ম্যারেড ব্যাচেলর, জেনুইন ব্যাচেলর, উইন্ডো ব্যাচেলর, সব ধরনের বাংলাদেশি ক্যাবি ব্যাচেলর, বন্ধুগুলোর সাথে বারে উইক এন্ডে বসে প্রবাসী পলাশেরা আড্ডা দেয়। সারা সপ্তাহ ওরা নিজের শরীরের চামড়া পিটিয়ে, হাড্ডি মাংস খুইয়ে পরিবারের দায়িত্ব পালন করে। দেশে প্রায় সবারই পরিবার আছে। পরিবার থাকলে স্বপ্ন আছে। ওরা পরিবারের স্বপ্ন পূরণ করতে এ দেশে থাকে। বাবার জন্যে কমোডসহ দালান বাড়ি। দশ বিঘে বন্ধকী জমি ছাড়িয়ে অতিরিক্ত আরো বিঘে দশেক কেনা। কন্যাদায়গ্রস্ত পিতাকে যৌতুকের রসদ জোগানো। জামাইয়ের জন্যে লার্জ স্ক্রিন টিভি, ডিভিডি, রোলেক্স ঘড়ি। বেকার দুটো ভাইয়ের বিয়ে। ওরা অর্থাৎ পলাশ নামের এই তরুণ যুবকগুলো পরিবারের স্বপ্ন পুরো করতে স্টুডেন্ট ভিসা, ভিজিটর ভিসা, বিজনেস ভিসা, ডিপ্লোমেট ভিসা ইত্যাদি নিয়ে নিউইয়র্কের এই মেট্রোপলিটন শহরে এসে অধিকাংশই ইল্লিগ্যাল, লিগ্যাল ক্যাব ড্রাইভার কিংবা নির্মাণ কর্মী ইত্যাদি হতে বাধ্য হয়। ওদের পাঠানো অর্থ দিয়ে পরিবারের অবস্থা ভালো হয়। দেশে আর কোনও অভাব-অভিযোগ থাকে না। তবে চাহিদাটা স্থায়ী। পলাশ এবং ওরা দেশে বাবা-মা ভাই-বোন-স্ত্রী-সন্তান-বন্ধু-আত্মীয় পরিচিতদের এই অন্তহীন চাওয়ার ফাঁদে আটকা পড়ে, আটকে গেছে হলুদ রঙের ট্যাক্সিগুলোর ড্রাইভার সিটে। দূর থেকে যাত্রীরা হাত দেখিয়ে বলে ট্যাক্সি! পলাশ এবং ওরা প্রতিদিন বারো ঘণ্টা মিডটাউনে ওদের ডাকে সাড়া দিয়ে এভাবেই কাটিয়ে দেয়। যতবার যাত্রী বদলায়, ততবার টিপস। দিনশেষে খাইখরচা বাদে থাকে দেড় থেকে দুশো ডলার। অর্থাৎ ষাট দিয়ে গুণ দিলে দিনে ৯ থেকে ১০ হাজার টাকা। এমন বেহেশত কি বেহেশতেও আছে? শাহীন বলে, না। পলাশ এবং ওরা মোল্লাদের খোতবার বিরুদ্ধে ব্যঙ্গ করে বলে, বেহেশত যদি কোথাও থাকে তাহলে সেটা আছে আমেরিকাতেই।
পলাশ বিবাহিত। দেশে আছে দুই মেয়ে এবং স্ত্রী। এক ভাই, তার স্ত্রী এবং ছেলেমেয়ে। তিন বোন তাদের স্বামী এবং ছেলেমেয়েরা, গ্রামের বাড়ি ভোলা, বরিশাল। নদী-নালার শহর। পলাশের বাবা রিটায়ার্ড পোস্টাল ক্লার্ক। মা ধর্মভীরু গৃহিণী।
পলাশ এসেছিল লায়ন্স ক্লাবের মেম্বার হিসেবে কনভেনশনে যোগ দিতে। দেশে অনার্সসহ বি.এসসি পাস করে দর্জির কাজ কিংবা কিন্ডারগার্টেনের বাচ্চাদের অ-আ শেখাতে সে রাজি হলো না বলে বাবা অসন্তুষ্ট। তিনি বললেন একটা কিছু করে টাকা তো আনতে হবে! বাচ্চা পড়াতে দোষ কী? বাচ্চা তো বাচ্চা। ওরা তো কাঁদবেই। পলাশ সেসব কিছুই করবে না। রাগ করে বাবা একদিন বললেন, বাড়ি থেকে বের হয়ে যা। বেকার হারামজাদা। যে অবধি কাজ করে টাকা আয় না করতে পারবি তদ্দিন। বাড়ির কথা ভুলেও মনে করবি না। এরপর পলাশ প্রায় মরিয়া হয়ে উঠলে একলোক তাকে লায়ন্স ক্লাবের মাধ্যমে ভিসার খবর দিলো। দু’লক্ষ টাকা হলে আমেরিকার ভিসা পাওয়া যাবে। পলাশ বাড়ি ফিরে বাবা-মা-স্ত্রীকে বুঝিয়ে বললো দু’লক্ষ টাকার কথা।
