এরপর সবাই আরেকবার ব্যস্ত হয়ে, এদিক-ওদিক তদারকিশেষে বাতি নিভিয়ে যে যার ঘরে শুতে চলে গেল। হারুনের মাও ঘরে যাওয়ার আগে আরেকবার দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন–মনে হয় বেড়ালই হবে। তবে বেড়াল শব্দটার ওপর যেন একটা সবিশেষ জোর ছিল।
নেলীর সঙ্গে হারুনের বিয়েটা সহসাই। এক মাসের পরিচয়ে। নেলীকে ওর কাকাই পরিচয় করিয়ে দিলো হারুনের সঙ্গে। তাতে প্রথমেই বাধা দিলেন নার্গিস বেগম। এক্ষুণি বিয়ে কিসের? মাত্র তো পাস করে বের হলো! আগে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করুক। জীবন চিনুক। বিয়ে হলে তো হয়েই গেল। এরকম কথা হারুন এর আগেও আরো অনেক শুনেছে। যখনই কেউ ওর বিয়ের কথা বলেছে–মিসেস নার্গিস বেগম প্রথমেই সেখানে বাধা দিয়েছেন।
মাকে যমের মতো ভয় পায় বলে হারুন এতকাল চুপচাপই সব সহ্য করে গেছে এবং যাচ্ছে। কিন্তু ইদানীং মায়ের এই বাড়াবাড়িতে সে নিজেও অধৈর্যবোধ করছে। চায়ের টেবিল থেকে সব লজ্জা ভুলে এবার বললো, মা আমার বিয়ের বয়সই শুধু হয়নি, পারও হয়ে যাচ্ছে। মনে রেখে ত্রিশ হবে আর তিনদিন পর। বলো আমি কি এখনো কিশোর?
চার দেয়ালের ঘরে শুধু মাকে নিয়ে থাকতে থাকতে এই একাকী জীবনে হারুন আজকাল দারুণ হাঁপিয়ে উঠেছে। চা খেতে খেতে সে কথাই তুলো হারুন। অফিস থেকে ফিরে মা আর ছেলের প্রতিদিন একসঙ্গে চা খাওয়া, এ বাড়িতে একটা নিয়ম। এক কাপ চা, ঠিক সন্ধে সাতটায়। ঘড়ির কাঁটায় কাঁটায়। হারুনের এই ঘড়ির কাঁটা জীবনের প্রতি বিরক্তি এসে গেছে। কিছু বলার আগে, সাদা নিঃসঙ্গ দেয়ালের দিকে একবার তাকালো হারুন। একটা টিকটিকি। সেদিন নেলীর সঙ্গে বিয়ের কথা ওঠানোর আগে একটু হালকা হাস্যরসের প্রয়োজন ছিল। বললো, আচ্ছা মা বলতো, টিকটিকিটা কি আমাদেরকে উল্টো দেখছে! গুরুগম্ভীর মাও হেসে উঠলো। আর সেই সুযোগে হারুন মাকে জড়িয়ে ধরে বলেই বসলো, নেলী খুব ভালো মেয়ে মা। তুমি অমত করো না। ওকে দেখলে তোমার পছন্দ হবে।
কথাটা শুনে, মা যে খুব খুশি হলেন না, তা তার মুখ দেখেই বুঝে ফেলো হারুন। -বিয়ে করছিস তুই। আমার ভালোলাগা না লাগার তুই কি পরোয়া করিস। মন। তো দেখছি ঠিকই করে ফেলেছিস, তো আবার আমাকে জিজ্ঞেস করার কি দরকার। বলে তিনি উঠে অন্যদিকে চলে গেলেন। কথাটা শুনে হারুন খুব খুশি হলো না। হোক না তিনি অধ্যাপিকা। হোক না স্বনামধন্যা এক ত্যাগী, সংযমী, সংগ্রামী অকাল বিধবা, যিনি তার একমাত্র ছেলেকে কোলে পিঠে বুকে করে দৃষ্টান্তস্বরূপভাবে গড়ে তুলেছেন। সমাজ ও ধর্মের অনুশাসনে মানুষ করেছেন। ছেলেকে