এই ছেলেকে আর রাখা যাবে না। এবার ছাড় না দিয়ে আর নিস্তার নেই। তিনিও জানেন। আর এক ঘরে দু’খাট ফেলে শোয়া নয়।
এবার খাট যাবে আলাদা ঘরে, নেলীর ঘরে। তাই নেলীর সঙ্গে, বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে এলেও সেকথা মনে করে তিনি বারবার অস্থির হয়ে উঠছেন। একটা উটকো মেয়ে এসে ছিনিয়ে নেবে তিল তিল করে নিজের রক্তমাংস দিয়ে গড়ে তোলা তার ছেলেকে! ঈর্ষার আগুনে সেঁকা রুটির মতো ঝলসে যান তিনি। তার ছেলে, যার জন্যে জীবনে সবরকম ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে তাকে। তাই বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে আসার পর থেকেই তিনি অন্যরকম অনুভব করতে শুরু করেন।
বিয়ের দিন মা ঘরেই রইলেন। উৎসব আছে ঘরে। আনন্দ নেই। ঠিক আছে, তুমি যাও, ছেলেকে অনুমতি দিয়ে তিনি বিছানা নিলেন। সব সত্ত্বেও বিয়েটা হয়ে গেল নির্বিঘ্নে। মা যে অসুখী হারুন জানে। নেলী জানলো, কিন্তু পরে। হারুনের নতুন খাট, ড্রেসিং টেবিল, সোফা, ওয়ার্ডড্রব। সব আলাদা। জীবনে এই প্রথম হারুন অন্য ঘরে ঘুমোবে। তবে মায়ের ঘরের পাশাপাশি। নেলী তার ঘরটি গুছিয়ে নিতে শুরু করলো তার পছন্দমতো জিনিসপত্র দিয়ে।
বিয়ের তিনদিন পর, শাশুড়ি দিনদুপুরে শুয়ে আছেন। মুখের হাসি তার উধাও হয়ে গ্যাছে। তিনি খুব বিরক্ত। এদিকে নেলী খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে ঘরের প্রতিটি জিনিস আসবাবপত্র। দেখে রোমাঞ্চিত বোধ করে। এই তার স্বামীর ঘর। নেলী স্বপ্নসুখের ফেরে পড়ে। স্বামীর ঘরে তার সবকিছু বড় আপন লাগে।
বুকে দুর্বোধ্য যন্ত্রণা। হারুন আর নেলীর দিকে তাকিয়ে একটি কথাও তিনি আর বলতে চাইলেও পারেন না। গোটা বাড়ি জুড়ে সে এক অস্বস্তিকর পরিস্থিতি। নেলী ভয়ে তাকিয়ে থাকে, স্বামীর মুখের দিকে। একি!
-তিনি শুয়ে আছেন। শাশুড়িকে খুশি রাখতে নেলী চেষ্টা করে। মা আপনার কি শরীর খারাপ! নেলী ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করে।
-বলছি তো না। বলে মুখ ঘুরিয়ে নিলেন। নেলী চলে গেল নিজের ঘরে। হারুন বুঝিয়ে বলে, ঠিক হয়ে যাবে সব। একটু সময় দাও। মায়ের কষ্ট তুমি নিজেও একটু চেষ্টা করো বুঝতে লক্ষ্মীটি। কিন্তু দিন যত যায়, বাড়ির পরিবেশ তত অশান্ত হয়ে আসে। নেলী অপেক্ষা করে। আর ঝড়, একটার পর একটা, যা আসছেই।
গভীর রাতে সমস্ত বাড়িটা নিস্তব্ধ। ওরা টেলিভিশনে খবর শুনছে। ঠিক এমন সময় আবার কার পায়ের শব্দ! দেয়ালের ওপাশে।
-কে! কে! হারুনকে ঘুম থেকে ওঠায় নেলী। কেউ নেই। চোরের কোন চিহ্নই নেই। ওরা বিড়ম্বনায় পড়ে। কিন্তু মা, নির্লিপ্ত থাকেন।
-সেই ঘটনার তিনদিন পর, ফের সেই পায়ের শব্দ! ওরা বাইরে যায়! গিয়ে চোর খোঁজে, বেড়াল খোঁজে। চোর নেই, বেড়ালও নেই। এরকম প্রায় প্রতিদিনই ঘটছে।
-কার পায়ের শব্দ! কে হাঁটে! কার দীর্ঘশ্বাস! ভূত! পিশাচ!
