টুম্পা টুনির দিকে চোখ বড় বড় করে তাকাল। নিজের সাথেও কথা বলা যাবে না সেটা কী ব্যাপার, টুম্পা বুঝতে পারছিল না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সে নিকে আর কিছু জিজ্ঞেস করল না।
স্কুলে গিয়ে টুম্পা তার ডেস্কের ওপর ব্যাগটা রেখে এদিক-সেদিক তাকাল, তার টিফিন চোর এর মাঝে চলে এসেছে কি না, কে জানে। টুনি আপু বলেছে, টিফিন চোর আজ ধরা পড়বে। কীভাবে ধরা পড়বে, সেটাই বা কে বলবে? পুরো ব্যাপারটা নিয়ে জিকুর সাথে আলাপ করতে হবে, কিন্তু টুনি আপু বলে দিয়েছে আজকে কোনো বন্ধু কিংবা প্রাণের বন্ধু কারোর সাথেই এটা নিয়ে কথা বলা যাবে না—কাজেই মনে হয়, তাকে অপেক্ষা করতে হবে। টিফিন চোর ধরা পড়ার পর সেই চোরকে নিয়ে কী করা যায়, সেটা জিকুর সাথে আলোচনা করা যেতে পারে।
একটু পরই জিকু তার ব্যাগ ঝুলিয়ে চলে এল। পাশের ডেস্কে ব্যাগটা রেখে টুম্পাকে জিজ্ঞেস করল, ইংরেজি হোমওয়ার্ক এনেছিস?
টুম্পা মাথা নাড়ল, এনেছি।
আর টিফিন?
টিফিনও এনেছি।
কী এনেছিস।
আম্মু নুডলস বানিয়ে দিয়েছে।
জিকু মুখ শক্ত করে বলল, আজকে তোর ব্যাগ কঠিনভাবে পাহারা দেব। দেখব, কেমন করে চুরি করে।
টুম্পার মুখটা একবার বলার জন্য নিশপিশ করছিল যে আজ টিফিন চোর ধরা পড়বে, কিন্তু বলল না। টুনি আপু না করে দিয়েছে বলা ঠিক হবে না।
ক্লাস শুরু হওয়ার পর টুম্পা তার টিফিন, টিফিন চোরের কথা ভুলে গেল। হাফ টাইমে টুম্পা তার ব্যাগটা চোখে চোখে রাখল। যখন সে ছিল না, তখন জিকু তার ব্যাগটা লক্ষ রাখল। টুম্পা ভেবেছিল, টিফিন চোর চুরি করার সুযোগ পায়নি, কিন্তু টিফিন পিরিয়ডে যখন ব্যাগ খুলল, তখন অবাক হয়ে দেখল, তার প্লাস্টিকের বাটিটা আছে কিন্তু নুডলস হাওয়া। কী আশ্চর্য ব্যাপার! টুম্পা যত অবাক হলো, জিকু অবাক হলো তার থেকে বেশি।
জিকু তার প্যাকেট খুলে রুটি আর ডালের অর্ধেকটা টুম্পাকে খেতে দিল। সেই রুটি আর ডাল দেখেই টুম্পার খিদে চলে গেল। রুটিটাকে দেখে মনে হলো, এটা বুঝি গুইসাপের চামড়া, আর ডালটাকে মনে হলো বিষাক্ত কেমিক্যাল। টুম্পা খেতে রাজি হলো না বলে জিকু একা একাই মুখ কালো করে তার গুইসাপের চামড়া চিবুতে লাগল।
টুনি আপু বলেছিল, ঠিক পনেরো মিনিট পর প্রথম খামটা খুলতে। টুম্পা ঘড়ি ধরে পনেরো মিনিট অপেক্ষা করে খামটা খুলল। ভেতরে দুটি কাগজ, একটা হাতে লেখা অন্যটা টাইপ করা। হাতে লেখা কাগজটা টুনির হাতে লেখা। সেখানে লেখা আছে।
টুম্পা
