এই কয়েক লক্ষ পুরুষ, যাদের অধিকাংশেরই দিন শুরু হয় ন’টার বদলে সকাল ছ’টায়, চেয়ার-টেবিলে বসে নয় যারা দুই পা কচলে রিকশার চাকায় ঢেলে দেয় তাদের দেহের সমস্ত শক্তি, ঘামতে ঘামতে ভিজতে ভিজতে ক্লান্ত পরিশ্রমে ক্ষয়ে ক্ষয়ে নিঃশেষ হলেও যারা অভিযোগ বা দুঃখ’ এই বর্ণ বা এই ভাষা কোনও উচ্চারণেই যারা বলতে জানে না! জানে না, কারণ তারা অনভ্যস্ত এবং অনভ্যস্ত বলেই নির্বিকার। এবং মেধাহীন বলে নির্বিকার হতে হতে সব অমানবিকতায় অভ্যস্ত এবং বোধহীন, যারা কাজের শেষে সাজানো-গোছানো লিভিং রুমে না ঢুকে ফুটপাতের আবর্জনার সামনে বসে শরীরের বর্জ্য পদার্থ নিক্ষেপ করতে করতে গল্প করে আর বিড়ি টানে অন্যদের সঙ্গে। যারা ফ্যানের নিচে শুয়ে রাতের সংবাদ শুনতে শুনতে ক্লান্ত শরীর মেলে দিতে পারে না। স্ত্রীর করুণা ও স্নেহের করতলে বা গভীর রাতে শান্তি খুঁজে পেতে নেই বিশাল বক্ষ জুড়ে এক জোড়া স্তন, যেখানে মুখ খুঁজে পড়ে কি নিশ্চিন্তে ঘুমানো যায়। নেই একখানা গরম ভাত বেড়ে অপেক্ষারত স্নেহময়ী মা কিংবা আদরের ছোট মেয়েটি। ওদের কি আছে? কোন ছাই! কিছু কি আদৌ আছে?
তাই দিনের শেষে ওরা কোথায় ফিরবে? সোজা–নোংরা আবর্জনাভরা বস্তি? সেতো অনিবার্য। ওদের ফেরার দ্বিতীয় জায়গা কোথায়? ওদের স্ত্রী নেই, ঘর নেই, গরম ভাত নেই। তাই ওদের স্থির করতে হয় ফেরার জায়গা। কেননা আর কিছু না থাক, ওদের মন তো আছে! মন থাকলে অনুভূতি আছে। আর অনুভূতি যা এমন সঙ্কটে সবচেয়ে আগে সাড়া দেয় তার দুর্বল জায়গাগুলো। আর এই একাকিত্ব–এই ক্লান্তিতে সবচেয়ে দুর্বল জায়গা যেখানে মুহূর্তেই খুঁজে পাওয়া যায় অপার আনন্দ, তা ব্যক্তির যৌন আনন্দ। একটি কমনীয় নারী শরীর। তার সঙ্গে, তাকে নিয়ে কিছুক্ষণ খেলা পারস্পরিক বিনোদন। এবং এই আনন্দ সন্ধানে বা অন্য কোনও সুখানুভূতির মধ্যে যা সবচেয়ে আদিম–এইসব পুরুষ এইসব রিকশাওয়ালা বা ইটভাঙা মানুষেরা রক্ত জল করা হাতে সীমিত পয়সা নিয়ে ছুটে যায় পতিতালয়ে কিংবা ভাসমান যেখানে তার প্রবৃত্তিকে প্রসন্নিত করতে পারবে সহজেই। এবং ওদের সংখ্যা কোনমতেই হাজারে নয়।
সে নিজেই ভাসমান। সুতরাং সে ভাসছে সবচেয়ে সহজলভ্য শিল্প, পতিতা পল্লীতে। ভাসমান পতিতারাও আছে। ওরা হাতের নয় শুধু। ওরা নখেরও নাগালে। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলেই ওরা বস্তির আশপাশে এসে ভিড় জমায়। ওরা জানে এবং চেনে কারা ওদের খদ্দের। একঝাক রঙিন পায়রার মতো। বিচিত্র রঙিন পোশাকে ওরা মুখে গাঢ় মেকাপ মেরে ব্যাগে রাখা কনডম নিয়ে প্রতীক্ষা করে বুভুক্ষুদের। অপেক্ষায়, যারা কামার্ত। অস্বাভাবিক যৌনাচারেও তাদের আপত্তি নেই। তাদের প্রয়োজন ক্ষুন্নিবৃত্তি নিবারণ। একেকটা বস্তি একেকটা অপরাধের স্বর্গরাজ্য। কিন্তু এই বস্তিবাসীরা এত শিক্ষিত নয় এসব সাফিস্টিকেটেড শব্দ বোঝার মতো। ওরা জানে আনন্দ। নির্মল আনন্দ। জানে, নারী