রূপের কি বাহার কি মাদকতা মেয়েটির সমস্ত শরীর আর চেহারায়! কত কমনীয় সে! কে সে!”ওহ ভুলেই গেছি। পরিচয় দিচ্ছি। আমার নাম রুমনো। এই নিন আমার কার্ড।” বলে, মেয়েটি ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে গেল। কার্ডটা হাতে নিয়ে পলাশ খাবার প্লেট হাতে বাড়ির কোণায় গিয়ে বসলো, একা। রিনার মুখটা আর মনে এলো না। অপরূপা সুন্দরী, রহস্যময়ী, স্মার্ট রুমনো নামের এই মেয়েটিকে ভালো করে জানতে হবে। কার্ডটা প্যান্টের পকেটে ভালো করে ঢুকিয়ে রেখে তাকিয়ে রইলো ভিড়ের মধ্যে। রুমনো বেশ ক’বার তাকালো ওর দিকে।
রাত গম্ভীর হলো। বিয়ের পার্টিতে রুমনোকে সে শুধু আরেকবার দেখছিল খুব তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে যেতে। কি এতো তাড়াহুড়ো করে চলে এলেন কেন! কার্ডটা দিয়ে কোথায় উধাও হলেন। কত খুঁজলাম! পরদিন ঘুম থেকে উঠেই পলাশ রুমনোকে ফোন করলো। সারারাত সে ছটফট করেছিল এই সকালটুকুর জন্যে।
–ব্যাগ খুলে দেখি চাবি নেই। ভাবলাম, ঘরের দরজায় হয়তো ভুলে ফেলে এসেছি। সর্বনাশ! ভেবে, ভয়ে ছুট দিলাম। কিন্তু কি জানেন! পরে দেখি চাবিটা ব্যাগেই পড়েছিল। হাউ সিলি! থাক, অন্য কথা বলি। গতকাল আপনাকে দেখলাম খুব একা একা। স্ত্রী বাচ্চা নেই বললেন, কিন্তু বান্ধবী! রুমনো পলাশকে সুধোয়।
–বন্ধু আছে। কিন্তু বান্ধবী নেই। আপনার!
–সবই আছে। আবার কেউ-ই নেই। একা। খুব একা। কাউকে ভালোলাগে না। স্বামী ছিল। মনের মতো কোনদিনই মেলেনি, মিশ খায়নি। তাই ডিভোর্স হয়ে গেছে।
পলাশের হার্ট ডাব লাব ডাব ডাব করতে শুরু করলো। একদিন আসুন আমার গরিবালয়ে। খুব খারাপ অবস্থা। এলে বসতে দিতে পারবো।
–বেশ ভালো। ঠিকানা দিন। টেলিফোন নম্বর?
–সত্যিই আসবেন!
–‘বাহ! না আসার কি আছে। বললে কাজশেষে আজ বিকেলেই আসতে পারি। কাজের পর কি করছেন? আমি ফ্রি।’ পলাশ চমকে উঠলো। প্রস্তুতির অভাব ছিল মনে। চট করে বলতে পারলো না। বললো ‘কাল আসুন। আসবেন?’ মনে মনে ভাবলো একদিন সময় হাতে থাকা ভালো। একটু ভাবা যাবে। একটা অপরিচিত সুন্দরী মেয়েকে চট করে এভাবে আসতে বলাটা যে রিস্কি, অন্তত সে ভাবনার সময়টুকু পাওয়া যাবে। মন না চাইলে মানাও করে দেয়া যাবে। মুহূর্তের জন্যে ভাবলো সে। ওকে, কাল আসবো। ঠিকানাটা লিখে নিচ্ছি বলুন।
–রুমনো ফরিদপুরের মেয়ে। এখানে একটা এপার্টমেন্টে একজনের সঙ্গে রুম শেয়ার করে থাকে। সিটির চাকরি করে। স্বামী কলকাতায় গিয়ে ডিভোর্সের পর সে আবার বিয়ে করেছে। রুমনো আমেরিকায় চলে আসে সমীর বাবুর সাথে ডিভোর্সের পর। রুমনো আলট্রা মডার্ন। কিন্তু সমীর চ্যাটার্জি ঠিক তার উল্টোটা। ভারিক্কি আর আধ্যাত্মিক ধরনের পুরুষ। মন মেজাজে রক্ষণশীল। তাই বিয়ে ভেঙে গেল মাত্র তিন বছরের মাথায়। এ দেশে রুমনোকে অনেকেই বিয়ের প্রস্তাব দিলেও সে প্রত্যেকটি প্রস্তাবই নাকচ করে দিয়ে বলেছে ভালো আছি। স্বাধীন জীবন। নাক গলাবার কেউ নেই। তাই বিয়ের কথা বললেই হো-হো করে হাসে এই দারুণ অহঙ্কারী মেয়েটি। কিন্তু পলাশের এক ডাকেই সে চলে গেল পরদিন সোজা ওর এপার্টমেন্টে। কেন! ভেবে নিজেও সে অবাক হয়।
–আসুন। গরিবের ছোট ঘর। মনে কিছু নেবেন না কিন্তু।
–এতো আদিখ্যেতার কোনও দরকার নেই। আমারটা দেখলে নিজেরটাকে গরিব বলবেন না। বলতে বলতে রুমনো পলাশের ঘরে ঢুকলো। পলাশের মনে হলো সে যেন নির্ঘাত স্বর্গ থেকে আসা এক অপ্সরী। দু’জনে ড্রয়িং রুমে বসে গল্প বলতে শুরু করলো।
–চা খাবেন?
