–করি না। কিন্তু বুঝতে পারি তুমি কি বলছো। এই কাজ তো খুব গুরুত্বপূর্ণ। দাও আরেকটা সিগ্রেট দাও। তোমার কথা আরো বলো। ভালো লাগছে।
বারে তখন জমজমাট আড্ডা পিং-পং টেবিলের জন্যে লাইন ধরে লোক। ড্যান্স ফ্লোরটা দারুণ মেতেছে। জোড়ায় জোড়ায়-যৌবনের তরঙ্গ পুরো বারটা জুড়েই। মধ্য বয়সের সব যুবক-যুবতী। যৌবন তরঙ্গে–উত্তাল সমুদ্রের জোয়ারের মতো শ্বেতশুভ্র ঢেউয়ের মতো আছাড়ি-পিছাড়ি খাচ্ছে জোড়ায়-জোড়ায়।
–নাচবে! ডেলোরেস জিজ্ঞেস করলো।
–নাচতে জানি না।
–দেখিয়ে দেবো।
–আরেক দিন, আজ না।
–চলো প্লিজ! আমি তোমার সাথে নাচতে চাই। তোমার চোখ সুন্দর। আমি তোমার চোখের দিকে তাকিয়ে ভাসতে চাই।
–পরে যাবো, আরো বলো তোমার কথা। তোমার স্বামী-ছেলেমেয়ে।
–আমি ডিভোর্সড। ছেলেমেয়ে নেই। মাতালটা শরীরের লোভে বিয়ে করে দু’বছর পরে অন্য মেয়ের সঙ্গে চলে গেল। আমি তখন গরিব। এতো সুন্দরীও ছিলাম না। আমি এই অবিচারের প্রতিশোধ নিয়েছি। এখন আমার অনেক টাকা। ম্যানহাটানে এপার্টমেন্ট। লোকটা ফিরে আসতে চায়। ইউ কিডিং! আমি খুউব ভালো আছি একা। কিন্তু নিঃসঙ্গতা মাঝে মাঝে কুরে কুরে খায়। আমি একজন ভালো সঙ্গীর অপেক্ষায় আছি পলাশ। যাই হোক এবার চলো নাচবো।
–চলো। তবে আগেই বলেছি, আমি নাচতে জানি না।
–বলেছি তো শিখিয়ে দেবো।
ডেলোরেস হেসে পলাশের হাত ধরে টান দিল।
ডি-জের নিয়ন্ত্রণে ড্যান্স ফ্লোরে তখন মাকারিনা বাজছে। ফ্লোরে সবাই ভীষণ মুডে। ডেলোরেস ওর পেন্সিল হিলের ওপর পাক দিয়ে পলাশের কোমরে হাত দিল। পলাশের ডান হাতটা নিজের বাম হাতে ধরে নিজের ডান হাত পলাশের কোমরের পেছনে দিয়ে ওকে ঘুরপাক খাওয়াতে থাকলো। পলাশ ওকে ফলো করলো। ডেলোরেস প্রতিটি স্টেপ ওকে ধরিয়ে দিল। আধ ঘণ্টার মধ্যে পলাশ ওর ডান পা বাম পা-তে ঠিকমতো বিট মিলিয়ে সবার সঙ্গে মাকারিনা নাচতে থাকলো। এবার ডি-জে স্লো ড্যান্সের মিউজিক দিলো। লাভ সং। ভীষণ স্লো। শুধু বুকে মাথা আর হাতে হাত রেখে ঢেউয়ের মতন দুলে দুলে নাচা ছাড়া করার কিছু নেই। পলাশের বুকে আচমকা ডেলোরেস ওর মাথা রাখতেই পলাশ, আঁতকে উঠে মনে মনে বললো, সর্বনাশ।
–পলাশ, আমার নিঃসঙ্গতা ঘোচানোর জন্যে তোমার মতো সুন্দর আকর্ষণীয় সুপুরুষ আমি দু’বছর ধরে খুঁজছি। আমি কামার্ত! আমি রিক্ত! আমি … আমি …। জানো! আমার অনেক অর্থ। দেখো আমার কানের দুটো হীরের দাম পঞ্চাশ হাজার ডলার। আর শরীরে এখন দুশো হাজার ডলারের হীরে আছে। ব্যাংকে আমার লক্ষ লক্ষ টাকা। কিন্তু শান্তি নেই। আমি রাতের বেলায় কারো বুকে মাথা রেখে দু’বছর ঘুমোইনি। মাঝরাতে বুকের ভেতর নিঃসঙ্গ সমুদ্র গর্জে ওঠে। এই অর্থবিত্তের কি মূল্য, বলো! তুমি যদি চাও আমরা ডেইট করে দেখতে পারি যে, আমরা একজন আরেকজনকে ভালোবাসতে পারি কি, পারি না।
পলাশ, এসবের কিছুই বুঝতে পারছে না। এতো দ্রুত সব ঘটছে। অথচ ডেলোরেসের মতো মেয়েকে ‘না’ বলাটাও বোকামো। সেতো একটা সোনার হরিণ!
