–কি পাগলামো করছো? তাড়াতাড়ি গুছিয়ে ফেল।
–পাগলামো নয় উত্তীয়। এভাবে আজ কেন কথা বলছো? আমাকে উচ্ছিষ্টের মতো ফেলে দিচ্ছো কেন? মনে আছে–মাথায় ব্যথা পেয়ে একবার প্রায় মরতে বসেছিলে। বলেছিলে, তুমি না থাকলে যমও আমাকে ছাড়তো না। কথা দিচ্ছি তোমাকে ফেলবো না। তোমারই থাকবো। -হ্যা বলেছিলাম। কিন্তু সে তো তখন। বললো উত্তীয়। মানে? –মানে সেটা তখনকার একটি মুহূর্তের জন্যে প্রযোজ্য, একটা ইমোশন। কিন্তু আমাদের সমাজ আছে। তাকে তো মানতে হবে! তুমি থাকবে এ আর বেশি কথা কি! আমিও চাই তুমি থাকো। কিন্তু মিতু তা হতে দেবে না। এক পুরুষের ঘরে দুই নারী সম্ভব নয়, তুমিও জানো।
–জানি, কিন্তু তবুও আমি যাবো না। আমি পারবো না উত্তীয়, তোমাকে ছেড়ে। আমি কিছুতেই পারবো না। আমি মানুষ তো! শুনবে, একদিন আমি আত্মহত্যা করছি। কে স্বামী, কে স্ত্রী, বুঝি না। মন্ত্র পড়িনি, কিন্তু আমাদের এই সম্পর্ক তারও ঢের ঢের ঊর্ধ্বে। আমি কি মিথ্যে বলেছি?
–এখন ওসব কথা বলো না। যাও, তৈরি হয়ে নাও। তোমাকে নামিয়ে দিয়ে আমি কাজে যাব।
একটা সময় এলো যখন উত্তীয় রিমিকে ধরে ধীরে ধীরে সিঁড়ি দিয়ে নামিয়ে নিয়ে গেল। সে এক দৃশ্য! গাড়িটা চলতে শুরু করলো। নতুন এক ঠিকানার উদ্দেশ্যে। আর গাড়িতে বসে এই নারী যে অন্য দশজনের মতো সাধারণ কোনও প্যাসেঞ্জার নয়, স্রেফ প্রথার শিকার, এক ভগ্ন হৃদয়। সে আড় হয়ে বসে রইলো। দু’চোখে অনিশ্চিত জীবনের মাঠ পার। প্রথার বিরুদ্ধে সে একা, নিরস্ত্র এবং নিরুপায়। সে নারী। পরকীয়া নারী।
পরের দিন উত্তীয়র বৌ, ছেলেমেয়ে এলো। প্রায় আট বছর পর দেখা। রিমিকে নিয়ে মিতুর বড় বেশি কৌতূহল। সে বিষয়ে যে-কোনও প্রশ্ন উত্তীয় এড়িয়ে যায়। মিতু ঘরের প্রতিটি কোণা ঘুরে ঘুরে খোঁজে। রিমির কোনও চিহ্ন। কোনও গন্ধ। রঙ। উত্তীয়কে সে হিংস্র জন্তুর মতো ধরবে, সব সত্যি কথা ওর জিভ টেনে বের করে আনবে। যা সে এতকাল শুনে এসেছে, যা উত্তীয় নিজেও এতকাল টেলিফোনে অস্বীকার করে এসেছে।
রিমির সঙ্গে উত্তীয়র সম্পর্ক বরং আট বছর পর স্বামীকে দেখার সুখের চেয়েও বড় হয়ে উঠলো। মিতুর গায়ের রোম পর্যন্ত দাঁড়িয়ে যাচ্ছে ঘরের প্রতিটি ইঞ্চিতে–পা দিতে দিতে। বারবার শুধু একই কথা। উত্তীয়, এবার প্রায় ধমকের সুরে বলে উঠলো, পাগল হয়ে গেলে নাকি? মাত্র এলে, আর এরই মধ্যে এ কি শুরু করেছ! দেখছো তো আমি ছাড়া বাড়িতে কেউই নেই। আর আমি তো তোমারই আছি যেমন ছিলাম। মাঝখানে কি হয়েছে সেসব কথা ভুলে যাও। তা সত্ত্বেও মিতুর মাথায় শুধু, রিমি।
–ওই বেশ্যা, সেই হারামির বাচ্চা যে ওর স্বামীর বুকে শুয়েছে। স্বামীর পুরুষ ছুঁয়েছে। কোথায় সে! মিতুর একটাই কথা। কোথায় …!
