ভাবছে, বাবা-চাচা, স্ত্রী কেউই রাজি হলো না ওর দেশে ফিরে যাবার সিদ্ধান্তে।
ইস! কার্ডটা থাকলে ডেলোরেসকে আজ একটা ফোন করা যেতো। বারে তিন আঙুলে মদের গ্লাস ধরে রাজ্যের ভাবনা মাথায় নিয়ে সে একা বসে আছে। ডেলোরসের কথা ঘুরেফিরে মনে পড়ছে। কিন্তু নম্বর নেই। ভাবলো, সেই বরং ভালো। কী প্রয়োজন এই মায়ার খেলার! ডেলোরেস ক্ষমা করো। তুমি সুখী হও। তোমার ইচ্ছে পূর্ণ হোক। তুমি কাউকে খুঁজে নাও। ভাবতেই ডি-জে লাইটটা কমিয়ে দিয়ে স্লো ড্যান্সের মিউজিক ছাড়লো। ফ্লোরে সে একা নাচতে থাকলো। আবছা আলো আঁধারে ওর চোখ গিয়ে পড়লো অন্য কোথাও। রিনা আর তার দুই মেয়ে। দৌড়ে আসছে ওকে দুয়ারে দেখে। কল্পনায় সে দেশে ফেরে। আবছা আলোয় নাটকীয়ভাবে খেলে যাচ্ছে ওর চোখের সামনে রিনা, মলি আর মেঘনার আলো-অন্ধকার মুখ।
সেই ছায়ায়–ওরা সবাই ঘুরতে থাকলো দুয়ারের একটা গাছের নিচে। মাথার উপর পূর্ণিমার মস্ত চাঁদ। গাছে দুটো ফুল, ডালপালাগুলো সবুজ পাতায় ছাওয়া। ওরা ঘুরে ঘুরে নাচছে। এর মধ্যে ফুলকির মতো হঠাই কোত্থেকে ডেলোরেস এলো। পলাশ শুধু দুই বাহুতে ওকে জড়িয়ে নিয়ে ঠোঁটে ঠোঁট ঘষলো। মুখে কেউ কোনও কথা বললো না। ফ্লোরে তখন, স্লো মিউজিক। দু’জনেরই চোখে অল্প জল–ক্লাবে নিভু নিভু সোনালি আলো। ডেলোরেস কখন থেকে যে ওর বুকে মাথা রেখে নাচছে, কিছুতেই সে মনে করতে পারছে না। একবার ভাবলো একি সত্যি! নাকি কল্পনা। হঠাৎ দু’চোখে কিছু একটা অনুভব হলো। ডে-লো-রে-স …।
২২. পর্নো কুটিরে কুটিরে
ক.
নগরকেন্দ্রিক জীবনের আরেকটি দিক, যা দারিদ্রের নয়। পুঁজিবাদ বা বিত্তবাদ যাই বলা যাক।
এই জীবনের সঙ্গে জড়িত লক্ষপতি, কোটিপতি, যারা আপার ক্লাস। নিরাপত্তা প্রহরী-ঘেরা প্রাসাদতুল্য আধুনিক স্থাপত্যশিল্পের সৌন্দর্য ও শোভামণ্ডিত নয়নাভিরাম আবাসনে যারা থাকে। যাদের গ্যারেজে একাধিক এস.ইউ.ভি, ইম্পোর্টেড এবং অবশ্যই ব্র্যান্ড নিউ। এয়ারকন্ডিশন অফিসে যাদের বিদেশি ডেলিগেটরা পর্যন্ত এল.সি. কিংবা ফরেন এক্সচেঞ্জ কমিশনের পলিসি নিয়ে কোনও বাঙালির কৃপাধন্য হতে ভৃত্যের মতো করুণ মুখ করে বসে থাকে। পানির বদলে ইম্পোর্টেড জার্মান বিয়ার কিংবা প্রাচীন দামি স্কচ অথবা ইম্পোর্টেড বয়স্ক চিজ সঙ্গে রাশ-শ্যান কেভিয়ার! মহাখালী সিগনাল থেকে অদূরেই গুলশান, বনানী, বারিধারা। জি-হ্যাঁ, আমি সেই এলাকার সব ভাগ্যবান বাঙালি বিত্তশালী যুবাদের কথাই বলছি, যারা সংখ্যায় স্বল্প তবে সেক্রেটারিয়েট টু সংসদ এবং আরও অনেক কিছুই যাদের নাগালে।
