ছোটাচ্চু বলল, এখনো হয় নাই। এখন যে কেসটা নিয়ে কাজ করছি, সেটা ঠিক করে করতে পারলে আমাদের প্রথমবার একটা ইনকাম হবে।
ফারিহা বলল, দিনে পাঁচশ টাকা করে সিএনজি ভাড়া দিলে অবশ্যি ইনকাম শেষ পর্যন্ত থাকবে কি না দেখো।
ছোটাচ্চু মুখটা ভোঁতা করে মাথা নাড়ল। ফারিহা জিজ্ঞেস করল, কেসটা কী?
একজন মানুষ আমেরিকা থেকে এসেছে, তার সাথে মেয়ের বিয়ে দেবে। মেয়ের মা জানতে চাইছে ছেলেটা ভালো না বদ।
ফারিহা মুখটা সুচালো করে খানিকক্ষণ বসে রইল, তারপর বলল, এটা তো রীতিমতো জটিল কেস। সেই লোকটার আগে-পিছে কিছু জানো?
না।
তাহলে কীভাবে বের করবে? সেই লোকটাকে যারা চেনে, তাদের কাছে তোমার যেতে হবে। তাদের চেনো?
না।
লোকটা কোথায়, কবে লেখাপড়া করেছে জানো?
না।
কোথায় চাকরি করে জানো? না।
ফারিহা হতাশভাবে মাথা নেড়ে বলল, তাহলে তুমি কেমন করে বের করবে? ওর পেছনে পেছনে সিএনজি দিয়ে ঘুরে বেড়ালে জানতে পারবে? কিছুই জানতে পারবে না। কোনোদিন বের করতে পারবে না।
টুনি বলল, আমার একটা আইডিয়া আছে।
অন্য যেকোনো সময় হলে বড়দের কথার মাঝখানে কথা বলার জন্য ছোটাচ্চু নিশ্চয়ই টুনিকে একটা রামধমক দিত। এখন ফারিহার সামনে সেটা দিল না, শুধু মুখটা কঠিন করে ভুরু কুঁচকে বলল, কী আইডিয়া?
লোকটা যদি খারাপ কিছু করে তাহলে সে খারাপ। তাকে খারাপ একটা কিছু করতে বলে দেখো, সে রাজি হয় কি না। যদি রাজি হয়, তাহলে বুঝতে পারবে যে লোকটা আসলে খারাপ।
ফারিহা হাতে কিল দিয়ে বলল, ওয়ান্ডারফুল। তারপর দুই হাত ওপরের দিকে ছুঁড়ে দিয়ে বলল, স্টিং অপারেশন।
টুনি স্টিং অপারেশন মানে কী বুঝতে পারল না, কিন্তু কিছু জিজ্ঞেস করল না। ছোটাচ্চু ভুরু কুঁচকে টুনির দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর বলল, তুই বলছিস, আমরা ইশতিয়াক হাসানের ওপর স্টিং অপারেশন চালাব?
স্টিং অপারেশন মানে কী পুরোপুরি না বুঝলেও টুনি একটু আন্দাজ করতে পারল, তাই সে মাথা নাড়ল।
ফারিহা বলল, ব্রিলিয়ান্ট আইডিয়া। তোমার এখন সিএনজি করে এই লোকের পেছন পেছন সারা ঢাকা শহর ঘুরে বেড়াতে হবে না। লোকটাকে
শুধু কয়েকটা খারাপ খারাপ অফার দিতে হবে। দিয়ে দেখো সে অফারগুলো নেয় কি না।
ছোটাচ্চু মাথা চুলকিয়ে বলল, খারাপ অফার? আমি দেব?
হ্যাঁ। মনে করো তার কাছে ইয়াবা বিক্রি করার চেষ্টা করলে সে যদি কিনতে রাজি হয়, তার মানে ড্রাগ অ্যাডিক্টেড।
ছোটাচ্চুকে খুব উৎসাহী মনে হলো না, মাথা চুলকিয়ে বলল, আমি তার কাছে ইয়াবা বিক্রি করতে যাব আর ওই লোক যদি ধরে আমাকে পুলিশে দিয়ে দেয়? আমেরিকার ডিম-গোশত খেয়ে তার ইয়া ইয়া মাসল।
ফারিহা বলল, তুমি কি সত্যি সত্যি বিক্রি করবে নাকি? ফোনে অফার দেবে।
ছোটাচ্চু এবারে একটু উৎসাহী হলো। মাথা নেড়ে বলল, হ্যাঁ, সেটা করা যেতে পারে। আউল-ফাউল সিম দিয়ে ফোন করলে ট্র্যাক করতে পারবে না।
ফারিহা সোজা হয়ে বসে বলল, করো ফোন?
