আক্রান্ত রোগীকে তাৎক্ষণিকভাবে হাসপাতালে স্থানান্তর করা জরুরি। একই সাথে স্যালাইন ও কোরামিন প্রদান করে অপেক্ষা করা ছাড়া আর কোনো চিকিৎসা নেই। আক্রান্ত রোগীর মনোবল রক্ষার জন্য তাকে সাহস দিয়ে আশ্বস্ত রাখা জরুরি। এই বিষক্রিয়ার কারণে এখন পর্যন্ত কোনো মৃত্যুর ঘটনা লিপিবদ্ধ নাই।
জিকু পুরোটা পড়তে পারল না, তার আগেই তার সারা শরীর কাঁপতে থাকে, পাঁজর ও পিঠে ভয়ংকর ব্যথা শুরু হয়। তার হাত কাঁপতে থাকে আর মোটামুটি শব্দ করে সে বেঞ্চের ওপর পড়ে যায়। তার মুখ দিয়ে গোঁ গোঁ করে একধরনের শব্দ হতে থাকে।
টুম্পার টিফিন এত দিন কে চুরি করে এসেছে, সেটা বুঝতে টুম্পার বাকি নাই, কিন্তু এই মুহূর্তে তার সেটা নিয়ে এতটুকু মাথাব্যথা নাই। জিকুকে হাসপাতালে কীভাবে নেওয়া যাবে, সেটাই হচ্ছে চিন্তা।
ক্লাসের সবচেয়ে দুষ্ট ছেলে মিশু আর সবচেয়ে পাজি মেয়ে পিংকি সবার আগে ছুটে এল, জিকুকে দেখে অবাক হয়ে বলল, কী হয়েছে জিকুর?
টুম্পা বলল, বি-বিষ খেয়েছে।
দুষ্ট ছেলে মিশু চোখ কপালে তুলে বলল, বিষ? বিষ কোথায় পেল? কেন বিষ খেল?
এখন এত কথা বলার সময় নাই, টুম্পা শুকনো গলায় বলল, জিকুকে এক্ষুনি হাসপাতালে নিতে হবে।
হাসপাতাল?
হ্যাঁ।
কেমন করে নিবি?
টুম্পা কাঁপা গলায় বলল, স্যার-ম্যাডামদের বলতে হবে।
সবচেয়ে পাজি মেয়ে পিংকী বলল, তোরা অপেক্ষা কর, আমি স্যার ম্যাডামদের ডেকে আনি। বলে সে ছুটে বের হয়ে গেল।
জিকু যে রকম অসুস্থ হয়ে পড়েছে, টুম্পাও মনে হয় সে রকম অসুস্থ হয়ে পড়বে। টুনি আপু কেমন করে এ রকম ভয়ংকর একটা কাজ করল? স্যার-ম্যাডাম এসে যখন দেখবেন, সে টিফিনের মাঝে গাইকো ফ্রেরাক্সিন না কী যেন ভয়ংকর বিষ দিয়ে এনেছে, তখন তার কী অবস্থা হবে? তাকে স্কুল থেকে বের করে দেবে না? এত বড় বিপদ থেকে সে কেমন করে রক্ষা পাবে?
ঠিক তখন টুম্পার মনে পড়ল, টুনি আপু দুটি খাম বন্ধ চিঠি দিয়েছে। তাকে বলে দিয়েছে, সে যদি বিপদে পড়ে, তাহলে যেন দুই নম্বর খামটা খোলে। এর থেকে বড় বিপদ আর কী হতে পারে? জিকু বেঞ্চে শুয়ে থরথর করে কাঁপছে। মুখে বিন্দু বিন্দু ঘাম। চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে। সেই চোখে আতঙ্ক।
টুম্পা এর মধ্যে তার ব্যাগ থেকে দুই নম্বর খামটা বের করে সেটা খুলল, ভেতরে সাদা কাগজে বড় বড় করে লেখা
পুরোটা ধাপ্পাবাজি।
টিফিনে কোনো কেমিক্যাল দেওয়া হয় নাই।
গাইকো ফ্লেরাক্সিন থার্টি টু বলে কিছু নাই।
পুরোটাই বানানো।
টুনি
অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিটেকটিভ
আলটিমেট ডিটেকটিভ এজেন্সি।
টুম্পা দুবার চিঠিটা পড়ে চিৎকার করে বলল, আসলে জিকু বিষ খায় নাই। স্যার-ম্যাডামকে ডাকতে হবে না।
সবচেয়ে পাঁজি ছেলেটা বলল, ডাকতে হবে না? হাসপাতালে নিতে হবে না?
