন?
এটা শুদ্ধ ভাষায় লেখা ছিল কিন্তু তারপরেও ছোটাচ্চুর মেজাজ খুবই খারাপ হল। সবচেয়ে মেজাজ গরম হয় যখন কেউ তার কাজ করার ক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন করে। যেমন একদিন একজন লিখল।
তুমি ডিটেকটিভ বানান করতে পারবা যে ডিটেকটিভ এজেন্সি খুলছ?
ছোটাচ্চু অবশ্যি তার এই চিঠিপত্রগুলো কাউকে দেখায় না। যখন বাসার ছেলেমেয়েরা আশে পাশে থাকে তখন বড় বড় কথাবার্তা বলে। তার প্রিয় বক্তৃতাটা সাধারণত এরকম হয় আমরা এখন একটা ক্রান্তিকালে আছি। সবকিছু হবে ভারচুয়াল জগতে সে জন্যেই তো এই অসাধারণ ওয়েব সাইটটা তৈরি করেছি।
তখন ত্যাঁদড় শান্ত বা অন্য কেউ একজন বলে, এটা অসাধারণ কেমন করে হল? দুনিয়ায় সব ওয়েব সাইটই তো এরকম।
ছোটাচ্চু মুখ গম্ভীর করে বলে, তুই জানিস, এই ওয়েব সাইটটা কে তৈরি করেছে?
বাচ্চারা জিজ্ঞেস করে, কে?
একজন সুপার জিনিয়াস। তাকে গুগলে চাকরির অফার দিয়েছে সে নেয় নাই। ফেসবুক তার পিছনে পিছনে ঘুরে, সে পাত্তা দেয় না। মাইক্রোসফট দিনে দুইবার ফোন করে সে ফোন ধরে না।
যারা ছোট তারা ব্যাপারটা খুব ভালো করে বুঝতে না পারলেও ছোটাচ্চুর গম্ভীর মুখ দেখে তারা মুগ্ধ হয়ে যাবার ভঙ্গি করে মাথা নাড়ে। শুধু শান্ত বলে, এতো বড় জিনিয়াস হলে সে বসে বসে ওয়েব সাইট কেন তৈরি করে? আমাদের ক্লাসের ফাকুও তো ওয়েব সাইট বানায়।
ফান্ধু নামের স্কুলের একজন ছাত্রের সাথে এতো বড় জিনিয়াসের তুলনা করার জন্যে ছোটাচ্চু খুব রেগে গেল, ধমক দিয়ে বলল, যেটা বুঝিস না সেটা নিয়ে কথা বলবি না।
