সংসারে মন বসে না। বাড়িতে ফিরতে ভালো লাগে না। মিতুকে ভালো লাগে না। মাতালকে মদ-ছাড়া করলে যা হয়। মাতাল অসুস্থ বোধ করে। সেদিন কাজ থেকে ফেরার পথে, ট্রেনে বসে মনে হলো বাড়ি না গিয়ে আজ হাসপাতালে রিমির কাছেই যাবে। রিমি অসুস্থ। গেলেই হাতের মুঠোয় তার প্রিয়তমা। গিয়ে বলবে, দেখো আমি ফিরে এসেছি। তোমার সাত বছর মিথ্যে নয়। তুমি সুস্থ হয়ে ওঠো। আমি তোমাকে স্নেহ দেবো। প্রেম দেবো। শুধু তুমি একবার সুস্থ হও। যেমন আমাকে তুমি একদিন সব দিয়েছিলে। এমনকি, মাতৃস্নেহ পর্যন্ত যখন আমি মরতে বসেছিলাম। যেদিন তুমি আমাকে তোমার দুই স্তনের মধ্যে খুঁজে, লেপ দিয়ে আমাকে জড়িয়ে, শরীরের সমস্ত ওম দিয়ে জ্বরের প্রচণ্ড কাঁপুনি থামিয়েছিলে! সেদিন তুমি আর তুমিতে ছিলে না। আজ আমিও তাই হবো। প্রলাপের মধ্যে আমাকে তুমি আর খুঁজো না। আমি স্বয়ং নিজেই এসেছি তোমার কাছে। চোখ খোল, রিমি! লক্ষ্মী! মানিক সোনা আমার! উত্তীয়র দু’পা কাঁপছে। ঠোঁট কাঁপছে। বুকের তলে, ভূকম্পন হচ্ছে প্রতিটি মুহূর্ত।
উত্তীয়র দৃষ্টি প্রসারিত। চোখে দেখছে হাসপাতালের বেডে রিমি শুয়ে আছে। দশদিন হয়ে গেল। রিমি দশদিনেও চোখ খোলেনি। শুধু নাকি ঘুমের মধ্যে একবার দু’বার উত্তীয়’র নাম বলে কেঁদে উঠেছিল। আর হাসপাতালের ডাক্তারও কোনও এক ‘উত্তীয়’কে খুঁজছে। তাকে পেলে রোগী সেরে উঠবে। উত্তীয়র পৃথিবীটা চরম অশান্ত। ঝড়ে, ডালপালা ভাঙার মতো ওর সব ভেঙে ভেঙে পড়ছে। হৃদয় ভাঙছে! বিয়ে ভাঙছে। কাকে বাঁচাবে? রিমিকে সে ভালোবাসে। কিন্তু প্রথা, একজনকে দিয়েছে অপার ক্ষমতা, অধিকার! আর অন্যজনকে করেছে রিক্ত, ভিখিরি।
‘এফ’ ট্রেনের পরবর্তী স্টপ, নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটি হাসপাতাল। এখানেই রিমি ভর্তি হয়ে রয়েছে। নামবে কি নামবে না ভাবছে সে। সেলিম বলেছিল দয়া করে অন্তত একবার ওকে দেখে আসতে। সে জানে রিমির মাথায় হাত বুলোলেই রিমি জেগে উঠবে। রিমি ওর গন্ধ চেনে। রিমি ওর স্পর্শ চেনে। মৃত্যু মুহূর্ত হলেও ওর স্পর্শ একমাত্র রিমিই অনুমান। করতে পারে। কারণ তার নিখাদ প্রেম। এসব ভাবতে ভাবতে অজান্তেই ট্রেনটা কখন যেন হাসপাতালের স্টপ পার হয়ে ফোরটি সেকেন্ডের দিকে চললো। উত্তীয় আনমনা হয়ে তখনো ভাবছে, সে কি যাবে? গেলেই তো সব ওলট-পালট হয়ে যাবে তার বোতলে বোতলে মদ খেয়ে ভুলে থাকার সব প্রচেষ্টা, ব্যর্থ হবে।
–নামবে কি নামবে না। নামবে কি-না, নামবে না। ওকে দেখলেই মনে হবে মিতু মিথ্যে। অনেক কষ্ট করে এই নতুন জীবনে সে অভ্যস্ত হতে যে যুদ্ধ করে চলেছে!
