ফোন করিয়ে জেনে নিয়েছিস? মনে হলো ছোটাচ্চু কথাটা বুঝতেই পারছে না।
হ্যাঁ, ডলি খালা জানতে চাইল, আরও কিছু লাগবে নাকি। আমি বললাম, একটা ফটো হলে ভালো হয়। তোমার ডলি খালা ইশতিয়াক হাসানের একটা ছবি তোমার ই-মেইলে পাঠিয়ে দিয়েছেন।
সত্যি?
হ্যাঁ।
এত সহজে?
টুনি কথা না বলে একটু কাঁধ ঝাঁকালো। ছোটাচ্চুর বিধ্বস্ত ভাবটা কেটে তখন তার মধ্যে একটু উৎসাহ ফিরে এল। ছোটাচ্চু দাঁড়িয়ে ঘরের এই মাথা থেকে অন্য মাথায় হেঁটে গেল, তারপর বলল, ঠিকানাটা দে দেখি, আমি ইশতিয়াকের বাসাটা দেখে আসি।
টুনি বলল, যদি যেতেই চাও, তাহলে ই-মেইলে ছবিটা দেখে যাও, তা হলে তো তুমি চিনতেই পারবে না।
ঠিক বলেছিস। বলে ছোটাচ্চু তার স্মার্টফোনটা টেপাটেপি শুরু করল।
ছোটাচ্চু সত্যিকারের ঠিকানাটা দিয়ে খুব সহজেই বাসাটা খুঁজে বের করে ফেলল। ধানমণ্ডিতে একটা দোতলা বাসা। বাসার সামনে লেখা, কুকুর হইতে সাবধান। কাজেই ভেতরে যাওয়ার কোনো প্রশ্নই আসে না। বাসাটার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সম্ভব না, তাই সে একবার হেঁটে গিয়ে আবার হেঁটে ফিরে এল। তারপর একটু দূরে একটা টংয়ের সামনে গিয়ে পায়েসের মতো এক কাপ ঢা খেল। তারপর আবার বাসার সামনে দিয়ে হেঁটে গেল—এভাবে কতবার হেঁটে যেতে হবে, কে জানে। কেউ যদি তাকে লক্ষ করে, তাহলে নিশ্চয়ই মনে করবে, তার কোনো একটা বদ মতলব আছে। ছোটাচ্চু আবার যখন বাসার সামনে দিয়ে হেঁটে ফিরে এল, তখন হঠাৎ বাসার গেট খুলে সাদা রঙের একটা গাড়ি বের হয়ে এল, গাড়ির পেছনে একজন মানুষ বসে আছে, দেখেই ছোটাচ্চু চিনতে পারল, মানুষটা ইশতিয়াক হাসান।
ছোটাচ্চু কী করবে বুঝতে পারল না, গাড়ির পেছনে পেছনে সে তো আর দৌড়াতে পারে না। গাড়ি তো এক্ষুনি হুশ করে বের হয়ে যাবে। ছোটাচ্চুর কপাল ভালো ঠিক তখন কোথা থেকে জানি একটা খালি সিএনজি হাজির হলো। ছোটাচ্চু হাত দেখাতেই সেটা থেমে গেল। ছোটাচ্চু কোনো কথা না বলে লাফ দিয়ে সিএনজির ভেতরে উঠে বলল, চলেন।
সিএনজির ড্রাইভার অবাক হয়ে বলল, কোথায়?
সামনে। ওই যে সাদা গাড়িটা, তার পেছনে।
গাড়ির পেছনে কেন যেতে হবে? আপনি কই যাবেন, আপনি জানেন না?
না। জানি না। ওই গাড়িতে যে আছে, সে জানে।
তাহলে আপনি ওই গাড়িতে কেন গেলেন না? গাড়িতে তো জায়গা আছে।
ছোটাচ্চু বিরক্ত হয়ে বলল, কথা কম বলে আপনি স্টার্ট দেন দেখি।
সিএনজির ড্রাইভার আরও বিরক্ত হয়ে বলল, আপনার মতলবটা কী? একটা গাড়ির পেছনে পেছনে কেন যেতে চান? আপনি কি হাইজ্যাকার নাকি?
আমি কেন হাইজ্যাকার হব? ওই গাড়িতে যে মানুষটা আছে, সে কোথায় যায়, আমার জানা দরকার।
কেন?
