রিমি ভাবছে ওর জায়গায় পরদিন মিতুকে বসাবে উত্তীয়। সোজা এয়ারপোর্ট থেকে এনে বলবে, এই নাও তোমার সংসার বুঝে নাও। বুঝে নাও তোমার আদরের পরবাসী স্বামী রত্নটিকে। সেই রাতেই ওরা দু’জন একখাটে একসঙ্গে শোবে। অথচ এই খাটেই সে উত্তীয়র সঙ্গে কাটিয়ে দিল ব্যক্তিগত একান্ত জীবনের কত কত না উত্তাল, উচ্ছ্বাসভরা মুহূর্ত। কখনও সরবে, কখনও নীরবে। পরম সুখানুভূতিতে, যখন দু’জনের মাঝে অন্য কেউ ছিল না। এবং ভবিষ্যতে যে থাকবে কোনওদিন মনে হয়নি তাও। তখন ওরাই স্বামী স্ত্রী। ওরাই সব। উত্তীয়র যে দেশে কেউ আছে মনেই হলো না ওর ব্যবহারে না আচরণে। একদিনও না।
সযত্নে সাজানো-গোছানো এই সংসার রিমির নিজের হাতেরই তৈরি। এই যে থালাবাসন পর্যন্ত তারই কেনা। উত্তীয়র এই শার্ট, এই গেঞ্জি, এই কলম ওরই দেয়া। মশলার হলুদ রঙ লেগে থাকা প্লাস্টিকের হাতা পর্যন্ত ওরই কেনা। কিন্তু আজকের পর থেকে ওর অস্তিত্বের সব-সবটুকু-এখান থেকে ধুয়েমুছে একাকার হয়ে যাবে। আসন্ন আগামী কাল-পরশু-তরশু… এই দিনগুলোর কথা ভেবে অচেনা নতুন এক জায়গায় মনে হয় ওর জীবনের একাকিত্বের কথা ভেবে রিমি ভয়ে গুটিশুটি হয়ে যায়। নতুন যে বাড়িতে সে যাবে আজ সেখানে অগ্রিম কিছু টাকা জমা দিয়ে এসেছে। বাকিটা দেবে ওঠার পর। এক বেডরুমের একটি ঘরে একটি বাঙালি মেয়ের সঙ্গে শেয়ারে থাকবে সে। সেখানে উত্তীয়বিহীন জীবন তার। যে জীবন ওর অচেনা, সে জীবনে কি করে সে অভ্যস্ত হবে? আদৌ হতে পারবে কি! রিমি ভাবতেও পারছে না আর। মাথাটা এবার লাটিমের মতো বনবন করে ঘুরছে। ওর এই চলে যাওয়া এ যে কতবড় অন্যায়ের কাছে আত্মসমর্পণ কে বলবে সে কথা! কিন্তু প্রথা, যা মানুষেরই তৈরি। প্রথার প্রতিকূল স্রোতের বিরুদ্ধে সে একা লড়বে কি করে! সে যে উত্তীয়র কিছু নয়! কেউ নয়! স্রেফ বান্ধবী যা সমাজের চোখে সম্পূর্ণ মূল্যহীন, অবান্তর। একসঙ্গে ওদের একটি নয়, দুটি নয়, সাত সাতটি বছর, এত সহজেই মূল্যহীন হয়ে পড়লো! এই যে এত আদর সোহাগ, হাসি-খুশি, কানে কানে গুনগুন সবই কি মিথ্যে। হায়রে জীবন! এত নিষ্ঠুরতার ভেতর মানুষ বেঁচে থাকে কি করে?