হায়! এই সেই ভ্রান্তিপাশ! যাকে কবিগুরু পোস্টমাস্টার গল্পে উল্লেখ করেছিলেন, কি নিপুণভাবে। উত্তীয়, এই ভ্রান্তিপাশের কথা মনে করতে করতে ভুলে যায় কখন সে ট্রেনের লাস্ট স্টপে এসে পৌঁছয়। নিজেও সে সেকথা জানে না। স্টেশনের দিকে তাকিয়ে ওর চৈতন্য হয়। সেখান থেকে ওর বাড়ি অনেক অনেক পেছনে। ভুল করে সে অনেকটা পথ পেরিয়ে চলে এসেছে। আবার তাকে উল্টো ট্রেনে সেখানেই ফেরত যেতে হবে, যেতেই হবে। যে জায়গাটা সে ফেলে এসেছে।
২১. নীলাঞ্জনা মেয়েটি
শনিবারের রাত। উইক এন্ডের পার্টি নাইট। ম্যানহাটানের ইটালিয়ান বারে পলাশ যে টেবিলটায় বসে, ঠিক তার উল্টোদিকেই, সুনয়না এক শ্বেতাঙ্গিনী মদের গ্লাসটা ডান হাতের তিন আঙুলে ধরে হালকা সিপ দিতে দিতে ওর দিকে বেশ কয়েকবার তাকিয়ে মুচকি হাসলো। পাশেই হাতের চামড়ায় আঁকা লাল-কালো জোড়া ঘোড়ার টাটু! স্লিভলেস কালো গেঞ্জি পরা ঘাড় অবধি কালো চুলের তরঙ্গ। স্বাস্থ্যবান এই সাদা পুরুষটি মেয়েটির বয়ফ্রেন্ড, নাকি শুধু বারের ক্ষণকালীন কোম্পানি, পলাশ তা নিশ্চিত নয়। তবে খুব ভালো লাগছে মেয়েটির তাকানোর ভঙ্গিটি। সুন্দরী আর কাকে বলে। এককথায়, অপূর্ব। গলার দু’পাশে কলার বোন দুটো তীরের মতো খাড়া। চিবুকের মাঝখানে গাঢ় তিল। গালে টোল। কালো স্কিনটাইট গেঞ্জির ভেতর দিয়ে হাতের মুঠির মাপে সুডোল একজোড়া স্তনের উঁকিঝুঁকি। জিনসের প্যান্ট আর গেঞ্জির মাঝখানে ছ’আঙুল মাপের মেদবিহীন সমতল নাভিমূল। মেনিকিওরড হাতের আঙুলে দু’রঙের নেইল পলিশ দিয়ে ডিজাইন করা নোখ। ক্ষীণ কটিদেশ। কাম জাগানো ভারি নিতম্ব আর পাকা কামরাঙার মতো রসালো পুরু দুটো ঠোঁট। সব মিলিয়ে তন্বী মেয়েটির তত শরীরে যাদুকরী সৌন্দর্য। এত সুন্দরী মেয়ের তো পুরুষের অভাব হওয়ার কথা নয়। টেবিলের সামনে দিয়ে যেতে যেতে প্রায় সবাই এই গভীর নীল চোখের নীলাঞ্জনার দিকে একটু হলেও আড়চোখে তাকাচ্ছে। কিন্তু সোনালি চুলের এই নীলাঞ্জনা কেন শুধু তার দিকেই তাকিয়ে মুচকি হাসছে! আবারো! হ্যাঁ, সে আবারো দু’বার তিনবার তাকিয়ে মুচকি হাসলো! পলাশ মদের গ্লাস হাতে, একা বসে। সেও তাকিয়ে দেখছে, নীলাঞ্জনা মেয়েটির মতিগতি। এইতো আবার সে তাকালো! আড় চোখে, না তেরচা চোখে বোঝার উপায় নেই।
সমস্ত দিন ক্যাব চালিয়ে শরীর ক্লান্ত হলেও শুধু রোববার রাতেই সে বারে মদ খেতে আসে। কোনওদিন দল বেঁধে। কোনও দিন একা। আজ রাতে সে একা। বারে। এসে মদ খেতে আড্ডা দিতে ভালো লাগে। লাইট আর ওয়েস্টার্ন মিউজিকের এ্যাফেক্টে মন চাঙ্গা মচমচে মুড়ির মতো হয়ে যায়। মনে হয়, গান আর মদের এই। পৃথিবীটাই আলাদা। বলা চলে, ক্ষণিকের বেহেশত। প্রবাসের নিঃসঙ্গতা ভোলার বেহেশত। এ বেহেশত দেশে যেতে না পারায় রিতা এবং ছোট দুটো মেয়ের বেদনাবিধুর আর্তনাদের বাইরের বেহেশত। এ বেহেশত রুমনোকে ভুলে যাবার …।