–আপনি! খাবেন! চা খাবেন!
–খাবো, বসুন। বানিয়ে আনছি।
–আপনি বসুন। আমি বানিয়ে আনছি। বলুন টি ব্যাগ কোথায়! চিনি! দুধ!
–দেখিয়েই যদি দিতে হয় তার চেয়ে বরং নিজে তৈরি করাই কি ভালো নয়। হাসতে হাসতে পলাশ বললো, আবহাওয়াটা একটু হালকা করতে।
একসময় দুজন দুজনের জীবনের গল্পে মেতে উঠলো। সেই দিনের পর থেকে নিঃসঙ্গ দু’জনের মধ্যে দ্রুত গড়ে ওঠে বন্ধুত্ব। সেই বন্ধুত্ব একদিন ভালোবাসায় রূপ না নিয়ে পারলো না। তিন মাস পর রুমনো পলাশের সঙ্গে একই এপার্টমেন্টে মুভ করলো। তারপর থেকে ওরা একসাথে এক এপার্টমেন্টে স্বামী-স্ত্রী জীবন যাপন শুরু করে। এমনি করে পলাশ, রিনার কথা ভুলেই যায়।
–আবার বিয়ের কথা কখনো ভাবিনি। যদি চাও তাহলে নতুন করে ভাববো পলাশ!
–কি দরকার রুমনো! এমনিই ভালো আছি। তুমিই বলেছ। নাক গলাবার কেউ নেই! ফ্রি! বিয়ে হলেই বলবো এটা করো। ওটা করো। এখন তুমি যা ইচ্ছে করতে পারো। তখন পারবে না।
–পলাশ তুমি তো অবিবাহিত। কোনওদিন হয়তো পালিয়ে যাবে। নিশ্চয়ই তোমার বিয়ের ইচ্ছেটা মরে যায়নি। বললো রুমনো।
–‘বলেছি তো পালিয়ে যাবো না। হলো তো!’ রুমনোর মাঝে মাঝেই ভয় হয়। ভয় হয় পলাশ একদিন সত্যি সত্যি চলে যাবে। তাই এরকম প্রায়ই সে পলাশকে হুট করে কথায় কথায় বিয়ের কথা বলে ফেলে, প্রতিবারই প্রত্যাখ্যাত হয়ে লজ্জা পায়। কিন্তু ওর গোপন ইচ্ছেটা কিছুতেই মন থেকে যায় না। পলাশকে ও প্রাণ থেকে ভালোবাসে। শিশুর মতো।
পলাশ বিবাহিত, রুমনো সেকথা জানে না। কিছুদিন পর পলাশ এক কাপ কফি নিয়ে ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে ভাবছে রিনার কথা। বাচ্চাদের কথা। রুমনোর কারণে তাকে লুকিয়ে ফোন করতে হয়। রুমনো, শুনলে কষ্ট পাবে। কিন্তু আর কতদিন এভাবে! রিনা ওর স্ত্রী। রুমনো তাহলে, কে! বান্ধবী! এই বন্ধুত্ব কি স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের চেয়েও গভীর নয়! দু’জন একসাথে থাকছে। স্বামী-স্ত্রীর মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে। রাতে জড়িয়ে ধরে ঘুমোচ্ছে। শরীর খারাপ লাগলে স্ত্রীর কোমলতা দিয়ে শিয়রে বসে রুমনো রাত জাগে। এই সম্পর্ক কি মেকি? ভাবতে ভাবতে পলাশ এসে ধড়াস্ করে শুয়ে পড়লো চারপেগ নির্জলা হুইস্কি খেয়ে।
