ছোটাচ্চু অবশ্যি সটকে পড়তে পারল না, শিস শুনে দাদি তাকে ডাকল, এই শাহরিয়ার, কই যাস? ভিতরে আয়।
ছোটাচ্চু তাই মুখ কাঁচুমাচু করে ভেতরে ঢুকল। ঘরের ফাক দিয়ে নাদুসনুদুস মহিলাটাকে যতটা ভয়ংকর মনে হচ্ছিল, ভেতরে ঢুকে বুঝতে পারল মহিলাটা আরও ভয়ংকর। তার কারণ, মহিলাটি ফরসা, পরনে সিল্কের শাড়ি আর শরীরে নানা রকম গয়না। ঠোঁটে দগদগে লাল লিপস্টিক।
দাদি মহিলাটাকে বললেন, এই যে ডলি, এইটা আমার ছোট ছেলে শাহরিয়ার।
ডলি নামের মহিলাটা ন্যাকুনাকু গলায় বলল, ও মা! এত বড় হয়েছে, শেষবার যখন দেখছি, তখন নাক দিয়ে সর্দি ঝরত—মনে আছে?
কার মনে থাকার কথা ছোটাচ্চু বুঝতে পারল না। তাই ছোটাচ্চু মুখে একটা গাধা টাইপের হাসি ফুটিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। দাদি ছোটাচ্চুকে বললেন, এই যে তোর ডলি খালা। ডলিদের পুরো ফ্যামিলি আমাদের খুব কাছের মানুষ।
ছোটাচ্চু মনে মনে বলল, কাছের মানুষ না কচু। মুখে বলল, ও আচ্ছা। হা হ্যাঁ। জি জি।
ডলি নামের ভদ্রমহিলা বলল, তুমি এখন কী করো?
ছোটাচ্চু বলল, এই তো পরীক্ষার রেজাল্ট দিয়েছে। কিছু একটা করার প্ল্যান করছি। ছোটাচ্চু বুঝতে পারল এ রকম নাদুসনুদুস টাইপের মহিলারা আসলে ডিটেকটিভ এজেন্সির ব্যাপারটা বুঝতেই পারবে না। তাই সে কী শুরু করেছে, সেটা বলার ঝুঁকি নিল না।
দাদি বলল, তোর ডলি খালার মেয়ের বিয়ে, তার খবর দিতে এসেছে।
ছোটাচ্চু মনে মনে বলল, খবর দিতে এসেছে তো খবর দিয়ে চলে যাও কেন? বসে থাকার কী দরকার? মুখে বলল, ও আচ্ছা, তাই নাকি? ভেরি গুড। ভেরি গুড।
ডলি খালা বলল, বিয়ে এখনো ফাইনাল হয় নাই। কথাবার্তা চলছে।
ছোটাচ্চু মনে মনে বলল, ফাইনাল হয় নাই তো সেমিফাইনাল শুরু করে দাও। মুখে বলল, ও আচ্ছা। হুঁ হুঁ। হাউ নাইস!
ডলি খালা বলল, ছেলে আমেরিকা থাকে। বিয়ে করার জন্য দেশে এসেছে। মেয়ে খুঁজছে।
ছোটাচ্চু মনে মনে বলল, মেয়ে আবার খোঁজে কেমন করে? মেয়েরা কি কোরবানির গরু নাকি যে বাজারে বাজারে খুঁজবে? মুখে বলল, আচ্ছা। হাউ নাইস! চমকার!
দাদি বলল, ডলি, বিয়ের কথা পাকাঁপাকি করার আগে ছেলে সম্পর্কে ভালো করে খোঁজ নাও। ছেলে আমেরিকা থাকলেই কিন্তু বিয়ের যোগ্য হয় না।
ডলি খালা বলল, হ্যাঁ, খোঁজ নিচ্ছি।
দাদি বলল, আমি শুনেছি, এক ছেলে আমেরিকা থাকে, লেখাপড়া জানা ইঞ্জিনিয়ার জেনে মেয়ে বিয়ে দিয়েছে। আমেরিকা গিয়ে আবিষ্কার করেছে, ছেলে ভোররাতে ঘুম থেকে উঠে রাস্তা ঝাড় দেয়।
ছোটাচ্চু বলল, হয়তো ঝাড়ু ইঞ্জিনিয়ারিং।
দাদি ধমক দিল। বলল, ইয়ার্কি করবি না আমার সাথে।
ছোটাচ্চু বলল, আমি মোটেই ইয়ার্কি করছি না।
আজকাল সবকিছুর ইঞ্জিনিয়ারিং বের হয়ে গেছে। ভোটের সময় রীতিমতো ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং হয়, শোনো নাই?