–ডেলোরেস বাড়ি যেতে চাই। মদ আর খাবো না। বমি আসছে।
–আমার বাড়িতে চলো। যত্ন করবো।
–না ডেলোরেস। নিজের বাসায় না ফিরলে রুমমেট দুশ্চিন্তা করবে।
–ম্যানহাটানে-আমি তোমাকে যে একা ছাড়তেই চাই না। তুমি মাতাল। রাস্তায় পড়ে যেতে পারো।
–ডেলোরেস আমি ভালো থাকবো। ভেবো না। আজ যাই।
–ঘরে গিয়ে ফোন করবো।
–হ্যাঁ।
–এই নাও কার্ড। সব নম্বর দেয়া আছে। ফিরেই কল করবে, প্রমিজ! তোমার নম্বরটা!
–‘নেই ডেলোরেস। রুমনো সেটা ওর চিতায় নিয়ে গেছে। আসি।’ বলে পা দুটো কোনরকম টেনে পলাশ হাঁটতে শুরু করে।
ডেলোরেস তাকিয়ে দেখলো পলাশ সামান্য দুলছে। রাস্তায় বাতির নিচে এক কোণায় দাঁড়িয়ে হাতের কার্ডটা কয়েক সেকেন্ড পড়লো। ডেলোরেস রড্রিগ্যাজ। সিনিয়র কন্ট্রোলার। এস ই সি। সর্বনাশ! এই কার্ড যদি সত্যি ওর হয়ে থাকে তবে ও কত বড়মাপের মানুষ। কিন্তু পরিস্থিতির কাছে কত তুচ্ছ, অসহায়! এই মেয়ে তো সোনার হরিণ!
না–না এ আগুনে আর ঝাঁপ দেয়া নয়। এবার পালাতে হবে। জীবন নিয়ে। রুমনো আমার সব নিয়ে গেছে।
কার্ডটা ছিঁড়ে রাস্তায় ফেলে দিয়ে একটা ট্যাক্সি ডেকে পলাশ দ্রুত বাড়ি ফিরে গেল। পরদিন রাতে সে রিনাকে ফোন করলো। বাবাকেও। সবাইকেই জানালো ওর দুর্বিষহ প্রবাস জীবনের কথা। ‘বাবা এবার দেশে ফিরতে চাই। আর পারছি না। কত বছর রিনা আর মেয়েদের দেখিনি। এবার ফিরে একসঙ্গে বাঁচতে চাই।’
কি বলিস পলাশ! লোকেরা একটা আমেরিকার ভিসার জন্যে মরে যাচ্ছে। খবরদার! এই চিন্তাও করিস না। জানিস দেশের কি অবস্থা! বসে খেলে রাজার ভাণ্ডারও ফুরিয়ে যায়, তুই নিশ্চয়ই পাগল হয়ে যাসনি। দেশ, দেশ নেই। চুলোয় গেছে। সরকার একটা আস্ত জানোয়ার! একটা এঁটো শুয়োর! আমি গাজীপুরে দশ লক্ষ টাকার জমিতে সামান্য বায়না দিয়ে দিয়েছি। বাকি টাকা এক বছরের মধ্যেই লাগবে। ওসব চিন্তা মাথায় কিছুতেই জায়গা দিবি না। তুই দেখ কি ভাবে টাকাটা দ্রুত পাঠাতে পারিস। পাগল না হলে কি কেউ আমেরিকা থেকে ফিরে আসতে চায়। রিনাও নির্লিপ্ত রইলো।
‘না বাবা পাগল হয়ে যাইনি। তবে হবো। শিগগিরই হবো।’ বলে, পলাশ ফোন নামিয়ে আনমনা হাঁটতে হাঁটতে সেই বারে গেল।
