টুনি শান্ত গলায় বলল, আমার কথা এখনো শেষ হয় নাই।
শান্ত মুখ শক্ত করে বলল, শেষ কর তাহলে।
বানরের দড়িটা ছুটিয়ে নেওয়ার পর বানরটাকে কোলে নিয়ে ছুটে পালাবে।
শান্ত চোখ কপালে তুলে বলল, ছুটে পালাব?
হ্যাঁ।
বানর কোলে নিয়ে?
হ্যাঁ।
আমি প্রকাশ্য দিনের বেলায় হাজার হাজার মানুষের সামনে একটা বানরকে চুরি করে নিয়ে যাব? তারপর পাবলিক যখন পিটিয়ে আমাকে তক্তা বানাবে–
টুনি বলল, মোটেও তক্তা বানাবে না। পাবলিক কিছু বুঝতেই পারবে না কী হচ্ছে, শুধু বানরওয়ালা তোমার পিছু পিছু ছুটে আসবে। তখন তুমি বানরওয়ালার সাথে ঝগড়া শুরু করবে।
ঝগড়া? আমি বানর চুরি করব আর আমিই আবার ঝগড়া করব?
কেন? সমস্যা আছে? তুমি ঝগড়া করতে পারো না? তোমার চাইতে ভালো ঝগড়া আর কে করতে পারে?
শান্ত এটাকে প্রশংসা হিসেবে ধরে নিয়ে বলল, কী নিয়ে ঝগড়া করব?
যা খুশি। ইচ্ছে হলে তুমি বলতে পারো যে বানরের খেলা দেখানো অমানবিক, এটা নিরীহ পশুর প্রতি অত্যাচার। তুমি পশু ক্লেশ নিবারণ সমিতির মেম্বার। তুমি বানরটাকে বনে ছেড়ে দেবে। এসব!
শান্ত কিছুক্ষণ চিন্তা করল, তারপর বলল, ঠিক আছে। কিন্তু দশ টাকায় হবে না।
কত লাগবে?
একশ।
বিশ।
উহু। পঞ্চাশ টাকার এক পয়সা কম না।
কিছুক্ষণ দরদাম করে ত্রিশ টাকায় রফা হলো। টুনি দশ টাকা অ্যাডভান্স দিয়ে বলল, কাজ শেষ হলে বাকি টাকা দেওয়া হবে। শান্ত একটু দুশ্চিন্তা করছিল, টুনি সাহস দিয়ে বলল, তোমার কাজ খুব সহজ, বানরওয়ালাকে ব্যস্ত রাখা। তুমি চোখের কোনা দিয়ে আমাকে লক্ষ করবে। যখন দেখবে আমি সরে গেছি তখন তোমার কাজ শেষ। তখন বানরওয়ালাকে বানর ফেরত দিতে পারো কিংবা ইচ্ছা করলে তোমার কাছে রেখে দিতে পারো।
তুই কী করবি?
টুনি তার ঝোলাটা দেখিয়ে বলল, আমি আমার ঝোলাটার সাথে বানরওয়ালার ঝোলাটা বদলে নেব।
শান্ত আবার চোখ কপালে তুলে বলল, কেন?
একটু পরেই দেখবে।
কোনো ঝামেলা হবে না তো?