দেহটি দলিত-মথিত করে উপচে পড়া ভাসমান পতিতার দ্রুত এবং সংক্ষেপ এবং অল্প খরচ। আর তাই রাতের অন্ধকারে কামার্ত পুরুষগুলো ছোটে। যে যেখানে যেভাবে পারে, একটু জায়গা করে নেয় আর কোনও রকমে দুই পা বিযুক্ত করে কিছুক্ষণ যৌন আনন্দশেষে স্থলন। ব্যাস্ ভাসমান বা চাইলে পতিতাপল্লী। যেখানে সময় ও আনন্দ দুটোই বেশি। তাই খরচও বেশি। আর রাজধানীর এই কয়েক লক্ষ নো-ক্লাস বা সিক্সথ ক্লাস যারা দিনমজুর, দীন-দরিদ্র হতভাগ্য রিকশা বা বেবি ট্যাক্সিচালক যারা গ্রাম ছেড়ে চলে আসে শহরে, তারা মানুষ কিন্তু তারা স্রোতের বাইরের মানুষ। তারা পাপ-পুণ্য, ধর্ম-অধর্ম, সমাজ-সংস্কারমুক্ত। স্বাভাবিকভাবেই তারা সরল, সাবলীল জীবনে বিশ্বাসী। তারা খেটে খায়। ফুর্তি করে তাদের ক্রাইসিস অনুযায়ী। যায় মন যেখানে যে জাহান্নামে যেতে চায়। নিজের ভালোমন্দে ওদের ভ্রুক্ষেপ কম। ভাসমান-পতিতাপল্লী, গেস্ট হাউজ, কিংবা কয়েকজন মিলে একজন ভাড়া করে কোথাও গিয়ে–কিন্তু সবই পকেটের রেস্ত বুঝে।
উপসংহারে বলা যেতে পারে–এই কয়েক লক্ষ স্বল্পায়ু শ্ৰেণীহীন হতদরিদ্র মানুষ, ওদের নেই কোনও সেক্স ইনস্পেকটর। রাজধানীতে এই কয়েক লক্ষ স্বাধীন ও মুক্ত মানুষ যৌনজীবনের ক্ষেত্রে বলতে হয় সবচেয়ে ভাগ্যবান। ওদের ক্রাইসিস অন্য দশজনের মতো। শুধু পার্থক্য এই যে, ওরা যৌনজীবনে এত বেশি স্বাধীন ও মুক্ত যে, কামের এই বসন্ত উৎসবে ওরা রাঙিয়ে মাতিয়ে দিয়ে দ্রুত চলে যায় পৃথিবী ছেড়ে। ওরা স্বল্পায়ু। অমানবিক এবং অসম্ভব কায়িক পরিশ্রম, অযত্ন, অপুষ্টি, বিভিন্ন অসুখ, অবিচার, অবাধ ও অধিক যৌন অত্যাচার ও রোগব্যাধি ইত্যাদিশেষে ওরা দ্রুত আর সংক্ষেপ।
২৫. পরকীয়া
বাইশ বছর আমি প্রবাসে। খোদ নিউইয়র্ক শহরে। বিগ এ্যাপেল সিটির একেবারে হার্ট বরাবর আমার বাসা। আমার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকে এটুকু বলা যায় যে, প্রবাসের বাংলাদেশিদের জীবনে পরকীয়া, বিলাসিতার বদলে একান্ত প্রয়োজনীয় একটা ব্যাপার। পরকীয়া মূলত হয় প্রবাসের একাকিত্ব নিঃসঙ্গতাকে ঘোচাতে। নিঃসঙ্গতা, প্রবাসের একটি লাগোয়া অসুখ। এত সুখ, এত আছে তবুও, নিঃসঙ্গতা। যার সংসার আছে সেও ফিরে ফিরে বেলতলায় যায়, যেতে পারে, যায়ও। যার নেই, তার যাওয়া তো অনিবার্য। পরকীয়া–যা দেশের পরিবেশ থেকে দূরত্ব–প্রবাসের হতাশা আর শূন্যতা থেকে সৃষ্ট অনেক যন্ত্রণাদায়ক, নিঃসঙ্গ যান্ত্রিক জীবনে বেঁচে থাকার বিকল্প ব্যবস্থা। প্রবাসজীবনে পূর্ণিমার চাঁদের মতো। আলোর গভীরেও লুকিয়ে থাকে অনেক কালো গর্ত। আমরা বলি চাঁদের কলঙ্ক। ”জ্বলজ্বল বা চকচক করলেই সোনা হয় না” চাঁদ, এক পিঠে যার আলো, অন্য পিঠে অন্ধকার! প্রবাসও ঠিক তাই। স্বর্গ-নরক। চিত্ত এবং বিত্তের সুখ বিড়ম্বনা। হাসি-কান্না। জীবন-মৃত্যু। সব–সবই, একসঙ্গে এখানে লঙ্গরখানার খিচুড়ির মতো মিটে যায়। মানুষ খায় গোগ্রাসে।