না। কিছু করতে হবে না। পিংকীকে থামা।
পিংকীকে থামানোর জন্য মিশু গুলির মতো বের হয়ে গেল। শুধু সে-ই পিংকীকে সময়মতো থামাতে পারবে।
টুম্পা তখন জিকুকে ঝাঁকুনি দিয়ে বলল, তোর কিছু হয় নাই। এই দেখ।
জিকু বেঞ্চে শুয়ে একবার টুনির লেখা কাগজটা পড়ল। তারপর উঠে বসে আরেক বার কাগজটা পড়ল। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে আরেক বার কাগজটা পড়ল। তারপর কথা নাই বার্তা নাই ধড়াম করে টুম্পার নাকের উপর একটা ঘুষি মেরে বসল।
টুম্পা এত অবাক হলো যে বলার নয়। তার টিফিন এত দিন চুরি করে খেয়ে এখন তাকেই মারছে? এর থেকে বড় অন্যায় আর কী হতে পারে?
তখন টুম্পাও ধড়াম করে জিকুর নাকে একটা ঘুষি মেরে দিল। তার মতো একটা শান্তশিষ্ট মেয়ে এ রকম একটা কাজ করতে পারে, কেউ বিশ্বাস করতে পারে না। টুম্পার ঘুষি খেয়ে জিকু তখন আরেকটা ঘুষি দিল, এবার টুম্পার পেটে। টুম্পা তখন জিকুর বুকে একটা ঘুষি দিল। জিকু তখন–
মিশু ততক্ষণে পিংকীকে ধরে নিয়ে এসেছে। তারা দুজন তখন টুম্পা আর জিকুকে ধরে সরিয়ে নিল। সরিয়ে নেওয়ার আগে টুম্পা জিকুর সাথে জন্মের আড়ি দিয়ে দিল। এ রকম অকৃতজ্ঞ বন্ধুর তার কোনো দরকার নেই।
টুনির সাথে বাসায় যখন টুম্পার দেখা হলো, টুনি তখন জিজ্ঞেস করল, টিফিন চোর ধরা পড়েছে?
টুম্পা কোনো কথা না বলে মাথা নাড়ল। টুনি জিজ্ঞেস করল, কে? জিকু?
টুম্পা অবাক হয়ে বলল, তুমি কেমন করে জাননা?
না জানার কী আছে। তোর মাথায় যদি এতটুকু বুদ্ধি থাকত, তাহলে তুইও জানতি।
টুম্পা বলল, জিকুর সাথে আমার জন্মের আড়ি হয়ে গেছে।
টুনি চিন্তিত মুখে বলল, তাই নাকি?
টুম্পা কোনো উত্তর দিল না।
পরদিন টুম্পা যখন স্কুলে যাবে, তখন তার আম্মু তাকে দুটি টিফিনের বাক্স ধরিয়ে দিল। টুম্পা অবাক হয়ে বলল, দুইটা কেন?
আম্মু বলল, কী জানি। টুনি বলল, এখন থেকে প্রতিদিন তোকে যেন দুইটা করে টিফিন দিই।
টুম্পা কয়েক সেকেন্ড কিছু একটা ভাবল, তারপর দুটি টিফিনের প্যাকেটই হাতে নিল।
স্বীকার করতেই হবে লক্ষণটা ভালো।
০৫. ছোটাচ্চু শিস দিতে দিতে
ছোটাচ্চু শিস দিতে দিতে ঘরে ঢুকছিল। ভেতরে উঁকি দিয়ে দেখে, দাদির সাথে মোটাসোটা নাদুসনুদুস একজন মহিলা গল্প করছে। ছোটাচ্চু সাথে সাথে শিস বন্ধ করে সটকে পড়ার চেষ্টা করল। মোটাসোটা নাদুসনুদুস মহিলাদের সে খুব ভয় পায়। এ-রকম মহিলারা সাধারণত সবকিছু জানে এবং সবকিছু নিয়ে উপদেশ দিতে পছন্দ করে।
