তুই এখন বাসা থেকে টিফিন নিয়ে যাস?
হ্যাঁ। আম্মু প্রতিদিন আমার জন্য টিফিন বানিয়ে দেয়। কিন্তু বলে টুম্পা চুপ করে গেল।
কিন্তু কী?
টুম্পা বলল, সেই জন্য আমি তোমার কাছে এসেছি।
কী জন্য এসেছিস? ছোটাচ্চু এবার একটু অধৈর্য হলো।
আমার কেস।
তোর কী কেস?
প্রত্যেকদিন কেউ একজন আমার টিফিন খেয়ে ফেলে। তোমাকে বের করে দিতে হবে, কে আমার টিফিন খায়। টুম্পা কথা শেষ করে মুখ শক্ত করে দাঁড়িয়ে রইল।
ছোটাচ্চু হতাশ ভঙ্গি করে মাথা নাড়ল, তারপর বলল, দেখ টুম্পা, আমার আলটিমেট ডিটেকটিভ এজেন্সি হচ্ছে সিরিয়াস বিজনেস। কে তোর টিফিন খেয়ে ফেলে, সেটা বের করা মোটেও আমার এজেন্সির কাজ না।
টুম্পা বলল, তুমি সত্যিকারের ডিটেকটিভ হলে নিশ্চয়ই বের করতে পারবে।
আমি একশবার সত্যিকার ডিটেকটিভ। ছোটাচ্চু মুখটা গম্ভীর করে বলল, ডিটেকটিভ হতে হলে যা যা শিখতে হয়, আমি সবকিছু শিখে ফেলেছি। মার্ডার সিনে কেমন করে আন্ট্রাভায়োলেট-রে দিয়ে রক্তের চিহ্ন বের করতে হয় তুই জানিস? জানিস না। আমি জানি। আঙুলের ছাপ কেমন করে নিতে হয় তুই জানিস? জানিস না। আমি জানি। ব্লাড টেস্ট করে কেমন করে বের করতে হয় কী ড্রাগস খেয়েছে তুই জানিস
টুম্পা বলল, কে আমার টিফিন খেয়ে ফেলে সেটা বের করে দেবে কি না বলো।
দেখ টুম্পা, তোকে আমি মনে হয় বোঝাতে পারি নাই–
টুম্পা একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, তার মানে তুমি বের করে দেবে। ঠিক আছে, আমি টুনি আপুর কাছে যাব। টুনি আপু তো তোমার অ্যাসিস্ট্যান্ট, নিশ্চয় বের করে দেবে।
ছোটাচ্চু কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, টুম্পা তার সুযোগ না দিয়েই ঘর থেকে বের হয়ে হেঁটে হেঁটে টুনির কাছে হাজির হল।
টুনি গভীর মনোযোগ দিয়ে টুম্পার কথা শুনল। তারপর জিজ্ঞেস করল, ক্লাসে কি শুধু তোর টিফিন চুরি হয়, নাকি আরও ছেলেমেয়ের টিফিন চুরি হয়?
মনে হয় শুধু আমার।
তোর ক্লাসে টিফিন ছাড়া আর কিছু কি চুরি হয়?
মনে হয় না।
তোর টিফিন কি প্রতিদিন চুরি হয়?
যেদিন আম্মু স্যান্ডউইচ বানিয়ে দেয়, সেদিন হয় না। মনে হয়, চোর স্যান্ডউইচ পছন্দ করে না।
তুই কি কাউকে সন্দেহ করিস?
আমাদের ক্লাসে অসম্ভব দুষ্টু একটা ছেলে আছে, অসম্ভব পাঁজি একটা মেয়ে আছে, তারা হতে পারে?
কিন্তু তোর কাছে কি প্রমাণ আছে?
নাই।
টুনি চিন্তিত মুখে বলল, প্রমাণ না থাকলে তো লাভ নাই। তারপর জিজ্ঞেস করল, তোর যে টিফিন চুরি হয়ে যায়, সেটা কি আর কেউ জানে?
জানে।
কে জানে?
আমার যে বন্ধু আছে জিকু, সে জানে।
জিকু ছেলে না মেয়ে?
মেয়ে।
সে কেমন করে জানে?