রাতের পর রাত তাকে যে কাঁদিয়েছে। বলো! কোথায়! উত্তীয় আদর করে কাছে টেনে নিয়ে বলে আট বছর পর দেখা হলো। আজ ওসব বাজে কথা থাক। উত্তীয় ওকে চুমু খেতে যায়, আর মিতুর দুই চোখ তখন কপালে। উত্তীয় এবার মাথায় হাত দিয়ে বসে। কিছুতেই সে পারছে না, মিতুর সঙ্গে। অন্য নারীর হাতে গোছানো এই ঘরে ঢুকেই মিতু বুঝতে পেরেছে, এই নিপুণ হাতের কাঁচের জানালার পর্দা কোনও পুরুষ কিনতে পারে না। এই বিছানার চাঁদর কোনও পুরুষের পছন্দের নয়। পরদিন সকালে এত সুন্দর গুছিয়ে রাখা মশলার পিরামিড কোনও পুরুষের কাজ নয়। গোছানো চাল-ডাল-মশলা! রান্নাঘরে গিয়েই মিতু ভীষণ ক্ষেপে গেল। পিরামিড ফেলে দিলো। জানালার পর্দা কাঁচি দিয়ে কুচি কুচি করে ফেলো। সব-সব ফেলে দেবে সে। কিছুই রাখবে না। উত্তীয়র বুকে ওর মাথার চুলের গন্ধ। উত্তীয়র রুমালে তার স্পর্শ। এবার মিতু পাগলের মতো চিৎকার শুরু করলো। দিন গিয়ে এমনি ঝড়-তুফান তুলে রাত এলো। আর সইতে না পেরে, ওকে থামাতে উত্তীয় প্রবাসের এই দ্বিতীয় দিনেই -ঠাস করে চড় কষালো মিতুর গালে। চড় খেয়ে কাঁদতে কাঁদতে হঠাৎ কখন যেন বাধ্য শিশুর মতো সে ঘুমিয়ে গেলে পৃথিবীটা বড় শান্ত মনে হলো। উত্তীয় যেন এতক্ষণে হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো, উফ! কি ভয়ঙ্কর।
রিমিকে সে দু’সপ্তাহ দেখেনি। সাত বছরেও যা হয়নি। রিমিকে সে হৃদয়ের গভীরে অনুভব করছে তীব্রভাবে। স্মৃতি উত্তীয়কে কষ্ট দেয়। রিমির প্রসঙ্গে কোনও কথাই সে তুলতে চায় না। অনেক কষ্ট করে, অনেকটা মদ খেয়ে খেয়ে গোপনে সে রিমির কথা ভুলে থাকার চেষ্টা করছে। যা মিতু জানে না। মিতুকে ওর ভালো লাগছে না। মনে হচ্ছে যেন অচেনা এক অতিথি। অযাচিত। বরং না এলেই ভালো ছিল। মনে হচ্ছে পারলে ও এক্ষুণি রিমিকে ফিরিয়ে নিয়ে আসে। এমনটি লাগবে, সে ঘুণাক্ষরেও ভাবেনি। উত্তীয়র কষ্টগুলো না জানে রিমি, না জানে মিতু।
বিকেলবেলা, আনমনে বসে ভাবছে। হঠাৎ সেলিম এসে ওকে ডেকে বাইরে নিয়ে গেল। কানে কানে বললো রিমি খুব অসুস্থ। হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। কেমন আছে?
–ভালো নয় বিশেষ। তোর যাওয়া দরকার। উত্তীয়র মন চাইছে ওকে দেখতে যেতে। রিমি কেন অসুস্থ হলে কি পেলে ভালো হয়ে যাবে, সে খবর ওর চেয়ে ভালো এ বিশ্বভুবনে আর কে জানে! অস্থির চিত্ত, দুর্বল মন, প্রগাঢ় অনুভূতি নিয়ে সে মস্ত হাঁফ ছাড়ে। তার পক্ষে যাওয়া সম্ভব নয় সেলিমকে জানিয়ে দিল। গেলেই সর্বনাশ হবে। এই কষ্টের সংযম, নষ্ট হয়ে যাবে। সেলিম চলে গেল, ভীষণ রেগে। তারও ভালোলাগেনি এত নিষ্ঠুরতা।
