ঝুমু খালা মাথা নেড়ে বোঝাল কিছু হয়নি। এর আগে যখনই তাকে কিছু জিজ্ঞেস করা হয়েছে, সে প্রতিবারই বিদঘুটে কিছু একটা উত্তর দিয়েছে। কী নাশতা তৈরি হয়েছে জিজ্ঞেস করার পর আজ সকালেই ঝুমু খালা বলেছে, পরোটার সাথে বাঘের মাংস। বাঘের মাংস সেদ্ধ হতে চায় না বলে অনেকক্ষণ জ্বাল দিতে হচ্ছে, আঁশটে গন্ধ দূর করার জন্য অনেক বেশি গরম মসলা দিতে হয়েছে। সেই ঝুমু খালা মুখে কোনো কথা না বলে শুধু মাথা নেড়ে উত্তর দিচ্ছে, বিষয়টা যথেষ্ট অস্বাভাবিক। টুনি সাধারণত দ্বিতীয়বার কোনো প্রশ্ন জিজ্ঞেস করে না কিন্তু আজকে জিজ্ঞেস করল, কী হয়েছে? বলো।
ঝুমু খালা একটা লম্বা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, আমি নাকি চোর। আমি নাকি মোবাইল ফোন, কানের দুল এইসব চুরি করছি। খোদা আমারে গরিব বানাইছে কিন্তু চোর তো বানায় নাই। বলে ঝুমু খালা চোখে আঁচল দিয়ে কাঁদতে লাগল।
টুনি সিঁড়িতে ঝুমু খালার পাশে বসে বলল, তুমি চুরি করো নাই। ঝুমু খালা কাঁদতে কাঁদতে বলল, আমি জানি। কিন্তু তোমরা পোলাপান মানুষ, তোমরা বললে কে বিশ্বাস করবে।
করবে। আমি যখন আসল চোরকে ধরব তখন সবাই বিশ্বাস করবে।
ঝুমু খালা ইলেকট্রিক শক খাওয়ার মতো চমকে উঠে সোজা হয়ে বসল। টুনির দিকে তাকিয়ে বলল, তুমি আসল চোর কে সেইটা জানো?
এখনো পুরোপুরি জানি না। কিন্তু অনুমান করতে পারি।
কে? ঝুমু খালা দাঁত কিড়মিড় করে বলল, কোন বান্দীর পোলা? আমি যদি হারামজাদার মুণ্ডু ছিড়ে না আনি তাহলে আমি বাপের বেটি না—
টুনি ঝুমু খালার কথা শুনে একটু হেসে ফেলল। বলল, আস্তে ঝুমু খালা, আস্তে। আগেই এত ব্যস্ত হয়ো না, মুণ্ডু ছিড়তে হবে নাকি লেজ ছিড়তে হবে, এখনো আমরা সেটা জানি না।
লেজ? ঝুমু চোখ কপালে তুলে বলল, লেজ?
একটু পরেই সেটা জানতে পারব। তুমি খালি আমাকে একটা কাজ করে দাও।
কী কাজ?
লাল কাপড়ের একটা ঝোলা তৈরি করে দাও।
ঝুমু খালা অবাক হয়ে বলল, লাল কাপড়ের ঝোলা?
হ্যাঁ। পারবে?
ঝুমু খালা খানিকক্ষণ কিছু একটা চিন্তা করে বলল, ছোট ভাবির একটা লাল পেটিকোট ধুতে দিয়েছে। সেটা দিয়ে বানানো যায়–
টুনি ব্যস্ত হয়ে বলল, প্লিজ প্লিজ বানিয়ে দাও। এক্ষুনি। একেবারে সত্যি ঝোলা হতে হবে না, ঝোলার মতো হলেই হবে। আমি নষ্ট করব না, আবার ফিরিয়ে দেব।
ঠিক তো?
ঠিক।
মোবাইল, মানিব্যাগ আর কানের দুলের চোর হয়ে আছি। তার সাথে পেটিকোট চোর হতে চাই না।
ঝুমু খালা ময়লা কাপড়ের স্তুপ থেকে একটা লাল পেটিকোট বের করে সেটাকে বেশ কায়দা করে ভাঁজ করে এদিকে-সেদিকে কয়েকটা সেফটিপিন লাগিয়ে দিয়ে একটা ঝোলার মতো করে দিল। রান্নাঘর থেকে কয়েকটা আলু, বসার ঘর থেকে দু-একটা বই, বাথরুম থেকে কয়েকটা শ্যাম্পুর খালি বোতল ভরে টুনি ঝোলাটাকে মোটামুটি ভরে নিল।
ঝুমু খালা জিজ্ঞেস করল, ঠিক হইছে?