তোর মনে আছে, আমি তোর নুডলসের বাটিটা কিছুক্ষণের জন্য ঘরে নিয়ে গিয়েছিলাম? তখন আমি একটা কাজ করেছি, তোর নুডলের ওপর কয়েক ফোঁটা গাইকো ফেরাক্সিন থার্টি টু দিয়ে দিয়েছি। এটা একধরনের কেমিক্যাল, পশু-ডাক্তাররা অবাধ্য গরু ছাগলকে বশ করার জন্য এটার ইনজেকশন দেয়। মানুষ খেলে তার ভয়ংকর একধরনের রি-অ্যাকশন হয়, তিন থেকে চার ঘণ্টা এটার প্রতিক্রিয়া থাকে। তারপর আস্তে আস্তে ভালো হয়ে যায়।
কাজেই তুই এখন তোর ক্লাসের সব ছেলেমেয়েকে লক্ষ করে দেখ, কে অসুস্থ হয়ে পড়েছে। ছোটখাটো অসুস্থ নয়, খুব খারাপভাবে অসুস্থ। বমি এবং মাথা ঘোরা। হাত-পায়ে কাঁপুনি ইত্যাদি ইত্যাদি। গাইকো ফ্লেক্সিন থার্টি টু কী ধরনের কেমিক্যাল, সেটা বোঝানোর জন্য ইন্টারনেট থেকে ডাউনলোড করে একটা পৃষ্ঠা দিয়েছি। ইচ্ছে করলে পড়ে দেখতে পারিস।
দেরি করবি না, তোর হাতে কিন্তু সময় বেশি নাই।
টুনি আপু।
আলটিমেট ডিটেকটিভ এজেন্সি।
অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিটেকটিভ।
চিঠি পড়ে টুম্পার হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে গেল। সর্বনাশ! টুনি আপু কী ভয়ংকর একটা কাজ করেছে, টিফিন চোর ধরার জন্য তার টিফিনে বিষ মিশিয়ে দিয়েছে। টুম্পা আতঙ্কিত হয়ে চারদিকে তাকাল। দেখার চেষ্টা করল কেউ বমি করছে কি না, মাথা ঘুরে পড়ে গেছে কি না।
জিকু জিজ্ঞেস করল, কী হয়েছে?
সর্বনাশ হয়েছে।
কী সর্বনাশ হয়েছে?
টুম্পা কাঁপা গলায় বলল, টিফিন চোর ধরার জন্য টুনি আপু আমার টিফিনে বিষ মিশিয়ে দিয়েছে।
জিকু চিৎকার করে বলল, কী বললি?
হ্যাঁ। এই দেখ। টুম্পা জিকুকে চিঠিটা দেখাল, জিকু চিঠিটা পড়ল এবং টুম্পা দেখল, চিঠি পড়তে পড়তে জিকুর হাত কাঁপতে শুরু করেছে। চোখ-মুখ কেমন যেন লালচে হয়ে উঠছে, আর সেখানে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে উঠেছে। জিকুর চেহারা দেখে হঠাৎ করে টুম্পার মাথায় ভয়ংকর একটা চিন্তা খেলে যায়। তাহলে কী—
জিকু কাঁপা হাতে বাংলায় টাইপ করা দুই নম্বর কাগজটা প্রায় ছিনিয়ে নিয়ে পড়ার চেষ্টা করল। কাগজে লেখা–
গাইকো ফ্রেরাক্সিন থার্টি টুয়ের বিষক্রিয়া
এটি প্রথমে পাকস্থলীর মাংসপেশিকে আক্রমণ করে। রক্তের সাথে মিশে যাওয়ার পর পনেরো থেকে বিশ মিনিটের মাঝে এর বিষক্রিয়া শুরু হয়। সাধারণ প্রতিক্রিয়া মাথা ঘোরা, বমি, অবসাদ ও খিচুনি। শরীরের তাপমাত্রা দুই থেকে তিন ডিগ্রি বেড়ে যেতে পারে। হৃৎস্পন্দন দ্রুততর হয়। বিষের প্রতিক্রিয়া চলাকালে টানেল ভিশন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
শিশু ও কিশোরদের ভেতর এর প্রতিক্রিয়া আরও তীব্র এবং দীর্ঘস্থায়ী। সাময়িকভাবে কথা বন্ধ হয়ে যাওয়ার উদাহরণ রয়েছে। শরীর থেকে ঘাম নির্গত হয়। পিঠ ও পাঁজরে তীব্র ব্যথা অনুভূত হয়। আঙুলের গোড়ায় স্পর্শানুভূতি লোপ পায়।