প্রধানত গুলশান-বনানী-বারিধারা এলাকাগুলোই বেছে নেন এইসব বিত্তশালী এবং গজিয়ে-ওঠা আরো নব্য বিত্তশালী বা বিদেশ থেকে যেসব কোটিপতি দেশে আজকাল বাড়িঘর কিনতে চান বা ব্যবসা করেন, তারাও এই তিনটে এলাকাকেই টার্গেট করেন। এবং এই এলাকার বাসিন্দাদের চলাফেরা এবং তাদের আনুষঙ্গিক অন্য ব্যাপার স্যাপারগুলো দেখলে বুঝতে কিছুতেই কষ্ট হবে না-ওরা আপার ক্লাস। এবং নিরঙ্কুশ আপার ক্লাস, যেখানে পশ্চিমি হাওয়া, অর্থনৈতিক বিপ্লব-পাল্টে যাওয়া সমাজ ও তার রুচি, নাগরিক সভ্যতা এবং সংস্কার তার নব্য অঙ্গসজ্জার অলঙ্করণে কাজ করে চলেছে।
যাদের জীবনযাত্রা বাংলাদেশের মিডল ও লোয়ার ক্লাসের মানুষদের সম্পূর্ণ বিপরীত। কিন্তু একটি মূল আধ্যাত্মিক জায়গায় এসে সবার সঙ্গে তাদের অভিযান তীব্রভাবেই লক্ষণীয়। তাদের যৌনজীবন এবং যৌনজীবনে ক্রাইসিস। পার্থক্য তার-স্বাতন্ত্র, শোভা ও অলঙ্করণে, ক্লাস বুঝে। –কাম ও রতির অনিবার্য ক্ষুধা-কামার্ত শরীরের প্রহরে প্রহরে পীড়ন। পেষণের আকাক্ষা, অনুভূতি। দ্রুত ক্রিয়াশীল হৃদয় ও মন, লিঙ্গবিশেষে, জায়গামতো গজে-ওঠা দুটি সুউচ্চ পর্বত চূড়া-একটি যযানি ও একটি লিঙ্গ। এই নেটওয়ার্কটি, যার কেন্দ্রস্থল হলো দশ বিলিয়ন কোষ সমৃদ্ধ মস্তিষ্কের নার্ভাস সিস্টেম, সেখানে ক্লাস বলে কিছু নেই। না বিত্ত, না ক্ষমতা। এখানে সঙ্কেত ধ্বনি পড়লে অবস্থা সবার জন্যেই এক, ও একরকম জরুরি।
সুতরাং সেক্স ক্রাইসিস সব ক্লাসের মধ্যেই একরকম। এবং ক্রাইসিসের নিরাময়ও এক। শুধু রাস্তা ভিন্ন। একজন রিকশাচালক বা দিনমজুরের জন্যে যদি হয় সস্তায় ভাসমান পতিতা, তবে একজন মধ্যবিত্ত পরিবারের চাকরিজীবী পুরুষটির জন্যে আজকাল শহরের মধ্যেই গজে-ওঠা যে-কোনও সুবিধেমতো একটি গেস্ট হাউজ। কিন্তু যারা উচ্চবিত্ত? সো-কলড-আপার ক্লাস?
শুধুই কি মিডলাইফ? আর্লি-ওল্ড, ক্রাইসিস কার হয় না? এমনকি চৌদ্দ বছরের কিশোর-কিশোরী–পঁয়তাল্লিশের বিবাহিত যুবক-যুবতী এবং পঁয়ষট্টির বৃদ্ধ-বৃদ্ধা। হতে পারে বিধবা বা বিপত্নীক। এক কথায় যে-কোনও মানুষ, যে-কোনও বয়সের, যতক্ষণ তাদের মন-অনুভূতি ও শরীর, ক্রিয়া ও সংবেদনশীল থাকছে, যতক্ষণ তাদের শরীরের প্রয়োজনীয় সেক্সজনিত হরমোন রক্তে বইছে এবং যতক্ষণ তারা সুস্থ, কাম এবং রতির তাড়না ততক্ষণ জীবন্ত। আর এই তাড়নাগুলো পরিস্থিতি ও পরিবেশ বুঝে কখনো কখনো বিবাহিত জীবন ছাড়িয়ে চলে যায় বিবাহের বাইরে। এবং গিয়ে তারা প্রাণ পায় ক্রাইসিস বুঝে অবৈধ প্রণয়ে কিংবা পতিতালয়ে। তবে আভিজাত্য যেখানে, যারা আপার ক্লাস। তাদের বেলায় আর্লি মিড বা ওল্ড লাইফ ক্রাইসিসের নিরাময় আসে অন্যান্য ক্লাসের চেয়ে ভিন্ন ক্যাপসুলে এবং এই ক্যাপসুলগুলো বেশ দামি বলে ওরা রিকশাওয়ালা বা কেরানি বাবুদের ধরাছোঁয়ার বাইরে। কিন্তু সব সত্ত্বেও মাঝে মধ্যে যে এই আপার ক্লাসের বাবুরা ভাসমানদেরকে একেবারেই যে ধরে বা ছোঁয় না সেকথাও ঠিক নয়। তবে দামি ক্যাপসুলই তাদের জন্য অধিক প্রযোজ্য।