ডলি খালা বলল, ছেলে দেখতে-শুনতে ভালো। ফ্যামিলিও ভালো। ছেলের আত্মীয়স্বজন-পরিচিতদের কাছে খোঁজ নিয়েছি।
আত্মীয়স্বজনেরা তো ঠিক খবর দেবে না। দাদি বলল, অন্যদের কাছে খোঁজ নাও।
ডলি খালা বলল, বুবু, অন্য কার কাছে খোঁজ নেব? আমাদের দেশে তো আর এসবের জন্য প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটর নাই।
দাদির তখন হঠাৎ করে ছোটাচ্চুর ডিটেকটিভ এজেন্সির কথা মনে পড়ল। ছোটাচ্চুর দিকে তাকিয়ে বলল, কেন? তুই না ডিটেকটিভ এজেন্সি দিয়েছিস। তুই খোঁজ নিয়ে দিতে পারবি না?
ডলি খালা অবাক হয়ে ছোটাচ্চুর দিকে তাকিয়ে বলল, তাই নাকি? তোমার ডিটেকটিভ এজেন্সি আছে?
ছোটাচ্চুর তখন বলতেই হলো, জি। আমি একটা ডিটেকটিভ এজেন্সি খুলেছি। মনে হয়, দেশের প্রথম প্রাইভেট ডিটেকটিভ এজেন্সি।
ডলি খালা চোখ বড় বড় করে বলল, বাহ্! কী চমৎকার! সেই দিনের বাচ্চা ছেলের এখন নিজের প্রাইভেট এজেন্সি? কংগ্রাচুলেশন।
ছোটাচ্চু প্রশংসা শুনে একটু নরম হলো। ডলি খালা মানুষটাকে তার এখন বেশ বুদ্ধিদীপ্ত আর আধুনিক মানুষ মনে হতে লাগল। ঠোঁটের লিপস্টিকটাও তখন আর বেশি দগদগে মনে হল না। ডলি খালা বলল,
তোমরা কী করো? কীভাবে কাজ করো?
ওয়েবসাইটে ক্লায়েন্টরা যোগাযোগ করে। আমাদের টিম তখন কাজে লেগে যায়। ছোটাচ্চু অবশ্যি জানাল না যে তার টিম মানে সে একা এবং জোর করে সেখানে টুনি ঢুকে যাওয়ার চেষ্টা করছে।
কী রকম ক্লায়েন্ট পাচ্ছ?
বেশ ভালো। নতুন প্রজেক্ট হিসেবে বেশ ভালো। ছোটাচ্চু এবারেও জানাল না যে ডলি খালা যে খোঁজ নিচ্ছে, এটাই তার এজেন্সির সম্পর্কে প্রথম কারও আগ্রহ এবং সে জন্যই সে বলছে বেশ ভালো। ছোটাচ্চু চোখের কোনা দিয়ে আশপাশে তাকাল—ভাগ্যিস আশপাশে ছোট বাচ্চারা নেই, থাকলে এতক্ষণে তার সবকিছু প্রকাশ হয়ে যেত।
ডলি খালা এবার বেশ আগ্রহ নিয়ে বলল, তাহলে তুমি তোমার ডিটেকটিভ এজেন্সি দিয়ে আমার জামাইয়ের খোঁজ নিয়ে দাও না ছেলেটি কেমন।
ছোটাচ্চু তখন মুখে একটা আলগা গাম্ভীর্য নিয়ে এল। সে এখনো বিশ্বাস করতে পারছে না যে, ডলি খালা তার ডিটেকটিভ এজেন্সিকে সত্যি সত্যি একটা কাজ দিচ্ছে। ছোটাচ্চুর মনে হলো, এটা একটা ঐতিহাসিক মুহূর্ত, তার বুকে দুরু দুরু কাঁপুনি শুরু হলো। ছোটাচ্চু তখন কাঁপা কাঁপা গলায় বলল, অবশ্যই, ডলি খালা। আমার ডিটেকটিভ এজেন্সি আপনার জামাইয়ের খোঁজ নিয়ে দেবে। আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন।
ডলি খালা খুশি হয়ে বলে, থ্যাংকু বাবা। বুঝতেই পারছ একটা মাত্র মেয়ে, কার হাতে তুলে দিই সেইটা নিয়ে অশান্তি।
