সুতরাং ঢাকার এই দুর্বিষহ যানজটে বলতে পারেন, বলতেই পারেন এই রিকশাওয়ালাগুলো সব জ্বালিয়ে খেলো! শালারা সব কোত্থেকে আসে? কেন আসে? সবাই আসে ক্ষুধার তাড়নায়। ভাগ্য ফেরাবার আশায়। শহরের অলীক কল্প-কাহিনী শুনে। ঢাকার হাওয়ায় নাকি টাকা ওড়াউড়ি। শুধু ধরতে জানা চাই।
ঢাকা শহরের ডাকনাম রিকশা সিটি। বর্তমানে সেখানে রিকশার সংখ্যা লক্ষকেও ছাড়িয়ে গেছে। একেক সময় রিকশা ছাড়া কিছুই চোখে পড়ে না। মনে হয় শহরটি রিকশাতে রিকশাতে উপচে পড়ছে। জনসংখ্যার পাশাপাশি যেন ভেঙেও পড়ছে। এবং জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে খাওয়া, মাথা মোটা এই রিবশাওয়ালাগুলো যাদেরকে আমরা সাক্ষাৎ উৎপাত বা উপদ্রব মনে করে না হয় দশটা গালিগালাজ করি। হ্যাঁ, এরাই কিন্তু গ্রামগঞ্জ থেকে আসা দীন-দরিদ্র। যে মানুষ গ্রামে তাদের সম্পূর্ণ পরিবার-পরিজন রেখে ঢাকায় চলে আসে শহরের মোহ আর আপাত চাকচিক্যের আকর্ষণে, তার প্রাথমিক বিভ্রান্তি কেটে গেলেই ওরা রিকশাচালক, রাজমিস্ত্রি বা দিনমজুরে কাজে নেমে গিয়ে অনিবার্যভাবেই বস্তিবাসী হয়ে পড়ে। এদেরই একটা অংশ লেগে যায় এপার্টমেন্ট তৈরির ও যোগালির কাজে। রিকশা সিটি নামের অলঙ্করণের সখে ঢাকা শহরের আরেকটি নাম হতে পারে এপার্টমেন্ট সিটি। যার মানে নিম্ন, মধ্য, উচ্চবিত্তদের আবাসন। এটাও এক ধরনের ব্যবসা। চলতি বাংলায় যাকে বলা হয় রিয়েল এস্টেট ব্যবসা। খুবই লাভজনক এবং সময়োপযোগী। এ ব্যবসার মধ্যে জমির মালিক, ডেভেলপার আর প্রোমোটাররা জড়িত থাকে। প্রত্যেকেরই নিজস্ব ভূমিকা। মূল উদ্যোক্তাদের মধ্যেও নানা রকম শ্রেণী বিভাগ থাকে। ফ্ল্যাটের দাম নির্ধারিত হয় আয়তন, অবস্থান ও পরিবেশের ওপর। এবং এই নিম্নবিত্ত শ্রমিক শ্রেণীর মানুষগুলোর কিছু অংশ যারা রিকশা চালাবে না চলে যায় ইট ভাঙা, সিমেন্ট মেশানোর কাজে। যার কোনওটাই মেধা নয়। পুরোটাই কায়িক।
রিকশা, বেবি ট্যাক্সি, টেম্পো চালক, নির্মাণ কর্মী এই বিভিন্ন ও বিচিত্র পেশার দীন-দরিদ্র শুধু কায়িক পরিশ্রমের বিনিময়ে বেঁচে থাকা মানুষগুলো সত্য। এদেরকে অস্বীকারের উপায় নেই। সংখ্যায় এরা কয়েক লক্ষ। এবং শুধু এই একটুখানি শহর যার কোণায় কোণায় উপচে পড়ে তোক এমনকি যার শ্বাস ফেলার জায়গাটুকুতেও মানুষের উপচে পড়া ভিড়, এই শহরটিতে মানুষ কি করে কে জানে! বা কেমন করে কি এক আশ্চর্য যাদুকরী ক্রিয়াবলে তা সত্ত্বেও খুঁজে পায় তাদের জীবিকা, আর মাথা গোঁজার জন্য ঢাকার মুক্ত ফুটপাত বা বস্তি সিটি নামে খ্যাত এই শহরের বস্তি আবাসনে এক চিলতে মাটি। পাবেই। আর সেই প্রত্যাশায় প্রতিদিন আরও মানুষ গ্রাম ছাড়ছে গড়ে দিনে প্রায় পঁচিশ থেকে ত্রিশ হাজার। তারা জানে এলেই হয় রিকশা, না হয় নির্মাণ।