টুনি মাথা নাড়ল।
ঝুমু খালা জিজ্ঞেস করল, এখন কী করবা?
চোর ধরতে যাব।
কোনো বিপদ হবে না তো?
এখনো জানি না।
সাবধান।
টুনি বাসা থেকে বের হওয়ার আগে ছোটাচ্চুর ঘরে গেল। ছোটাচ্চু বিছানায় আধশোয়া হয়ে গভীর মনোযোগ দিয়ে তার হলুদ বইটা পড়ছে। টুনিকে দেখে মুখ শক্ত করে বলল, কী খবর টুনটুনি? এই লাল ঝোলা নিয়ে
কী করিস?
টুনি প্রশ্নটা না শোনার ভান করে বলল, আমি যদি তোমার ভিডিও ক্যামেরা, মেজো চাচির কানের দুল, বড় মামার মানিব্যাগ, ছোট খালার মোবাইল ফোন, নানির পানের বাটার চোরকে ধরে দিই, তাহলে তুমি কি আমাকে তোমার অ্যাসিস্ট্যান্ট বানাবে?
ছোট চাচা চোখ বড় বড় করে বলল, কী বললি? কী বললি তুই?
আমি কী বলেছি তুমি শুনেছ।
তুই জানিস, চোর কে?
এখনো জানি না। পনেরো মিনিটের মধ্যে জানব।
প-পনেরো মিনিট? কীভাবে?
যদি দেখতে চাও তাহলে ঠিক পনেরো মিনিট পরে তুমি হাজি গুলজার খানের মাঠে মেলাতে বানরের খেলা দেখতে এসো।
ছোটাচ্চুর মুখটা কেমন যেন হা হয়ে গেল। আমতা আমতা করে বলল, গু-গু-গুলজার খানের মাঠে? বা-বা-বানরের খেলা?
হ্যাঁ। ঠিক পনেরো মিনিট পরে। আগে আসলেও হবে না, পরে আসলেও হবে না।
ছোটাচ্চু ততক্ষণে বিছানা থেকে নেমে এসেছে। হলুদ বইটা টেবিলে রেখে টুনির দিকে এগিয়ে এল। টুনি অপেক্ষা করল না। দরজা বন্ধ করে তার লাল ঝোলা নিয়ে ছুটতে লাগল। বাসা থেকে বের হয়ে রাস্তা পার হয়ে এক দৌড়ে হাজি গুলজার খানের মাঠে।
ত্যাঁদড় টাইপ শান্তকে খুঁজে পেতে কোনো সমস্যা হলো না। সে রনপা দিয়ে হেঁটে যাওয়া মানুষটিকে জ্বালাতন করছিল, টুনিকে দেখে এগিয়ে এসে, বলল, দে আমার বাকি দশ টাকা।
দেব। আগে আমার কাজটা করে দাও।
কী কাজ? তখন তার হঠাৎ করে টুনির কাঁধে ঝোলানো লাল ঝোলাটা চোখে পড়ল। অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, এই ক্যাটক্যাটে লাল ঝোলা কই পেলি? ভেতরে কী?
একটু পরেই তুমি দেখবে। আগে আমার কাজটা করে দাও।
কী কাজ?
ওই যে বানরওয়ালা খেলা দেখাচ্ছে, আমি সেখানে গিয়ে বানরওয়ালার ঠিক পেছনে দাঁড়াব। তুমি দাঁড়াবে সামনে। বানরটা খেলা দেখাতে দেখাতে যখন তোমার কাছে আসবে, তখন তুমি বানরের গলার দড়িটা ধরে একটা টান দিয়ে বানরওয়ালার হাত থেকে ছুটিয়ে আনবে।
ছুটিয়ে আনব?
হ্যাঁ, কোনো সমস্যা হবে না। আমি দেখেছি দড়িটা সে পায়ের নিচে চাপা দিয়ে রাখে, টান দিলেই ছুটে আসবে।
কিন্তু কিন্তু—
