বিবাহ এবং বিবাহ সম্পর্কিত চীনা গবেষণা কেন্দ্র এবং যুগপৎ নিখিল চীন মহিলা সংঘেরও নারী সম্পর্কিত গবেষণা সংস্থার উপাধ্যক্ষ শ্রীযুক্ত চেন শিনশিন বলেছেন, মেয়েদের কত অংশ এবং কী, জাতীয় জনপদ ও নগরীতে এইভাবে দ্বিচারী সুখভোগের ভাবনা জন্মাচ্ছে তা এখনও ঠিক বলা না গেলেও অস্বীকার করার নয় যে
“পরকীয়াকামী মহিলার সংখ্যা
লক্ষণীয়ভাবে বেড়ে চলেছে।”
প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যেতে পারে যে, চীনে আর্থিকভাবে প্রতিটি সমর্থ পুরুষ প্রাচীন সংস্কার অনুযায়ী কনকুবাইন’ অর্থাৎ রক্ষিতা রাখতে অভ্যস্ত ছিল। যে বিপ্লব ক্যুনিজমের মাধ্যমেও উড়িয়ে দেয়ার প্রচেষ্টা সত্ত্বেও বন্ধ করা সম্ভব হয়নি সঙ্গত কারণেই।
লিন্ডা হানের মতো মেয়েরা যারা দেঙ জিয়াও পেং-এর নতুন অর্থনীতির বিপ্লবে গত দু’দশক ধরে চীনের শহরাঞ্চল বিশেষ করে প্রধান প্রধান শহর যেখানে জীবিকার সম্ভাবনা, সেসব অঞ্চলের চেহারা দ্রুত পাল্টে দিচ্ছে। জনপদ কর্মস্থল, মনমানসিকতা, বৃত্তিপথ ও নারী-পুরুষ সম্পর্ক। এটা মাওয়ের কালের অববাহিকা থেকে ভিন্ন, যেখানে পার্টি নিযুক্ত নৈতিক প্রহরীর হুইসিল বা বাঁশি অনুযায়ী ছেলে ও মেয়েদের জীবন বাধা থাকতো একটি সুনির্দিষ্ট ছন্দ-লয় ও গতিতে। প্রহরের প্রতিটি কিবা দিবা কিবা রাত্রি।
আর দেঙ-এর অববাহিকায় লিন্ডা হানের মতো কর্মজীবী মেয়েরা আধুনিকতার হাত ধরে এসে দাঁড়িয়েছেন এমন জায়গায়, যেখানে তারা খোলাখুলি বলছেন দ্বিধারা জীবনের কথা।
শুধু পুঁজিবাদ নয় বিশ্বায়নের এই যুগে পশ্চিমি খোলামেলা জীবন আজ চীনেও প্রবেশ করেছে স্বাভাবিক নিয়মেই। এবং মেয়েদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতার সাথে সাথে ছেলেদের মতো মেয়েদেরও এমন বাসনা জন্মাবে এতে আশ্চর্যের কী আছে?
আধুনিক চীনে গত দু’দশকে দ্রুত গড়ে-ওঠা এই নগরকেন্দ্রিক জীবন পৃথিবীর আনাচে-কানাচে প্রায় সবদেশেই গড়ে উঠেছে। এর বিবিধ কারণগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক কারণটিই হলো সবচেয়ে প্রধান।
বিশেষ করে উন্নত দেশগুলোতে নারী ও পুরুষের দ্বিবিধ ধারার জীবন সম্পর্কে নতুন করে জানানোর কিছু নেই। তবে একটি কথা পরিষ্কার যে দ্বিধারা জীবন সেসব দেশেই অধিক স্বাভাবিক ও সাবলীল যেসব দেশে অর্থনৈতিক মুক্তি রয়েছে। তার মানে এই নয় যে অনুন্নত বা দরিদ্র দেশে দ্বিধারা জীবন নেই বা থাকতে নেই। আছে। বেশ জীবন্ত এবং বেশ জোরালো দাবি নিয়েই আছে, তবে এই দ্বিধারা জীবনের প্রকৃত রূপ, রুচি, প্রক্রিয়া ধনী বা উন্নত দেশের চেয়ে ভিন্ন প্রকৃতির। দেঙ জিয়াও পেঙ-এর নব্য অর্থনীতির আন্দোলনে আধুনিক চীনের চেহারা ভিন্ন। দরিদ্র আর অনুন্নত চীনেও আজ অঘোষিত পুঁজিবাদ, পশ্চিমি বিশ্বায়নের মওকামাফিক। ফলে মাওয়ের পর, চীনের প্রায় চল্লিশ ভাগ বাজার আজ বিশ্বের জন্যে উন্মুক্ত। ফলে গ্রাম ছেড়ে জীবিকার অন্বেষণে নগরকেন্দ্রিক এ নগরভিক্তিক জীবন যেমন বাড়ছে তেমনই বাড়ছে অর্থনৈতিক স্বাধীনতার সঙ্গে সঙ্গে যৌন স্বাধীনতার বিষয়টাও। তাহলে মানুষের বৈবাহিক জীবনের পাশাপাশি পরকীয়া জীবনের প্রয়োজনীয়তা কি সেই একই অর্থে ব্যবহার করা যাবে না? অর্থাৎ–
অর্থ+যৌনজীবন = বিবাহ+পরকীয়া জীবন।
.
