এমনি করেই আরো দু’বছর পার হয়ে যায়। রুমনো যদি চলে যায়! তার চেয়ে বরং ওকে বলাটাই ভালো নয় কি! রুমনোকে সে ছেড়ে থাকতে পারবে না। রিনাকে সে কি দোষে ডিভোর্স দেবে! বরং রুমনোকে সব কথা খুলে বলবে। বলবে, রুমনো–কে সে রিনার চেয়েও বেশি ভালোবাসে। নিশ্চয়ই সে তা বুঝবে।
–কি ভাবছো! চোখে জল কেন! এ কি, পলাশ!
–তোমাকে একটা কথা বলা প্রয়োজন।
–বলো। হাতে চায়ের কাপটা কেঁপে উঠলো। ‘বলো, কি বলবে?’
–বলছি। চলো ভেতরের ঘরে গিয়ে বসি।
–রুমনো, আমার অপরাধ নিও না। আর পারছি না, না বলে থাকতে। তোমার মতো সুন্দর মনের মানুষ আমি জীবনে কাউকেই দেখিনি। তোমার মতো ভালোও কাউকে দেখিনি। লোকে তোমাকে ভুল বুঝে, বুঝুক। আমি কিন্তু জানি, তুমি ভালো। খুব ভালো।
–রুমনো আমি বিবাহিত। দেশে আমার স্ত্রী এবং দুই মেয়ে আছে। রুমনো পলাশের কথার কোনও উত্তর দিলো না।
–কি কিছু বলছে না যে! রুমনো! কিছু বলো! বলো আমি নষ্ট! খারাপ।
–‘কি বলবো বল। সবই ঠিক আছে।’ বলেই রুমনো গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে গেল।
সেই রাতেই মিডটাউনের ক্রসিংয়ে বিরাট এক গাড়ি এক্সিডেন্টে রুমনো মাতাল অবস্থায় মারা গেল। ওর মৃত্যু নিয়ে পত্রপত্রিকায় হৈ-চৈ। পুলিশ এসে পলাশকে মর্গে নিয়ে গেল। দেহ সনাক্ত দাহন ইত্যাদি সব পলাশই করেছিল। দাহনের আগে বিয়ের কাজটুকু ফিউনারেল হোমেই পলাশ মন্দির থেকে ব্রাহ্মণ ডেকে এনে সম্পন্ন করলো। ওকে শাখা সিঁদুর পরিয়ে দিলো। রুমনো হিন্দু, পলাশ নয়। কিন্তু ওর কাছে বিয়েটা ভীষণ জরুরি মনে হলো। রুমনোর ইচ্ছা ছিল পলাশের স্ত্রী হওয়ার। এই ইচ্ছে সে অপূর্ণ রাখবে না। কিছুতেই না। হলই-বা বিয়েটা এক মৃতের সঙ্গে। তবুও সে, তার। রুমনোর মৃত্যু ওকে শূন্য করে দিয়েছে। সেই শূন্যতা পূরণ করতেই বারে যাতায়াত। তারপর থেকে যথেষ্ট সুযোগ পেলেও আর কোনও মেয়ের সঙ্গে সে বন্ধুত্ব করতে রাজি নয়। এই আগুনের তাপে একবার সে শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু ঐ যে মেয়েটি মুচকি হাসছে! দেখতে স্বর্গের অপ্সরীর মতো। দেখেই ইচ্ছে হচ্ছে জড়িয়ে ধরে ওর কামরাঙা ঠোঁটে চুমু খেতে।
–‘হাই’! মেয়েটা ওর টেবিলে এলো। ইংরেজিতে বললে, সেই থেকে কি এতো ভাবছো কি! তুমি কি ভারতীয়? ভারতীয় পুরুষদের আমার খুব ভালো লাগে। ওরা খুব ভালো। ওহ নামই বলা হয়নি। আমার নাম ডেলোরেস! তোমার নাম?
–পলাশ। আমি ভারতীয় নই। বাংলাদেশি, কেমন।
–খুব সুন্দর নাম। তোমার পাশে কি বসতে পারি?
–হ্যাঁ, কিন্তু! কিন্তু তোমার সঙ্গে ঐ যেলোকটা এসেছে সে কিছু মনে করবে না? আমি কিন্তু কোনও ঝামেলা চাই না।
না না। ওর সাথে পরিচয় বারে আসার পর। সে আমার কেউ নয়। জাস্ট কম্পোনি। ভেবেছিলাম চতুর, কিন্তু এক্কেবারে গাধা। এবার বলো তুমি কেন এত গম্ভীর। কি হয়েছে! জানো, তোমার চোখ দুটো ভীষণ বিষণ্ণ। সেই থেকে তোমার দু’চোখ আমাকে তাড়া করছে। তোমার চোখে কি যেন একটা রহস্য আছে। তুমি কি জান?
