বানরওয়ালা। বানরকে ট্রেনিং দিয়ে রেখেছে, তার বানর বাড়ি বাড়ি গিয়ে জানালা দিয়ে হাত বাড়িয়ে যা পায় তুলে নিয়ে আসে।
ছোটাচ্চু বলল, বা-বাবা,..নিশ্চয়ই বানর বলতে যাচ্ছিল কিন্তু কথা শেষ করতে পারল না।
বানরওয়ালা তখন নিজের জায়গায় গিয়ে বসে তার ঝোলার দিকে তাকিয়েছে, হঠাৎ করে তার কিছু একটা সন্দেহ হলো, সে ঝোলাটার ভেতরে উঁকি দেয়, তারপর অবাক হয়ে ঝোলাটার দিকে তাকাল সাথে সাথে তার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে যায়। সে আতংকিত হয়ে এদিক-সেদিক তাকায় এবং হঠাৎ দূরে ছোটাচ্চু আর টুনিকে দেখতে পেল। ছোটাচ্চুর হাতে তার লাল ঝোলা। দেখে সাথে সাথে বুঝে গেল সে ধরা পড়ে গেছে। ছোটাচ্চুর হাত থেকে নিজের ঝোলা উদ্ধার করার কোনো চেষ্টা না করে হঠাৎ সে তার বানরকে নিয়ে ছুটতে শুরু করে। ট্রেনিং পাওয়া বানর, এক লাফ দিয়ে সেটা তার ঘাড়ে উঠে বসল, আর বানরওয়ালা তার বানর ঘাড়ে নিয়ে হাজি গুলজার খানের বাড়ির গেটের দিকে প্রাণপণে ছুটতে থাকে।
এতক্ষণে ছোটাচ্চু নিজেকে সামলে নিয়েছে। চিৎকার করে বলল, ধরো। ধরো বানরওয়ালাকে। এই ব্যাটা চোর। মহাচোর।
ছোটাচ্চুর কথা শেষ না হতেই লোকজন বানরওয়ালাকে ধাওয়া করল, টুনি দেখল সবার আগে শান্ত। কী হয়েছে, কেন বানরওয়ালাকে ধরতে হবে, সে কিছুই জানে না, কিন্তু মহা-উৎসাহে সে পেছন থেকে ল্যাং মেরে বানরওয়ালাকে ফেলে দিল। তার বানর মনে হয় আগেও এ রকম অবস্থায় পড়েছে, সেটা কয়েকটা লাফ দিয়ে বড় একটা মান্দার গাছের মগডালে উঠে কৌতূহল নিয়ে নিচের দিকে তাকাল। মনে হয় অনুমান করার চেষ্টা করছে, এখন কী হবে।
চোর ধরা পড়লেই পাবলিক প্রথমে আচ্ছা মতন পিটুনি দেয়। এখানেও তা-ই শুরু হয়ে গেল। ছোটাচ্চু তখন অনেক কষ্ট করে বানরওয়ালাকে পাবলিকের পিটুনি থেকে রক্ষা করল, ততক্ষণে বাসার দারোয়ান এমনকি দুজন পুলিশও চলে এসেছে। সবাই জানতে চাইছে কী হয়েছে, ব্যাপারটা বুঝতে চাইছে।
ছোটাচ্চু বলল, এই বানরওয়ালা মহাচোর। বানরের খেলা দেখানো তার সাইড বিজনেস। আসলে রাতের বেলা বানরকে ছেড়ে দেয় বাসায় বাসায় চুরি করার জন্য। বানরকে চুরি করা শিখিয়েছে।
একজন পুলিশ জিজ্ঞেস করল, আপনি কেমন করে জানেন?
ছোটাচ্চু তার ঝোলাটা দেখাল, বলল, এই যে বানরওয়ালার ঝোলা। এই ঝোলা বোঝাই চোরাই মাল। আমাদের বাসা থেকে চুরি করা সব জিনিস এখানে আছে। অন্যের বাসার জিনিসও আছে।
পাবলিক তখন আবার খেপে উঠল, বলল, ধর শালা বানরওয়ালাকে। মার শালাকে।
আবার কয়েকটা কিল-ঘুষি পড়ল কিন্তু এবারে পুলিশ সবাইকে থামিয়ে দিল। ঝোলাটার ভেতরে উঁকি দিয়ে বলল, কী আশ্চর্য! তারপর ছোটাচ্চুর দিকে তাকিয়ে বলল, আপনি কেমন করে এই ব্যাটাকে ধরলেন?