পলাশ এবং তার পরিবার জানে পলাশ আমেরিকাতে গিয়ে ইল্লিগ্যাল হয়ে যাবে এবং অন্য আরো অনেকের মতো আর হয়তো দেশে নাও ফিরতে পারে। জেনেশুনেই পলাশকে প্লেনে তুলে দিলো ভিসার জন্যে নগদ দু’লক্ষ টাকায় জমি বিক্রি করে। সে নিউইয়র্কে এসে উঠলো এক বন্ধুর বাড়িতে।
পলাশ, ওর বন্ধুর ওখানে থাকা অবস্থাতে প্রায় দু’মাস পর ব্রুকলিনের একটা বাংলাদেশি গ্রোসারি স্টোরে কাজ পেলো। মিট কাটারের চাকরি। গরুর বিশাল দেহ কাটা ওর কাজ নয়। দু’চারদিন পরই সে চাকরিটা ছেড়ে দিয়ে অন্য চাকরি খুঁজে নিলো। এভাবেই সে গ্রোসারি স্টোর, নির্মাণ, রেস্তরা বিভিন্ন জায়গায় কাজ পরিবর্তন করতে থাকলো। কোনওটাই ওর ভালো লাগছে না। ইতোমধ্যেই নিউইয়র্কের অনেক বাংলাদেশির সাথে পরিচয় হলো। অধিকাংশই বললো ট্যাক্সি চালানোর কথা। চালাবে কি করে! ওর তো লাইসেন্স নেই! পাঁচ হাজার টাকার বিনিময়ে বাংলাদেশ থেকে ভুয়া আন্তর্জাতিক লাইসেন্স আনিয়ে সে গেল ওয়াশিংটনে। সেখানে দু’শ ডলার দিলে কুড়িটি গত্যাধা আররি প্রশ্নপত্র পাওয়া যায় মোটর ভেহিকল ডিপার্টমেন্টে। নিজেকে আররি ভাষাভাষী বলে পরিচয় দিয়ে, সেগুলো মুখস্থ করে পরীক্ষায় পাস করলো। তারপর ভুয়া গ্রিনকার্ড হলো। ধরা পড়লে জেল। পলাশ ফেইক গ্রিনকার্ডটি তোশকের মধ্যে লুকিয়ে রেখেছে, যদি কখনো কাজে লাগে। এতসব ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে আজ পার্টি, কাল বিয়ের দাওয়াত, পরশু সোসাইটির মিটিং এই করে এরই মধ্যে পলাশের অনেক বন্ধু-বান্ধব জুটে যায়। নিঃসঙ্গতা কাটাতে উইকএন্ডে এ-বাড়ি সে-বাড়ি করতে করতে হঠাৎ করে একদিন বন্ধুত্ব হয়ে গেল রুমনোর সঙ্গে।
রুমনো ওরফে রুমা, বাংলাদেশের মেয়ে। ডিভোর্সি। একটা ট্রাভেল এজেন্সিতে সেলস গার্লের চাকরি করে। রুমনো স্মার্ট, সুন্দরী। মজিদ সাহেবের বিয়ের পার্টিতে রুমনো যেচে এসে পলাশের হাতে একটা পেপার প্লেট দিয়ে বললো”খাবেন না? সবাই খাচ্ছে!” পলাশ নড়েচড়ে উঠলো। হঠাৎ এত সুন্দরী চকমকে একটা মেয়ে এসে খেতে বলছে! আসলে পলাশ তখন দেশে ওর স্ত্রী রিনার কথা ভাবছিল। চোখে দু’ফোঁটা জল। মুছতে না পেরে গিলে খেল। ”নিন, ধরুন। ঐ যে কত সব খাবার পড়ে আছে। কি ভাবছেন এত!” বলে রুমনো পলাশের প্লেটটা নিয়ে চোখ দিয়ে বড়শির মতো ওকে টেনে নিয়ে গেল। কি খাবেন বলুন!’ পলাশ অবাক হয়ে মেয়েটার স্বতঃস্ফূর্ততা আর স্মার্টনেস দেখে। ‘কি নাম আপনার?’ ‘পলাশ। পলাশ রায়হান।’ ‘বৌ ছেলেমেয়ে!’ পলাশ ঢোক গিলে হঠাৎ কি ভাবলো। তাৎক্ষণিক উত্তরে বললো, ‘নেই। কেউই নেই।‘ রুমনো মুচকি হেসে খাবারের প্লেটটা হাতে দিয়ে বললো, ”যাবার আগে একবার দেখা করে যাবেন, কেমন!”