যথারীতি শহরের ভিড় আরও বাড়ে। আরো রিকশা, আরও ট্যাক্সি, আরও নতুন নতুন বিল্ডিং। শহর তার আয়তনে না বাড়ক মানুষের প্রয়োজন ও চাহিদা বাড়ে। তাই পরিবার-পরিজন গ্রামে রেখে শুধু তাদের শরীরটা নিয়ে মেধাহীন পুরুষগুলো এভাবেই ‘একা’ এই শহরে চলে আসে। এখানে ওদের বিচিত্র জীবন। কঠিন ও করুণ জীবন। মানবেতর দুঃসহ জীবন। যে জীবন কোনও জীবনই নয়। কিন্তু তবুও যারা একবার এই নগর জীবনের স্বাদ পায় সেই যে ওরা একবার একা একা গ্রাম ছাড়লো আর সহজে ফেরে না। কেউ কেউ বছরে একবার যে যায় না তাও নয়। কখনো যায় না।
সর্বত্রই ওদের মানবেতর জীবন। বস্তিতে ঘুমটুকু বাদে সারাদিন রোদ-বৃষ্টিতে নেয়ে-ঘেমে কায়িক শ্রম শুধু। আমি ওদের বিচিত্র জীবনের গল্প শুনি। মাসে গড়ে ওদের আয় আড়াই থেকে তিন হাজার টাকা। কিছুটা তারা দেশে পাঠায়। বাকিটা নিজের জীবিকা নির্বাহ। ওদের বয়স পনেরো থেকে পঞ্চাশ।
এই কয়েক লক্ষ মানুষ যারা নিম্ন মধ্যবিত্তরও ঠিক নয়, বলা যায় বিত্তের শ্রেণী –বিন্যাসে যাদের কোনও ক্লাস নেই অর্থাৎ এই নো-ক্লাস বা ধরা যাক সিক্সথ ক্লাসের এই শ্ৰেণীহীন মানুষগুলো যাদের পরিবার দূরে–তাই বলে যাদের শরীর মরে যায়নি, যাদের রতি-কাম-কামনা সম্পূর্ণ জীবন্ত–এই নগরজীবনে সমস্ত দিন ধরে যন্ত্রের সঙ্গে জীবন ঘষা শেষ হলে রাতের অন্ধকারে তারা বছরের পর বছর কি উপোস থাকতে পারে? সম্ভব? ওরা সংখ্যায় কয়েক লক্ষ। বয়স ওদের পনের থেকে পঞ্চাশ। জীবন, যৌবনে ভরা। দিনের শেষে ক্লান্ত দেহ। হাতে কিছু টাকা। নিঃসঙ্গ তবে কামার্ত শরীর। সঙ্গে সম্পূর্ণ স্বাধীনতা। কেউ নেই বাধা দেয়ার। সমাজ নেই বলে সামাজিকতার ভয় নেই। কে দেখলো! কেউ দেখলো, বৌ-ছেলে-মেয়ে…। কেউ? নেই-নেই কেউ নেই, দেখার। বাধা দেয়ার। অপরাধবোধের কোনও বালাই নেই। পাপ-পুণ্য নেই। ধর্ম অধর্ম নেই। বেঁচে থাকা, হ্যাঁ, স্রেফ বেঁচে থাকা। ন্যূনতম বেঁচে থাকতে যতটুকু যেটুকু মানসিক কিংবা মানবিক যা নিতান্তই না হলে চলে না, চলবে না। কতটুকুই-বা জীবন ওদের? এত অমানবিক পরিশ্রমের পর একটি রিকশা বা টেম্পো বা হাড়ভাঙা পরিশ্রমী দিনমজুরের আয়ুই–বা কত? পনের বছর টানা খাটুনির পর সে ভেঙে যায়। শরীর বসে যায়। আর পারে না। এই মাত্ৰ-এইটকুই না জীবন ওদের। যাদের কোনও বাবুগিরি নেই। আছে শুধু বাবুদর্শন। বাবুরা যাদের গাড়িতে বসে। যারা বাবু টানে।