ছোটাচ্চু উত্তর দেওয়ার আগেই টুনি বলল, খুবই সোজা। ইনি হচ্ছেন দি আলটিমেট ডিটেকটিভ এজেন্সির প্রধান ডিটেকটিভ। ইনি যেকোনো কেস সলভ করতে পারেন। চুরি, ডাকাতি, খুন যেকোনো কিছু উনার হাতের ময়লা!
পুলিশটা অবাক হয়ে টুনির দিকে তাকাল, সত্যি? তার মানে ইনি প্রাইভেট ডিটেকটিভ?
হ্যাঁ। আর আমি হচ্ছি উনার অ্যাসিস্ট্যান্ট। ছোটাচ্চু একবার শুকনো মুখে ঢোক গিলল, কিন্তু প্রতিবাদ করল না।
এভাবে টুনি দি আলটিমেট ডিটেকটিভ এজেন্সির প্রধান ডিটেকটিভের অ্যাসিস্ট্যান্ট হয়ে গেল।
০৪. সবচেয়ে চুপচাপ মেয়ে
এই বাসার সবচেয়ে যে চুপচাপ মেয়ে, সে ছোট চাচার কাছে এসে বলল, ছোটাচ্চু, তোমার সাথে একটা কথা আছে।
মেয়েটা যেহেতু খুব চুপচাপ, কথা বলে কম, তাই সে যখন কথা বলে, তখন সবাই আগ্রহ নিয়ে শোনে। তাই ছোটাচ্চুও আগ্রহ নিয়ে বলল, কী কথা, টুম্পা?
চুপচাপ মেয়েটার নাম টুম্পা। যেহেতু সে চুপচাপ, তাই এই বাসায় এই নাম ধরে খুব বেশি ডাকাডাকি হয় না।
টুম্পা বলল, তুমি তো একটা ডিটেকটিভ এজেন্সি খুলেছ।
ছোটাচ্চু বলল, হ্যাঁ, খুলেছি।
তুমি কি আমার একটা কেস নেবে?
ছোটাচ্চু হাসার চেষ্টা করল, কিন্তু ঠিক হাসতে পারল না। তাই শুধু হাসির মতো একটা শব্দ বের হলো। শব্দটা শেষ করে বলল, দেখ টুম্পা, আমি মনে হয় তোদের ব্যাপারটা ঠিক বোঝাতে পারি নাই। আমার আলটিমেট ডিটেকটিভ এজেন্সি কিন্তু মোটেও ছেলেখেলা না।
টুম্পা বলল, আমার কেসটাও ছেলেখেলা না।
ছোটাচ্চু একটু থতমত খেয়ে বলল, তোর কেসটা কী?
টুম্পা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। মনে হলো, মনে মনে ঠিক করে নিল কী বলবে। তারপর গলা পরিষ্কার করে বলতে শুরু করল। টুম্পা এমনিতে চুপচাপ, কিন্তু যখন কথা বলতে হয়, গুছিয়ে বলতে চেষ্টা করে। টুম্পা বলল, আমাদের স্কুলে আগে টিফিন দিত। কোনোদিন রুটি-সবজি, কোনোদিন খিচুড়ি, কোনোদিন আলুচপ, কোনোদিন মাংস-পরোটা। টিফিনগুলো হতো খুবই খারাপ, মুখে দেওয়ার মতো না। টিফিন খেয়ে একবার সবার ডায়রিয়া হয়ে গিয়েছিল। শুধু আমার হয় নাই।
ছোটাচ্চু ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল, কেন? তোর হয় নাই কেন?
তার কারণ, আমি কোনোদিন স্কুলের টিফিন খাই নাই।
ছোটাচ্চু ভুরু আরও বেশি কুঁচকে বলল, কেন টিফিন খাস নাই? না খেয়ে থাকলে পেটে গ্যাস্ট্রিক না হলে আলসার হয়ে যেতে পারে, জানিস?
টুম্পা বলল, টিফিন খেয়ে মরে যাওয়া থেকে না খেয়ে গ্যাস্ট্রিক আর আলসার হওয়া অনেক ভালো। স্কুলের টিফিন খেয়ে কেউ না কেউ নিশ্চয়ই মরে যেত। তখন স্কুল থেকে টিফিন বন্ধ করে দিল। নিয়ম করে দিল, এখন থেকে সবাইকে বাসা থেকে নিজের টিফিন নিজেকে আনতে হবে।
