ফারিহা হি হি করে হাসল, বলল, এর জন্য তুমি রাগ করছ কেন? সব সময়ই তো ভদ্রমহিলাদের সাথে সুন্দর করে কথা বলার নিয়ম। মেয়েদের একটু সম্মান করা উচিত না?
ছোটাচ্চু বলল, এই লোকের ডলি খালার মেয়ের সাথে বিয়ে ঠিক হয়েছে, এখন কেন সে তোমার সাথে মিষ্টি মিষ্টি কথা বলবে? হ্যা?
ফারিহা হাসি থামিয়ে বলল, কী মুশকিল! একজনের সাথে বিয়ে ঠিক হয়েছে বলে আরেকজনের সাথে কথা বলতে পারবে না? সে তো আমাকে ফোন করে নাই, ফোন করেছি আমি। আমি তো নিজ থেকে ফোন করি নাই, তুমি বলেছ তাই ফোন করেছি। এখন রাগ করছ কেন?
ছোটাচ্চু কী একটা বলতে যাচ্ছিল ঠিক তখন ফারিহার হাতে ধরে থাকা ফোনটা বেজে উঠল। এটা ছোটাচ্চুর বিখ্যাত আউল-ফাউল সিম, এর নম্বর কেউ জানে না। এইমাত্র ইশতিয়াক হাসানকে করা হয়েছে তাই শুধু ইশতিয়াক হাসানই এই নম্বরটা জানে। নিশ্চয়ই ইশতিয়াক হাসান ফোন করেছে। সবাই চোখ বড় বড় করে ফোনটার দিকে তাকিয়ে রইল। ফারিহা ছোটাচ্চুর দিকে তাকিয়ে বলল, কী করব? ফোন ধরব?
ছোটাচ্চু মুখ শক্ত করে বলল, ইচ্ছে হলে ধরো। আরও একটু মিষ্টি মিষ্টি কথা শোনো। মিষ্টি মিষ্টি কথা বলো।
ফারিহা ফোনটা ধরল, হ্যালো।
হ্যাঁ, এইমাত্র আপনার সাথে কথা বলছিলাম না?
হ্যাঁ। এইমাত্র কথা বলেছি।
টেলিফোনটা রেখে আমার কী মনে হলো জানেন?
কী মনে হলো?
মনে হলো স্টক মার্কেট নিয়ে আপনার সাথে সামনাসামনি একটু কথা বললে কেমন হয়?
সামনাসামনি?
ইশতিয়াক হাসান সত্যি সত্যি মিষ্টি মিষ্টি করে বলল, হ্যাঁ, ধরেন দুইজনে কোথাও বসে একটু কথা বললাম। একটু চা-কফি খেলাম।
চা-কফি?
হ্যাঁ।
ফারিহা কিছুক্ষণ চোখ বড় বড় করে ফোনটার দিকে তাকাল, তারপর ছোটাচ্চুর দিকে তাকাল, তারপর টুনির দিকে তাকাল। ছোটাচ্চু আর টুনিও ফারিহার দিকে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে, সে কী বলে শোনার জন্য অপেক্ষা করে আছে।
ফারিহা বলল, হ্যাঁ, সেটা তো খেতেই পারি। কিন্তু ধরেন আপনাকে তো আমি চিনি না, তাই আপনার সম্পর্কে আমার তো একটু জানা দরকার। আপনি কি বিয়ে করেছেন?
না, বিয়ে করিনি।
তাহলে কি বিয়ের কথাবার্তা হচ্ছে?