টুনি কোনো উত্তর দিল না, শুধু তার ঠোঁটের কোনায় বিচিত্র একটা হাসি ফুটে উঠল।
একটু পরেই দেখা গেল, টুনি ভিড় ঠেলে একেবারে বানরওয়ালার কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। লাল ঝোলাটা সে হাতে ধরে রেখেছে। বানরওয়ালার পাশে তার লাল ঝোলা, দুটো দেখতে হুবহু একরকম নয় কিন্তু সেটা বোঝার জন্য খুব ভালো করে লক্ষ করতে হবে কেউ সেভাবে লক্ষ করছে না।
শান্ত ভিড় ঠেলে একটু সামনে এগিয়ে গেল, তার চোখে-মুখে এক ধরনের উত্তেজনা। বানরটা খেলা দেখাচ্ছে, প্রথমে ঘুরে ঘুরে শ্বশুরবাড়ি যাওয়া দেখাল, তারপর শশুরকে সালাম করা দেখাল। যখন বানরটা শাশুড়িকে ভেংচি কাটা দেখাচ্ছে তখন শান্ত হঠাৎ করে তড়াক করে লাফ দিয়ে বানরের দড়িটা হেঁচকা টান দিয়ে ছটিয়ে আনে, তারপর কেউ কিছু বোঝার আগে দড়ি ধরে বানরকে নিয়ে দে দৌড়। লোকজন ভ্যাবাচেকা খেয়ে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল, শুধু বানরওয়ালা এই, এই ছ্যামড়া কী করো? কী করো? আমার বান্দর, আমার বান্দর বলে শান্তর পেছনে পেছনে দৌড়াতে থাকে। সবাই যখন অবাক হয়ে সেদিকে তাকিয়ে আছে, টুনি তখন তার ঝোলাটা বানরওয়ালার ঝোলার পাশে ফেলে দিয়ে পরমুহূর্তে তুলে নিল। খুব ভালো করে লক্ষ না করলে কেউ বুঝতে পারবে না নিজের ঝোলাটা ফেলে সে বানরওয়ালার ঝোলাটা তুলে নিয়েছে। টুনি একটুও তাড়াহুড়া করল না, বানরওয়ালার ঝোলা নিয়ে খুব শান্তভাবে হেঁটে সরে গেল।
একটু দূরেই তখন শান্ত আর বানরওয়ালার মাঝে তুমুল ঝগড়া লেগে গেছে। শান্ত বলছে, আপনি জানেন বানরের খেলা দেখানো বেআইনি? বনের পশু থাকবে বনে, আর আপনি তাকে দড়ি দিয়ে বেঁধে নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন?
বানরওয়ালা তেড়িয়া হয়ে বলল, বেআইনি হলে সেটা আমার সমস্যা। তুমি আমার বান্দর নিয়ে কই যাও?
আপনাকে পুলিশে দেওয়া হবে। আমি পশু ক্লেশ নিবারণ সমিতির সেক্রেটারি। আমার কমিটি আপনাকে পুলিশে দেবে। হাইকোর্টে মামলা করবে।
বানরওয়ালা চোখ কপালে তুলে বলল, কী আলতু ফালতু কথা কও? আমি গরিব মানুষ, বান্দরের খেলা দেখাই, আর তুমি আমার বিরুদ্ধে মামলা করবা?
শান্ত হাত-পা নেড়ে বলল, আপনি বানরকে খেতে দেন? এই বানর এত শুকনো কেন? বানরের স্বাস্থ্য এত খারাপ কেন? কোনোদিন মেডিকেল চেকআপ করিয়েছেন? আপনি কি বানরকে শাস্তি দেন? অত্যাচার করেন?
টুনি একটু সরে গিয়ে বানরওয়ালার ঝোলাটার ভেতরে উঁকি দিল। ওপরে একটা ময়লা গামছা। সেটা সরানো মাত্র ভেতরে সে নানির পানের বাটা দেখতে পেল। তার পাশে ছোটাচ্চুর ভিডিও ক্যামেরা। বেশ কয়েকটা মোবাইল, অনেকগুলো মানিব্যাগ, মনে হলো একটা ল্যাপটপও আছে। টুনির মুখে হাসি ফুটে ওঠে, তার সন্দেহ পুরোপুরি ঠিক। সে রহস্যময় চোরকে ধরে ফেলেছে।
শান্ত ঝগড়া করে বেশি সুবিধা করতে পারেনি। দেখা গেল বানরওয়ালা তার বানর নিয়ে ফিরে আসছে। হাজি গুলজার খানের বাড়ির দারোয়ানকেও দেখা গেল, মেলায় গোলমাল করার জন্য সে শান্তকে মেলা থেকে বের করে দেওয়ার চেষ্টা করছে। টুনি ঠিক এই রকম সময় ছোটাচ্চুকে দেখতে পেল, লম্বা পা ফেলে তার দিকে এগিয়ে আসছে। কাছে আসতেই টুনি বানরওয়ালার লাল ঝোলাটা তার হাতে ধরিয়ে দিল, বলল, নাও। এইখানে সব চোরাই মালপত্র আছে। আমাদের বাসারগুলো আছে, অন্য বাসারগুলোও আছে।
ছোটাচ্চু মুখ হাঁ করে বলল, চো-চোরাই মাল। কে চুরি করেছে?