মধ্যরাতে কে এই চলমান অশরীরী যিনি সারা বাড়িতে হেঁটে বেড়ায় হারুন! আমার খুব ভয় করছে। নেলী কাঁদে। প্রতিরাতেই নিয়মমাফিক মাকে ওঠানো হয়। কিন্তু তিনিও কিছু বুঝতে পারেন না। বলতেও পারেন না। আর হারুন, প্রতিরাতেই আরেকটু আরেকটু সন্দেহ পুঞ্জিত হয়–কে! কে তিনি! বা কে-সে?
দারুণ এক রহস্য শুরু হলো এই বাড়িতে। তা সত্ত্বেও নার্গিস বেগম এক সময় ছেলেকে বলেই বসলেন, মাঝে মাঝে তার ঘরে গিয়ে তার আগেকার বিছানায় শুয়ে ঘুমোতে। বললেন, তার কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু নেলী শাশুড়ির ঘরে কিছুতেই ঘুমোবে না বলে জানিয়ে দিল। যদিও বিষয়টা অস্বাভাবিক কিন্তু নেলী খুব বেশি কিছু মনে করলো না এই ভেবে যে এতদিনের অভ্যেস, ঠিক আছে। এরকম হতেই পারে। তবে নিজের মাকে ঘটনাটি জানালো।
কি বলিস! বললেন মা। তার কাছেও বিষয়টি ভালো না লাগলেও তিনিও ভাবলেন এরকম তো হতেই পারে! তারপরেও নার্গিস বেগমের মধ্যে এক ধরনের অস্বাভাবিকতা দিনকে দিন বাড়তেই থাকে। তিনি নেলীকে কিছুতেই সহ্য করতে পারছেন না। বিভিন্ন অজুহাতে শুরু হলো, সারাক্ষণ গাত্রদাহ। যার প্রথম আর শেষ কথা, নেলী তার ছেলেকে কেড়ে নিয়েছে।
-নেলীর ঘুম আসছে না। গতরাতেও দারুণ ঝগড়া হলো হারুনের সঙ্গে। তা সত্ত্বেও, আবার সে মায়ের ঘরে শুয়েছে। হারুন অপারগ।
বললো, মা অকাল বিধবা। প্লিজ সহ্য করো। সব ঠিক হয়ে যাবে। একথা তো আগেই পুরনো হয়ে গেছে। আর কতদিন! সন্ধে হলেই এ বাড়িতে শুরু হয় একটা চাপা অস্থিরতা। একটা দারুণ টেনশন। হারুনের শোয়া নিয়ে। দুই নারীর মধ্যে ক্ষমতার যুদ্ধ। আর নয়। ন্যায্য-অন্যায্যের দ্বন্দ্বে ক্ষতবিক্ষত নেলীর মাথায় ঢুকলো ডিভোর্স।
মায়ের সঙ্গে ঘুমোনোকে কেন্দ্র করে দু’জনের মধ্যে একসপ্তাহ ধরে কথা একদমই বন্ধ। ঝগড়ার পর কেউ কারো রাগ ভাঙালো না। হারুনের জন্যে আজ মায়াও লাগছে। তাকে সে গতকাল জুতোপেটা করেছে। হারুনই-বা কি করবে! কাকে অবজ্ঞা করবে সে! একদিকে মা আর অন্যদিকে স্ত্রী। আপন-পরের দ্বন্দ্ব এবার।
ওঠো, বলে বিছানায় শোয়া নেলী হারুনের বুকের মধ্যে মাথা গুঁজে দিলো, সদ্য বিবাহিতের দীর্ঘ বিরহ যেমন সুখের হয়। অম্লমধুর! রক্তে মাতন, উষ্ণ আবেগ, বুকের সব মধু নিংড়ে নিয়ে ভালোবাসতে ইচ্ছে হয়। হারুন তিনরাত ধরে মায়ের ঘরে শুতে যায়নি। বলেছে আর শোবেও না। তার পক্ষে সম্ভব নয়।