নিয়ে দারুণ কষ্ট করেছেন, তবুও কারো কাছেই মাথা নত করেননি। কিন্তু এখন তো সে প্রাপ্ত বয়স্ক, তারও তো ভালো লাগা না-লাগার ব্যাপার থাকতে পারে! মুহূর্তের জন্যে ভাবলো হারুন। মায়ের সাথে ইদানীং কথা যেটুকু হয়, তা বিতর্ক। আর সে বিতর্কও একটুক্ষণ পর ফুরিয়ে যায়। তারপর দু’জন যে যার ঘরে। মায়ের সঙ্গে কথা বলার পর মনে হলো, নেলীকেই সে বিয়ে করবে। এক ধরনের ক্ষোভ। শুধু স্ত্রী নয় এই বাড়ির নীরবতা ভাঙাতে প্রয়োজন হবে একটা বড়সড় প্রলয়ঙ্কর ঝড়।
রাতটা কারোরই ভালো যায়নি। হারুনের চোখের তলে কালি। সে সারারাত জেগেছে। পরদিন মা তার স্টাডি রুমে বসে চা খেতে খেতে লেকচারের জন্য তৈরি হতে বইয়ের পাতা ওলটাচ্ছিলেন। হারুন দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষার পর দরজায় টোকা দিয়ে ঘরে ঢুকলো। ঢুকেই সাহস করে মাকে জড়িয়ে ধরে বললো, মা তুমি বুঝতে চেষ্টা করো। অন্তত একটা কথা বলার লোক আমার চাই। মা, চায়ের কাপটা নামিয়ে এবার। কিচেনে যেতে যেতে বললেন, আমি তো বলেইছি।
দু’বছর অপেক্ষা কি সম্ভব! এভাবে চলতে থাকলে নিঃসঙ্গতায় সে পাগল হয়ে যাবে। অসহায়ের মতো আর্তকণ্ঠে মাকে বললো, নেলীকে বলেছি তুমি ওদের বাড়িতে যাবে। হারুন মাকে জড়িয়ে সেই ছেলেবেলাকার মতন আদুরে গলায় বলতে থাকে আমার লক্ষ্মী সোনা মা।
মা অনেক কষ্টে শেষমেশ রাজি হলেন।
ত্রিশ বছরের ছেলের বিয়েতে মা রাজি হবেন না, বাঙালি সমাজে এমন ঘটনা বিরল। কিন্তু হারুনের বেলায় এই ব্যতিক্রমের কারণ, মাত্র ত্রিশ বছর বয়সে এক কচি শরীরের বিধবা, যার স্বপ্ন, স্বপ্নই রয়ে গেল, যিনি স্বামীর অপমৃত্যুর পর চারপাশের মানুষদের মধ্যে লোভ-লালসা আর ধৃষ্টতা দেখে নিজের দেহ-মনকে এক অদৃশ্য শেকলে বেঁধে সঙ্কল্প করলেন আর নয়। অনাথ ছেলেটাকে মানুষ করাটাই জীবনের ব্রত হিসেবে গ্রহণ করাই হবে কাজের কাজ। অন্তত এই জন্তু-জানোয়ার আর পাশববৃত্তির দেশে। যে দেশে বিধবা বিবাহ মানেই চাই তার স্বামীর রেখে যাওয়া অর্থ-সম্পত্তি এবং তারপরে তো শরীরের লোভ আছেই। এখানে প্রেম-ভালোবাসা বলে কিছু নেই।
স্বামীর মৃত্যুর পর নিজেকে ব্যস্ত রাখার জন্যে তাই তিনি বেছে নিয়েছিলেন শিক্ষকতা। হলেন নামকরা শিক্ষক। আর পাশাপাশি এক আদর্শ মা। আগে কোনও সাহায্য চাইতেই, আত্মীয়-স্বজন বিয়ের উপদেশ দিতেন। কিন্তু ধীর স্থির, সমাজ ও ধর্মীয় অনুশাসনে বাধা এই নারী, পরিমিত জীবনে অভ্যস্ত হতে হতে বিয়ের সমস্ত সম্ভাবনাই নাকচ করে দেন। স্বেচ্ছায় নিভিয়ে দেন শরীর এবং যাবতীয় অনুভূতির কোষ, স্নায়ুর যন্ত্রণা।