–জানি। আরেকটি মেয়েও আমাকে বলেছিল। তার নাম রুমনো। যেচে এসে তোমার মতোই পাশে বসেছিল। একদিন ফুরুত করে কোথায় যেন পালিয়ে গেল। তা বলো তুমি কি জন্যে এসেছো?
–এমনিই। না চাইলে চলে যাবো।
–না-না বসো। মানে, তোমার মতো সুন্দরী মেয়ে ক্লাবে এতো সুন্দর ছেলেদের রেখে আমার পাশে…!
–‘সিগ্রেট খাবে?’ বলে জাদুকরী হাসিতে দাঁড়ালো ডেলোরেস।
–খাবো। আছে?
–‘আছে। মার্লবরো। রেগুলার। এই নাও।’ বলে ঠাস করে লাইটার জেলে সিগ্রেটটা ধরিয়ে দিল। নিজেও একটা সিগ্রেট খেতে খেতে বললো, রুমনো কি তোমার স্ত্রী না বান্ধবী! পলাশ আঁতকে উঠলো। কি কঠিন প্রশ্ন। সর্বনাশ! একথা তো সে ভাবেনি কখনো! কি উত্তর দেবে? স্ত্রী? আমার স্ত্রীর নাম তো রিনা। কিন্তু যাকে সিঁদুর পরালাম! ছি! এসব কি ভাবছি? আমি কি পাগল হয়ে গেছি! একটা মানুষ ক’জনকে ভালোবাসে!
–কি, বলবে সে!
–স্ত্রী, রুমনো আমার স্ত্রী। হলো! কেন জানতে চাইছো? তোমার সাথে আমার সামান্য পরিচয়ে এতো কথা কেন জিজ্ঞেস করছো? তুমি খুব নাকগলাও।
স্যরি, আমি এতো কিছু ভেবে বলিনি। ইটস ওকে। আমিই বরং স্যরি। আসলে কি জান। রুমনো মরে গেছে। আমার খুব কষ্ট হয় ওর জন্যে, তাই চেঁচিয়ে উঠেছি।
–আমি খু-উ-ব দুঃখিত। যাচ্ছি।
–না, তুমি বসো। তুমি বসে থাকবে। কিছুক্ষণ অন্তত। তোমাকেও আমার ভালো লেগেছে। অনেকটা রুমনোর মতোই তুমিও। রুমনো একদিন আমার জীবন জুড়ে এমনি করেই এসে বসেছিল…। তোমার মতোই সুন্দরী সে। কমনীয়। স্মার্ট। শুধু ওর চুলগুলো ছিল কালো এবং কোকড়ানো। বলে রুমনোর ছবিটা ওয়ালেট থেকে বের করে দেখালো।
–অদ্ভুত সুন্দরী। আমি দুঃখিত যে সে বেঁচে নেই। তোমার দুর্ভাগ্য।
–ডেলোরেস এবার তোমার কথা বল।
এবার একটু পজ দিয়ে হাতের সিগ্রেটটা নিবিয়ে ফেলে বললো–আমি সুন্দরী এবং ধনী, কিন্তু নিঃস্ব। তাই বারে আসি। বন্ধুর খোঁজে। এক বছর ধরে প্রকৃত বন্ধু খুঁজছি। অনেকের সঙ্গে বসেই মদ খাই কিন্তু মনের মতো কাউকেই পাচ্ছি না, যাকে সত্যিকারের বন্ধু বলা যায়। ঐ যে লোকটার সঙ্গে মদ খেলাম, সে একটা স্টুপিড। পরিচয়ের পরেই বলে চু-উ-মু খাবে। আই হেইট হিম।
–আমার বাবা-মা ডিভোর্সড। পোর্টোরিকো থেকে এখানে এসে ওয়াল স্ট্রিটে কাজ করেছি। সেখানে ট্রেনিং নিয়ে ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকিং শিখেছি। এখন আমি ওয়াল স্ট্রিটে চাকরি করছি খুব উঁচু পদে। নাসডাক স্টকের সিম্বল নিয়ে টিভি-তে যে ফিতে নড়ে, আমি সেসবের দায়িত্বে। তুমি স্টক করো?