খ.
চীনের মতো নগরকেন্দ্রিক জীবন, অনুন্নত এবং জনসংখ্যার অভিশম্পাতে জর্জরিত আরেকটি দেশ, যা চীন থেকে তেমন দূরে নয়, যে দেশের যে শহরটির কথা না। লিখলেই নয় সেই দেশটি, সেই শহরটি হলো, বাংলাদেশ এবং তার রাজধানী ঢাকা শহর।
গ্রামভিত্তিক, গ্রাম প্রধান মূলত কৃষিনির্ভর এই দেশ। আর কলকাতার চেয়েও প্রাচীন এবং শিল্পকলা ও শিক্ষার ক্ষেত্রে দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী দেশের এই ঐতিহাসিক শহরটির আয়তন মোট চার থেকে বেড়ে দশ মাইল ছাড়িয়ে গেলেও, জীবিকার অন্বেষণে গ্রামাঞ্চল থেকে ছুটে আসা বিশেষ করে দীন-দরিদ্র মানুষদের পরিসংখ্যানের সাথে মিলিয়ে বাড়তে পারছে না মোটেও। তাই বাংলাদেশের রাজধানী, এই শহরটি জনসংখ্যায় উপচে পড়ছে শুধু নয়, বরং প্রতিদিনই তা বাড়ছ। বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ শহর জনসংখ্যার হিসেবে মেগাসিটির পর্যায়ে পৌঁছতে আর সামান্য বাকি। কুড়ি বছর আগে চার মাইলজুড়ে ছিল কুড়ি লক্ষ মানুষ। আজ দশ মাইলজুড়ে রয়েছে প্রায় কোটির ওপর। জনসংখ্যা, শহরের আয়তনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে শতকরা একশভাগ বেশিই বেড়েছে। কেন বাড়ছে? কি কারণে বাড়ছে? এতটুকু শহরে এই উপচে পড়া মানুষগুলো কারা? এর কি কোনও উত্তর নেই?
প্রথমেই ধরা যাক শ্রমিক শ্রেণীর কথা। দরিদ্র শ্ৰেণী। এমনকি চীন বা ভারতেও বাংলাদেশের মানুষদের মতো এত সুবোধ বিকল্প কোনও শহর নেই, যেখানে তারা খেটে বেশি না হোক অন্তত জীবনের ন্যূনতম প্রয়োজন মিটিয়ে বেঁচে থাকবে। স্রেফ আলুসিদ্ধ আর কাঁচা লঙ্কা গালে দিয়ে দু’মুঠো ভাত। কোথাও না হোক রাজধানীতে। গ্রামে কাজ নেই। যা আছে থাকলেও, তা পছন্দের নয়। যেমন ক্ষেতের কাজ। লাঙল চালানো। হাল চাষ। ধানের রোয়া বোনা। এসব কাজ সর্বস্তরের বুভুক্ষুদের ঠিক পছন্দসই হয় না। সুতরাং ক্ষেতের কাজের জন্যে কৃষক পাওয়া বাংলাদেশে দুঃসাধ্য। আর এই মন্দাভাব চলছে বহু বছর ধরে। এবং গ্রামগঞ্জ থেকে অত্যন্ত সাধারণ শ্রমিক শ্রেণীর মানুষগুলো, যাদের প্রায় সবারই বিশাল পরিবার আছে তবুও গ্রামের এই একঘেয়ে ক্ষেতের কাজ হালচাষ–তাদের কাছে তেমন সুবিধের লাগে না। আর লাগলেও ঠিক মনমতো হয় না বলে তাদের গন্তব্য হয় রাজধানী শহর ঢাকায়। এমনকি কুলি-শ্রমিক বা মজুরশ্রেণী তারাও আর গ্রামে থাকতে চায় না। কারণ, রাজধানীর জীবনের অমোঘ আকর্ষণ তাদেরকে টানে। কারণ নগরজীবন। নগর দর্শন। শহুরে জীবন। যে জীবনে যথেষ্ট কষ্ট থাকলেও পাশাপাশি প্রচুর আনন্দ ভাণ্ডারও রয়েছে তার অফুরন্ত সম্ভার নিয়ে। গ্রামগঞ্জের এই আপাত নিরীহ শ্রমিক শ্রেণীর মানুষগুলো ক্রমে তাই ঢাকাকেই বেছে নেয় তাদের জীবিকার অন্বেষণে। জীবিকা ও জীবন যা পাশাপাশি হাত ধরে চলাফেরা করে।
