চারটে বাজতে এখনো দশ মিনিট বাকি। ছোটাচ্চু টুনিকে নিয়ে একটা ফাস্ট ফুডের দোকানের বাইরে রাখা টেবিলে বসেছে। টুনি একটা আইসক্রিম খাচ্ছে, ছোটাচ্চু খাচ্ছে ব্ল্যাক কফি। কফিটা তেতো, খেতে বিস্বাদ, পোড়া কাঠের মতো গন্ধ, প্রত্যেকবার চুমুক দেওয়ার পর ছোটাচ্চু মুখটা বিকৃত করছে, কিন্তু তার পরও খেয়ে যাচ্ছে। টুনি আইসক্রিমের একটা কোনা কামড় দিয়ে বলল, ফারিহা আপু এখনো আসে নাই।
কোনো একটা কারণে ছোটাচ্চুর মনটা একটু খারাপ, সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে দার্শনিকের মতো বলল, বুঝলি টুনি, তোকে আর কী বলব, তুই তো। সবই জানিস। আমি হচ্ছি অকাজের মানুষ। সবাই লেখাপড়া করে হাইফাই চাকরি করে, গলায় টাই লাগিয়ে অফিসে যায়, বড় বড় কাজ করে, তার চেয়ে বড় বড় কথা বলে। ইংরেজি আর বাংলা মিলিয়ে। আমি কিছুই করি না। আমার ফ্রি থাকার জায়গা আছে, ফ্রি খাওয়ার জায়গা আছে, তাই কোনো চিন্তা নাই। আমি তোদের জন্য ছাগল রং করে দিই। প্ল্যানচেট করে তোদের জন্য ভূত নামাই। মায়ের রাজাকার টাইপের খালাতো ভাইকে ভয় দেখাই। ডিটেকটিভ এজেন্সি খুলি—তোর কি মনে হয় কোনো মেয়ে আমাকে বিয়ে করবে? ছোটাচ্চু টুনির উত্তরের জন্য অপেক্ষা করল না, নিজেই বলল, করবে না। বুদ্ধিসুদ্ধি আছে এ রকম কোনো মেয়ে আমাকে বিয়ে করবে না। করা উচিৎ না। কিন্তু–
ছোটাচ্চু তার বিদঘুটে কালো কফিতে চুমুক দিয়ে মুখ বিকৃত করে বলল, কিন্তু ফারিহার কথা আলাদা। লেখাপড়ায় ভালো, চেহারা ভালো, খুবই স্মার্ট, বুদ্ধিমতী, বাইরে থেকে বোঝা যায় না, কিন্তু আসলে মনটা খুবই নরম। এই রকম একটা মেয়ে আমাকে মনে হয় পছন্দই করে। আমি যদি বলি, মনে হয় আমাকে বিয়ে করতে রাজি হয়ে যাবে। অনেক টাকা বেতনে চাকরি করবে, আমাকে খাওয়াবে, তোদের সাথে হইচই করবে।
ছোটাচ্চু আবার তার কালো বিদঘুটে তিতকুটে কফিতে চুমুক দিয়ে মুখ বিকৃত করে বলল, কিন্তু আমি ফারিহাকে কিছু বলতে পারি না। কেন জানিস?
কেন?
ভয়ে।
টুনি অবাক হয়ে বলল, ভয়ে? ফারিহা আপুকে তোমার ভয় করে?
হ্যাঁ। করে। কারণটা কী জানিস?
কী?
ফারিহার মতো ডেঞ্জারাস মানুষ আমি জন্মেও দেখি নাই। তার মাথার মধ্যে যে কী ভয়ংকর প্ল্যান কাজ করে তুই চিন্তাও করতে পারবি না।
টুনি চোখ বড় বড় করে বলল, ফারিহা আপু ডেঞ্জারাস?
হ্যাঁ। যেমন ধর আজকের ব্যাপারটা। ফারিহা ওই পাঁজি মানুষটাকে এইখানে তার সাথে দেখা করতে বলেছে। ফারিহা বলেছে সে লাল শাড়ি, সবুজ ব্লাউজ, লাল টিপ, চুলে বকুল ফুল লাগিয়ে এখানে আসবে। সে এসেছে? না, আসে নাই। কিন্তু লাল শাড়ি, সবুজ ব্লাউজ, লাল টিপ আর চুলে বকুল ফুল লাগিয়ে কেউ কি এসেছে? হ্যাঁ এসেছে।
এসেছে? টুনি চমকে উঠে বলল, কোথায়?