আমি বলেছি, সেই জন্য জানে। জিকুও টিফিনচোর ধরার চেষ্টা করেছে, পারে নাই। আমি যখন বাথরুমে কিংবা অন্য কোথাও যাই, তখন জিকু পাহারা দেয়। তার পরও টিফিন চুরি হয়ে যায়।
টুনি বলল, হুম।
জিকুর মনটা খুব ভালো। যখন আমার টিফিন চুরি হয়ে যায়, আমাকে তার টিফিন খেতে দেয়।
তুই খাস?
উহু। টুম্পা যতটুকু জোরে মাথা নাড়ার কথা, তার থেকে অনেক বেশি জোরে মাথা নাড়ল।
কেন খাস না?
জিকুর আম্মা একেবারে টিফিন বানাতে পারে না। যে টিফিন তৈরি করে দেয়, সেগুলো খাওয়া যায় না।
কী টিফিন দেয়?
একটা শক্ত রুটি, তার মাঝখানে ডাল।
আর?
আর কিছু না। প্রতিদিন একই জিনিস।
একই জিনিস?
হ্যাঁ। মাঝে মাঝে রুটি বেশি শক্ত, মাঝে মাঝে কম শক্ত। ডালটা মাঝে মাঝে ল্যাদল্যাদা, মাঝে মাঝে আঠা আঠা।
টুনি বলল, হুম।
টুম্পা জিজ্ঞেস করল, তুমি কি বের করতে পারবে, কে আমার টিফিন চুরি করে?
টুনি বলল, মনে হয় পারব।
সত্যি?
হ্যাঁ, সত্যি। শুধু একটু বিপদ আছে।
বিপদ?
হ্যাঁ।
কার বিপদ?
তোর বিপদ।
টুম্পা অবাক হয়ে বলল, আমার?
হ্যাঁ। তুই যদি বিপদকে ভয় না পাস, তাহলে কালকেই বের করে দেব। কিন্তু পরে আমাকে দোষ দিতে পারবি না। রাজি?
টুম্পা রাজি হলো।
পরদিন সকালে টুম্পা স্কুলে যাওয়ার সময় টুনি তাকে থামাল। জিজ্ঞেস করল, টিফিন নিয়েছিস?
টুম্পা মাথা নাড়ল, হ্যাঁ।
কী টিফিন?
নুডলস।
এটা কি চুরি হবে?
মনে হয়। নুডলস নিলেই চুরি হয়। চোর মনে হয় নুডলস খেতে খুব পছন্দ করে।
গুড। টুনি হাত পেতে বলল, দে তোর টিফিনের প্যাকেট।
কেন?
কোনো প্রশ্ন করবি না। তুই দে।
টুম্পা তার ব্যাকপ্যাক থেকে পলিথিনে মোড়া একটা প্লাস্টিকের বাটি বের করে আনল। টুনি সেটা হাতে নিয়ে বলল, তুই দাঁড়া, আমি আসছি।
কী করবে তুমি আমার নুডলস নিয়ে।
কোনো প্রশ্ন করতে পারবি না। চুপ করে দাঁড়িয়ে থাক।
টুম্পা চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল আর টুনি নুডলসের বাটি নিয়ে তার ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল। কিছুক্ষণ পর সে আবার প্যাকেটটা নিয়ে বের হয়ে এল, সাথে দুটো খাম। নুডলসের প্যাকেট আর খাম দুটো টুম্পার হাতে দিয়ে বলল, নে।
কী এগুলো!
যদি তোর নুডলস চুরি হয়, তাহলে পনেরো মিনিট পর এক নম্বর খামটা খুলবি। যদি কোনো সমস্যা না হয়, তাহলে দুই নম্বর খামটা খুলতে হবে না, আমাকে বন্ধ অবস্থায় ফেরত দিবি।
কী আছে খামের ভেতরে?
তোর এখন জানার দরকার নাই। যদি তোর টিফিন চুরি হয়, শুধু তাহলে তুই জানতে পারবি।
টুম্পা বলল, ঠিক আছে।
টুনি বলল, আরও একটা কথা। কী কথা?
তুই আজকে কাউকেই কিছু বলবি না। কোনো বন্ধুকে না, কোনো প্রাণের বন্ধুকে না। এমনকি তোর টিফিন নিয়ে তুই আজকে নিজের সাথেও কথা বলতে পারবি না।
