মা চেয়েছিল কিন্তু তা সত্ত্বেও সে এবার অনড়। নেলী, আজ সেকথা নিজ কানে শুনেছে। সুতরাং নেলীর হৃদয় সঙ্গে সঙ্গে গলে গেল। রাগ চলে গেল। অভিমান ঝরলো। ঝরলো কামের প্রত্যাশা।
তিনরাত পর সে হারুনের শরীর স্পর্শ করলো। আর সে স্পর্শ পেয়েই ঘুমের মধ্যে একটু একটু করে জাগ্রত হতে শুরু করে শরীরের একখণ্ড শিথিল মাংস। ক্রমে তাতে প্রাণ সঞ্চার হলো। জেগে উঠলো পৌরুষ তার আপন বিক্রমে। হারুন তৈরি। ঘুমের মধ্যে যেন তারও অধীর অনন্ত অপেক্ষা। আর অলক্ষ্যে, অপেক্ষা যেন আরো কার! দেয়ালের ওপারে সেই পায়ের শব্দটির অশান্ত আনাগোনা! সন্ত্রস্ত পদক্ষেপ। কে যেন হেঁটে বেড়াচ্ছে। কে যেন অস্থির শ্বাস নিচ্ছে। বিশ্রী এবং নিঃসন্দেহে তা কোনও বেড়ালের নয়।
হারুন বললো, কেউ না। নেলী, এসব আমাদের ভুল শোনা। দু’জনের শরীর সবকিছু ভুলে এগিয়ে যেতে থাকে। আর ঠিক তখনই, সেই পায়ের শব্দ আরও শব্দ করে কাছে, যেন একেবারে শিয়রে এসে দাঁড়ায়! শব্দ, দাঁড়ায় দেয়ালের একটি ফুটোর কাছে। শব্দ–চোখ বুজে দেখে। শব্দ অস্থির উত্তাল হয়ে দৌড়ে পালাতে গিয়ে দেয়ালে ধাক্কা খায়। শব্দ মিলিয়ে যায়।
ছত্রিশ বছরের বিধবা শরীরে আজ রাতে যেন আগুন লেগেছে। মৃত স্বামীর ছবিটা হাতে নিয়ে অধ্যাপিকা নার্গিস বেগম হঠাৎ এক জ্বলন্ত অনুভূতির প্লাবনে ধসে গিয়ে সেই রাতে অন্য এক নার্গিসে রূপান্তর হয়। যার সামনে কোনও অনুশাসন নেই। না ধর্মের, না সমাজের। তিনি তার মৃত স্বামীকে ছবির অ্যালবাম থেকে জাগানোর ব্যর্থ চেষ্টা করতে গিয়ে তার সার্টের কলার মিছে চেপে ফিরে আসেন শুধুই মুঠো মুঠো শূন্যতা নিয়ে। তার কোঁকড়া কোঁকড়া চুল ধরতে গিয়ে ফিরে আসেন নির্জনতা নিয়ে। অস্থিরতায় ঘাম সমস্ত করতল জুড়ে তার। গায়ে তার আগ্নেয়গিরির মতো লাল কালো তরল পাথুরে আগুন। তিনি কি চান, নিজেও জানেন না। স্বামীর ছবিটাকেই প্রশ্ন করেন, কেন চলে গেলে? কেন? কেন? তিনি চান তৃষ্ণার জল। তাকে ফিরিয়ে চান। সংশোধন করতে চায় অতীতের সব ভুল। শরীফকে ফিরিয়ে আনতে চায়, বৈধব্য সত্ত্বেও তার কামনা হয়। ইকবালের সঙ্গে বিয়ের প্রস্তাব দিতে এলে বৃদ্ধা মাকেও সে অপমান করেছিল। কত ভুল যে সে করেছে! কত ভুল! কাঁচি দিয়ে কুচি কুচি করে ঘরের পর্দা কাটতে শুরু করে। নিজের পরনের শাড়িও কাটে। অতীতের গহ্বরে হারানো এই ক্ষতি সে কি দিয়ে পূর্ণ করবে। সবই তো অতীত। সময়, সে কি আর বসে থাকে!