ওই যে বইয়ের দোকানের সামনে। ফারিহা নিজে না এসে ওই মেয়েটাকে পাঠিয়েছে। মেয়েটাকে আমি চিনি। মেয়েটার নাম রেশমা। সিক্স ডিগ্রি ব্ল্যাকবেল্ট। তায়কোয়ান্দোতে। তায়কোয়ান্দো কী জানিস? কারাতের মতো, কিন্তু হাতের সাথে সাথে তারা সমানভাবে পা চালাতে পারে।
টুনির চোখ বড় বড় হয়ে উঠল। ছোটাচ্চু বলল, এখন বুঝেছিস ঠিক চারটার সময় কী হবে? বেকুব মানুষটা রেশমাকে এসে বলবে, তোমাকে দেখতে তেঁতুলের মতো লাগছে। তারপর কী হবে? ছোটাচ্চু কেমন যেন শিউরে উঠল, তারপর কুচকুচে আলকাতরার মতো কফিটার পুরোটা এক টোকে খেয়ে ফেলে মুখটা বিকৃত করে বসে রইল। খানিকক্ষণ পর ফোঁস করে একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, মাস খানেক আগে একজন ছিনতাইকারী রেশমার ব্যাগ ধরে টান দিয়েছিল, রেশমা তাকে ধরে এমন ধােলাই দিয়েছে যে সে এখনো হাসপাতালে। কয়দিন আগে একটা ইভ টিজার রেশমাকে টিটকারি দিয়ে কী একটা বলেছিল, তারপর কী হলো জানিস?
কী?
সেই ইভ টিজারের হাতটা ধরে রেশমা এমন মোচড় দিয়েছে যে তার ডান হাতটা সকেট থেকে খুলে বের হয়ে এসেছে। আরেকদিন স্কুলে যাচ্ছিল কয়েকটা মেয়ে, লোকাল মাস্তানরা সেই মেয়েদের ইভ টিজিং করেছে, তারপর কী হয়েছে জানিস?
কী হয়েছে?
রেশমা মাস্তানদের কী করেছে কে জানে, কিন্তু সবগুলোর ঘাড় পাকাঁপাকিভাবে বাঁকা হয়ে গেছে। এখন সোজা সামনের দিকে মাথা আটকে থাকে, ডানে-বাঁয়ে ঘোরাতে পারে না।
ছোটাচ্চু পুরো দৃশ্যটা কল্পনা করে কেমন যেন শিউরে উঠে বলল, এই মেয়ে খালি হাতে যেকোনো মানুষকে মার্ডার করে ফেলতে পারে। রেশমা সবচেয়ে বেশি ঘেন্না করে ইভ টিজারদের। এখন যখন ইশতিয়াক রেশমাকে বলবে তাকে দেখে তার তেঁতুলের কথা মনে পড়ছে, তখন অবস্থাটা কী হবে কল্পনা করতে পারিস?
টুনি এমনভাবে মাথা নাড়ল যেটা হ্যাঁ বা না দুটোই হতে পারে। ছোটাচ্চু অনেক লম্বা একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, এখন তুই বল, ফারিহা থেকে ডেঞ্জারাস কোনো মেয়ে বাংলাদেশে আছে? এই রকম ভয়ংকর প্ল্যান আর কেউ করতে পারবে?
টুনি বলল, না।
ছোটাচ্চু হঠাৎ চমকে উঠে বলল, ওই যে ইশতিয়াক হাসান বেকুবটা এগিয়ে যাচ্ছে রেশমার দিকে। কী সর্বনাশ! কী ভয়ংকর! হায় খোদা, তুমি রক্ষা করো।
ছোটাচ্চু ভয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলল। ছোটদের সাহস বেশি হয়, তাই টুনি তাকিয়ে রইল। সে দেখল, ইশতিয়াক হাসান মুখে একটা ভ্যাবলা টাইপের হাসি ফুটিয়ে রেশমার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। রেশমার কাছে গিয়ে তার কানের একেবারে কাছে মুখ নিয়ে সে কিছু একটা বলল। তখন রেশমা ঝট করে ঘুরে ইশতিয়াক হাসানের দিকে তাকাল। দেখতে দেখতে রেশমার চেহারাটা কেমন যেন বাঘিনীর মতো হয়ে গেল। টুনি এর আগে কখনো বাঘিনী দেখেনি, কিংবা কখনো কোনো মানুষকেও চোখের সামনে বাঘিনীর মতো হয়ে যেতে দেখেনি! ব্যাপারটা যদি ঘটে তাহলে নিশ্চয়ই এভাবে ঘটবে! টুনি দেখল রেশমা দাঁতে দাঁত ঘষে কিছু একটা বলে ইশতিয়াক হাসানের দিকে এগোতে থাকে আর দেখতে দেখতে ইশতিয়াক হাসানের চেহারাটা কেমন যেন উঁদুরের মতো হয়ে গেল। তার চোখ ফ্যাকাশে হয়ে যায়, নিচের ঠোঁট নড়তে থাকে আর জিবটা বের হয়ে আসে।