কারণ, আমি একজন ডিটেকটিভ।
সিএনজির ড্রাইভারের মুখে এবারে বিশাল একটা হাসি ফুটল। সে বলল, আপনি টিকটিকি, সেটা তো আগে বলবেন।
আমি টিকটিকি বলি নাই।
বলেন নাই তো কী হইছে। আমরা আপনাগো টিকটিকি বলি। বলে সিএনজির ড্রাইভার দূরে প্রায় অদৃশ্য হয়ে যাওয়া গাড়িটার পেছনে পেছনে রওনা দিল। যেতে যেতে সে ছোটাচ্চুর সাথে বিশাল একটা গল্প জুড়ে দিল, এই রকম আরেকবার একজন টিকটিকিকে নিয়ে সে কীভাবে বিশাল এক সন্ত্রাসীকে ধাওয়া করেছিল, তার রোহমর্ষক গল্প।
ইশতিয়াকের গাড়ি ধানমণ্ডি থেকে আজিমপুরের একটা বাসা, সেখান থেকে মতিঝিলের একটা অফিস, সেখান থেকে ট্রাফিক জ্যামের ভেতর দিয়ে বনানীর একটা দোকান, সেখান থেকে আরও কঠিন ট্রাফিক জ্যামের ভেতর দিয়ে যখন উত্তরার দিকে রওনা দিল, তখন ছোটাচ্চু হাল ছেড়ে দিল। প্রথমত ইশতিয়াক হাসানের কাজকর্মে কোনো সন্দেহজনক কিছু নেই, দ্বিতীয়ত সিএনজির ড্রাইভার এতক্ষণে কত টাকা ভাড়া হয়েছে, সেটা যখন ছোটাচ্চুকে
জানাল, তখন ছোটাচ্চু বুঝতে পারল, তার নেমে যাওয়ার সময় হয়েছে।
রাত্রিবেলা টুনি যখন ছোটাচ্চুর খোঁজ নিতে গেল, সে দেখল ছোটাচ্চু খুব মনমরা হয়ে বিছানায় পা তুলে বসে আছে। টুনি জিজ্ঞেস করল, কী খবর, ছোটাচ্চু?
ইশতিয়াক হাসানকে ফলো করেছিলাম। কিন্তু—
কিন্তু কী?
কিন্তু কতক্ষণ ফলো করব। কত টাকা সিএনজি ভাড়া হয়েছে। জানিস?
কত?
ছয়শ টাকা চেয়েছিল। অনেক দরদাম করে পাঁচশ টাকা দিয়ে এসেছি।
টুনি চোখ কপালে তুলে বলল, পাঁচশ টাকা?
ছোটাচ্চু মনমরা হয়ে বলল, হ্যাঁ। এত টাকা কোথা থেকে দেব? আমি পিছু পিছু ঘুরে বেড়াচ্ছি, আর সে যদি কিছু না করে, তাহলে আমার কী লাভ? মানুষজন এত বোরিং কেন? তারা কিছু করে না কেন? যত্তসব।
টুনির মাথায় একটা আইডিয়া এসেছিল, কিন্তু ছোটাচ্চুর মেজাজ দেখে সেটা এখন আর বলল না। কাল ছুটির দিন আছে সকালবেলা বললেই হবে।
সকালবেলা ছোটাচ্চুর ঘরে গিয়ে দেখে, ছোটাচ্চুর মেজাজ খুব ভালো। তার কারণ, ছোটাচ্চুর ক্লাসের মেয়ে ফারিহা তার সাথে দেখা করতে এসেছে। ফারিহা মাঝেমধ্যেই আসে, তাই তার সাথে এই বাসার অনেক বাচ্চাকাচ্চারই পরিচয় আছে। টুনিকে দেখে ফারিহা মুখ হাসি হাসি করে বলল, কী খবর ডিটেকটিভ টুনি? তোমাদের আলটিমেট ডিটেকটিভ এজেন্সির কাজ কেমন চলছে?
টুনি কোনো উত্তর না দিয়ে মুখটা একটু হাসি হাসি করে দাঁড়িয়ে রইল, উত্তর দিল ছোটাচ্চু। বলল, বেশি ভালো না। কালকে সিএনজি ভাড়া দিয়েছি পাঁচশ টাকা।
ফারিহা চোখ কপালে তুলে বলল, পাঁচশ টাকা? তোমার টাকাপয়সা বেশি হয়েছে?