না না, এখন বিয়ের কোনো কথাবার্তা হচ্ছে না। সে জন্যই তো মন মেজাজ ভালো না। সেই জন্যই তো আপনার সাথে কথাবার্তা বলতে চাই। হে হে হে।
ফারিহার চোখ আরও বড় হয়ে গেল, ছোটাচ্চু হাত দিয়ে ইশতিয়াক হাসানকে খুন করে ফেলার ভঙ্গি করল। হাত দিয়ে ইঙ্গিত করল যেন টেলিফোনটা রেখে দেয়। ফারিহা টেলিফোনটা রাখল না বরং গলার স্বরে অনেক আনন্দের ভাব ফুটিয়ে বলল, তাহলে তো দেখা করাই যায়। চা কফি খাওয়াই যায়। কোথায় দেখা করব বলুন।
আপনি বলুন। আমি তো বিদেশে থাকি, এখানে কোথায় কী আছে ভালো করে চিনি না।
ফারিহা বলল, ঠিক আছে, ধানমণ্ডি এলাকায় নতুন একটা শপিং মল হয়েছে, খুব সুন্দর, সেখানে আসেন বিকেল চারটায়। ঠিকানাটা বলছি, তার আগে আপনাকে বলে দিই আমাকে খুঁজে বের করবেন কীভাবে। আমি লাল শাড়ি পরে আসব, সবুজ ব্লাউজ আর লাল টিপ। চুলে থাকবে বেলিফুল।
ইশতিয়াক হাসান আনন্দে আটখানা হয়ে গেল, বলল, গুড, গুড ভেরি গুড। ফ্যান্টাস্টিক।
ফারিহা বলল, আরও সহজ করে দিই। একটা পাসওয়ার্ড ঠিক করে নিই। আপনি বলবেন, তোমাকে দেখে আমার তেঁতুলের কথা মনে পড়ছে।
তেঁতুল? ইশতিয়াক হাসান, একটু অবাক হয়ে বলল, তেঁতুল কেন বলব?
ফারিহা বলল, পাসওয়ার্ডের তো কোনো মাথামুণ্ডু থাকে না। এটাও সে রকম, একটা কথার কথা। ঠিক আছে?
ঠিক আছে।
ফারিহা বলল, এবার ঠিকানাটা বলে দিই। তারপর ফারিহা ঠিকানাটা বলে দিল, নিচ তলায় কোথায় সে অপেক্ষা করবে সেটাও ইশতিয়াক হাসানকে বলে দিল।
টেলিফোনটা রাখার পর ছোটাচ্চু মেঘস্বরে বলল, এইসবের মানে কী?
কোন সবের? তুমি এই বদমাইশ লোকের সাথে দেখা করতে চাচ্ছ কেন?
ফারিহা বলল, যে মানুষ বিদেশ থেকে এসেছে বিয়ে করার জন্য, বিয়ে ঠিক হয়েছে, তার পরও সেটা গোপন করে অন্য মেয়ের সাথে চা-কফি খেতে চায়, তার চেহারাটা একটু দেখার ইচ্ছে করছে।
ছোটাচ্চু বলল, তুমি লাল শাড়ি পরে চুলে বেলিফুল লাগিয়ে এর সাথে দেখা করতে যাবে-কাজটা ঠিক হচ্ছে?
ফারিহা বলল, জানি না। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে বলল, আমি যাই। শাড়ি-ব্লাউজ ইস্ত্রি করতে হবে। তুমি চাইলে চারটার সময় ধানমণ্ডির মলে আসতে পারো।
আমি? ছোটাচ্চুর মুখ শক্ত হয়ে গেল, আমি কেন যাব? তুমি সেজেগুজে চা-কফি খেতে যাচ্ছ, আমি সেখানে গিয়ে কী করব?
ফারিহা বলল, ঠিক আছে—না যেতে চাইলে নাই। তারপর ঘর থেকে বের হতে হতে বলল, তুমি তোমার রিপোর্টটা ঠিক করে লেখো। মানুষটা ড্রাগস খায় না, টাকাপয়সার লোভ নাই, মনে হয় চেহারা ভালো,
স্মার্ট, খুব সুন্দর করে কথা বলে, কিন্তু–
কিন্তু কী?
কিন্তু এই লোকের সাথে মেয়ে বিয়ে দেওয়া ঠিক নয়।
ফারিহা চলে যাওয়ার পর ছোটাচ্চু খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে টুনিকে বলল, টুনি, তোকে একটা কথা জিজ্ঞেস করি?
করো।
আমার এই বন্ধু ফারিহাকে তোর কেমন লাগে?
খুবই ভালো লাগে। ফারিহা আপু হচ্ছে সুপার ডুপার। ফ্যান্টাস্টিক।
ও। ছোটাচ্চু আবার চুপ করে গেল।
টুনি বলল, ছোটাচ্চু।
উ।
তুমি আজকে বিকেলে ধানমণ্ডির মলে আমাকে নিয়ে যাবে?
ছোটাচ্চু কিছুক্ষণ টুনির দিকে তাকিয়ে থাকল, তারপর একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, ঠিক আছে।