এখন?
হ্যাঁ, এখন। দেরি করে লাভ কী?
ছোটাচ্চু একটু ইতস্তত করছিল কিন্তু ফারিহা শুনল না। বাধ্য হয়ে ছোটাচ্চু তার ফোনে আউল-ফাউল সিম ঢুকিয়ে ফোন করার জন্য রেডি হলো। চোখের কোনা দিয়ে একবার টুনির দিকে তাকাল, বোঝাই যাচ্ছে টুনির সামনে ছোটাচ্চু ঠিক কথা বলতে চাইছে না, কিন্তু টুনি নড়ল না। বরং আরেকটু এগিয়ে গিয়ে ফারিহার পাশে গঁাট হয়ে বসে গেল।
ফারিহা বলল, লাউড স্পিকার অন দাও, আমরাও শুনি তোমার মক্কেল কী বলে।
ছোটাচ্চু সেটাও করতে চাচ্ছিল না, কিন্তু টুনি বুঝতে পারল, ফারিহা যেটাই বলে, ছোটাচ্চুকে সেটাই শুনতে হয়। তাই লাউড স্পিকার অন করে ছোটাচ্চু টেলিফোনে ডায়াল করল এবং একটু পরই প্রথমে খুট করে শব্দ হলো, তারপর ভারী একটা গলার স্বর শোনা গেল, হ্যালো।
ছোটাচ্চু বলল, হ্যালো।
অন্য পাশ থেকে এবার বেশ বিরক্ত হয়ে বলল, হ্যালো।
ছোটাচ্চুর কী হলো কে জানে। আবার বলে ফেলল, হ্যালো।
টেলিফোনের অন্য পাশ থেকে মানুষটি এবারে মহাখাপ্পা হয়ে বলল, আপনার সমস্যাটা কী? সারাদিন কি হ্যালো হ্যালো করবেন, নাকি কে ফোন করেছেন, কাকে ফোন করেছেন, কেন ফোন করেছেন, সেগুলো বলবেন?
ছোটাচ্চু এবার নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, বলব, অবশ্যই বলব। বলার জন্যই তো ফোন করেছি।
তাহলে বলে ফেলেন তাড়াতাড়ি।
ছোটাচ্চু বলল, আমি আপনাকে ফোন করেছি একটা অফার দিতে।
কিসের অফার? আমি এই দেশে থাকি না, আমার কেনাকাটা করার কিছু নাই।
এটা কেনাকাটার অফার না। ছোটাচ্চু গলায় মধু ঢেলে বলল, এটা হচ্ছে জীবনকে কানায় কানায় উপভোগ করার অফার।
টেলিফোনের অন্য পাশের মানুষটা এবার মনে হয় একটু রেগে উঠল, বলল, আমার জীবন উপভোগ করার জন্য আপনার কোনো অফারের দরকার নেই।
আহ-হা, এত অস্থির হচ্ছেন কেন। আগে একটু শুনেই নেন অফারটা কী।
বলেন তাড়াতাড়ি।
আমার কাছে ইয়াবার একটা ফ্রেশ চালান এসেছে। মার্কেট প্রাইস প্রতি বড়ি চারশ টাকা। আমি আপনাকে তিনশ টাকায় দেব। পাইকারি রেট। এক নম্বর ইয়াবা।
মানুষটা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, ইয়াবা জিনিসটা কী?
ছোটাচ্চু একটু থতমত খেয়ে গেল, যে মানুষ ইয়াবা চেনে না, তার সাথে এখন কেমন করে কথা বলবে? একটু ইতস্তত করে বলল, ইয়াবা হচ্ছে একধরনের ড্রাগস।
অন্য পাশের মানুষটা হঠাৎ করে ছোটাচ্চুকে থামিয়ে দিয়ে বলল, দাঁড়ান। এক সেকেন্ড দাঁড়ান।