উত্তীয় থম মেরে চেয়ারে বসে দেখছিল সাত বছর একটু একটু করে, কি করে অতীত ইতিহাস হচ্ছে। পকেট থেকে পাঁচশ’ ডলার রিমিকে দিয়ে ভেজা ভেজা গলায় বললো, রেখে দাও। আর শোন, প্রয়োজনে যোগাযোগ করবে আমার কাজের জায়গায়। খুব জরুরি না হলে ফোন করবে না। জানই তো মালিক একটু অন্যরকম। বরং তোমার নতুন বাড়ির ফোন নম্বর আমাকে দিও। আমিই যোগাযোগ করবো। ওর কথা শুনে এবার সুটকেস গোছানো বাদ দিয়ে রিমি মাথা নিচু করে খাটের ওপর বসে রইলো। পুরো ব্যাপারটাই ওর মনে হচ্ছে, অন্যায়! হাত থেকে টাকাগুলো ওর মুখে ছুঁড়ে ফেলে বিস্ময়ভরা চোখ দিয়ে জিজ্ঞেস করলো, আচ্ছা উত্তীয়, এই কি শেষ! আমাদের সংসার সংসার খেলা! এই যে এতদিন প্রতিদিন তুমি আমার সবকিছু ছিলে! এই যে কাছ থেকে খবর নিতে, কেমন আছি! কোথায় আছি। কখন ফিরবো! এই যে আমার অসুখ হলে শিয়রে বসে মাথা টিপে দিতে। একটি রাতও গত সাত বছর ধরে এই যে আমাকে অন্য ঘরে ঘুমোতে দিলে না। কিন্তু আজ! এই সাত বছরের মানেটা কি একটু বুঝিয়ে বলবে! রিমি উত্তীয়র চোখের দিকে তাকিয়ে ভীষণ সব অস্থির প্রশ্ন তুলে বসে আছে।
উত্তীয় যার একদিকে রিমি আর অন্যদিকে মিতু। একদিকে ধর্ম, অন্যদিকে পাপ! রিমির প্রশ্নের কোনও জবাব আছে কি? থাকলে সে দিতে পারছে না কেন? –উত্তর দাও। বলো! এই কি শেষ! উত্তীয় তার কি জবাব দেবে? বিয়ে হলে তার অধিকারই সবচেয়ে বড় হয়। সেই সত্য হয়। এই সত্যের বিরুদ্ধে কি জবাব সে রিমিকে দিতে পারে? বিস্ফারিত দুই চোখে দূরে তাকিয়ে, দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললো–হা-রিমি …। এই-ই আমাদের শেষ। সংসার সংসার খেলার এখানেই সমাপ্তি।
–দেখতেও আসবে না আমাকে!
–উত্তীয় চুপ করে থাকে। কোনও কথা বলে না।
–কি, কথা বলো! দেখতেও আসবে না, আমি কেমন আছি! বলো!
–হ্যাঁ, মানে! বলছি তো সময়-সুযোগ পেলেই যাবো। জান তো ওরা আসছে, এখন থেকে আমাকে প্রতিটি পদক্ষেপ সাবধানে ফেলতে হবে, তুমি বোঝো না!
–বুঝি-বুঝি–সব বুঝি উত্তীয়। না বোঝার কি আছে। বলে সে ওর দুই পা জড়িয়ে ধরে মাটিতে লুটিয়ে পড়লো। যেন সে তার স্বামীর সংসার ফেলে অন্য কোথাও যাচ্ছে। যেন ওর বুকে চিরকালের বিচ্ছেদ ব্যথা, সত্যি সত্যি স্বামীর মৃত্যুর চেয়েও যার আঘাত ঢের বেশি।
আজ খালি তার গলা ছেড়ে বলতে ইচ্ছে করছে ”ন্যায়-অন্যায় জানি নে, জানি নে, জানি নে–শুধু তোমারে জানি, তোমারে জানি…” যে গান ওরা একসঙ্গে, পাশাপাশি শুয়ে গাইতে গিয়ে কেঁদে কেঁদে ভিজিয়েছে–একে অপরের বুকের সুগন্ধ, কত কত রাত! আগামীর বিচ্ছেদ আর বর্তমানের সুখের মাঝে, দুলতে দুলতে, কত-কত রাত!
পৃথিবীতে কে কার কষ্ট বোঝে? সে সময়টুকুও কারই-বা আছে? মানুষ নিজেকে নিয়েই। বরং ব্যস্ত। যার যার নিজের ভালোমন্দ, নিজের স্বার্থ, সেখানে চুল পরিমাণ ছাড়া কেউ দিতে চায় না। কেউ না উত্তরীয়ও না। রিমির চেয়ে বেশি এই সত্য হাড়ে হাড়ে আর কে বুঝতে পারবে।
–উত্তীয় আমি কিছুতেই যাবো না। আমার বুক ভেঙে আসছে। পারবো না আমি। আমি এখানেই থাকবো। যেমন ছিলাম।