তার সব রাগ নেলীর ওপরে। ঈর্ষা! দারুণ ঈর্ষা! নেলী, হ্যাঁ নেলী নামের নির্বোধ মেয়েটি, সে সুখ করছে তার সুখের বিনিময়ে, যার কারণে সে তার নিজের সমস্ত সুখ বিসর্জন দিয়েছিলেন, ত্রিশ বছর আগে। তা হয় না। হবে না। কিছুতেই না। অবশেষে শরীর ও মনের ভীষণ সঙ্কটে আক্রান্ত অধ্যাপিকা নার্গিস বেগম ঝড়ের বেগে তার রতি ক্রীড়ায় মগ্ন সন্তানের ঘরে ঢুকেই একটি অবুঝ শিশুর মতো আলুথালু চুলে সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন। হারুনের পুরুষবৃন্ত মাত্র তখন সবে শৈথিল্যে ফিরছে। তখনো দুই পা বিযুক্ত নেলী অন্ধকারে তার কাপড় হাতড়াচ্ছে। আর অনন্যোপায়, অন্যলোকের বাসিন্দা দু’জন অসহায় স্বামী-স্ত্রী ওরা যেমন ছিল তেমনি গায়ে গায়ে লাগা অবস্থায় পড়ে রইলো। স্বাভাবিক জ্ঞানবুদ্ধি হারিয়ে অধ্যাপিকা নার্গিস বেগম, তখনও ঠায় দাঁড়িয়ে! একচুলও সরলো না। নড়লো না পর্যন্ত। যেন অনড় পাথর।
২০. ভ্রান্তিপাশ
রিমিকে এই বাড়ি থেকে চলে যেতে হবে। মিতু আসছে! মিতু, উত্তীয়র স্ত্রী! সুটকেস গোছাতে গোছাতে রিমির বুক ফেটে যাচ্ছে রাগে, দুঃখে। তাহলে উত্তীয়র সঙ্গে কাটানো এই সাত সাতটি বছর? এই সাত বছর কি এক্কেবারেই জলে গেল! এই যে প্রতিদিন সকালে উঠে কাজে যাওয়ার আগে সে উত্তীয়র জন্যে ময়দা ডলে ডলে কাই থেকে হাতে বেলা রুটি আগুনে সেঁকে, তাতে একটু ঘি-মধু মাখিয়ে খেতে দিতো, এই যে ময়লা আন্ডার গার্মেন্টসগুলোকে পর্যন্ত সে সাবান দিয়ে তার দু’হাতে ঘষে ঘষে পরিষ্কার করে দিয়েছে দিনের পর দিন এর কি কোনও মূল্যই থাকবে না। এমনকি ব্লাডপ্রেশারের বড়িগুলো পর্যন্ত নিয়মিত সে মুখে তুলে দিয়েছে। সেজন্যে এতটুকু কৃতজ্ঞতাও কী নেই? কত প্রশ্ন আজ রিমির মনে যার কোনও উত্তর, সামাজিক অর্থে তো দূরের কথা আজ যেন সবই অর্থহীন। মূল্য তো-নয়ই। পৃথিবীটাকে ওর কাছে মনে হচ্ছে এক বিরাট প্রহসন। আর মানুষগুলোকে অমানুষ। তাহলে মানুষের মনুষ্যত্ব, ধর্মবোধ, সবই কি গ্যাছে? রিমি কাঁদে তার নিজের জিনিসগুলো সুটকেসে ভরে। ভরতে ভরতে একসময় লুটিয়ে পড়ে কাঁদতে থাকে।
মেয়ে মানুষের শরীর, যা না হলে উত্তীয় ঘরে না থেকে বেশ্যাপাড়ায় লুটাতো এই যে নিজেকে সে এত বছর ধরে অকাতরে বিলিয়ে গেল, সাত সাতটি বছর খুব কি কম কথা। সেই কৃতজ্ঞতায় ন্যূনতম সহানুভূতিও কি ওর প্রাপ্য নয়! স্রেফ হাত ঝেড়ে ফেলা! এ কি ধুলোকণা শুধু। দু’হাত দিয়ে ঝাড়ছে তো ঝাড়ছেই। যতক্ষণ না তার চিহ্ন এ-ঘর থেকে শেষ হয়ে যায়। ঝাড়ছে দেয়াল থেকে। ঝাড়ছে টেবিল থেকে। ঝাড়ছে বিছানা থেকে। রিমির পড়ে থাকা এতটুকু জিনিসও, যা সন্দেহের সামান্য চিহ্ন হয়ে দাঁড়াতে পারে। একটি চুলের ক্লিপ হঠাত্র উত্তীয় ড্রয়ার থেকে বের করে রিমির হাতে দিয়ে বললো, সর্বনাশ! এসব তুলে নিয়ে যাও! মিতু দেখলেই ভীষণ গণ্ডগোল লেগে যাবে। আর শোন শেষ মুহূর্তে সব। চেক করে নাও, যা যা আছে। লাস্ট মিনিট চেক।
