এবং দেখা গেছে সবশেষে এই অসামাজিক ও অযাচিত দু’জনই শেষ পর্যন্ত দু’জনকে বাঁচিয়ে রাখে। সন্তান নয়, আত্মীয় নয় এই দু’জনই শুধু দু’জনের, যারা অযাচিত, যারা অসামাজিক। যে সঙ্কট সমাজ বোঝে না তার উত্তর এই অযাচিত দু’জন।
ওরা শিথিল ওরা শীতল। ওরা ফানি, ওদের চাওয়া, যৌবনের লিঙ্গ যোনির চাওয়া-পাওয়া থেকে ভিন্ন। ওরা সঙ্গী।
তা সত্ত্বেও বার্ধক্যে, শুষ্ক নারী আর শিথিল পুরুষ, দুই পাটি দাঁত খুলে রেখে বিছানায় ওরাল সেক্স আর সুগন্ধ ভেসেলিন বিকল্প নিয়ে ওরাও যে মাতে না অবিনশ্বর। আনন্দে, কে বলে? যে বলে সে ঘুণ কাঠ। ঘুণে খাওয়াই নয়, অন্ধও বটে। প্রেম বার্ধক্য ঠেকায়। মৃত্যু দূরান্বিত করে। প্রেম ভালোবাসা, পরকীয়া অউর, নো। পরকীয়া=পেয়ার জিন্দেগি হ্যাঁয়। যে-কোনও বয়সে। যে-কোনও সমাজে। এখানে সবাই, মানুষ।
১৯. তৃষাদীর্ণ
কিছু কষ্ট আছে, যে কথা কাউকে বলা যায় না। কিছু যন্ত্রণা যা অযাচিত, তবুও আমরা তা মেনে নিতে বাধ্য। কিছু সময়, যা ক্ষমাহীন। কখনো, কারো কোনও ব্যবহার যা অশোভন শুধু নয়–গা কামড়ে ওঠা। কোনও আলো, যা অন্ধকারের চেয়েও ভয়ঙ্কর। মা আর মাতৃত্ব। যা কখনো কখনো ক্ষমার অযোগ্য। এমন হলে কি তার উত্তর, সেই প্রশ্ন হয়ে ওঠে জীবনের সবচেয়ে বড় লজ্জা।
রাত গম্ভীর হয়ে গ্যাছে। শহরের নববিবাহিত মানুষ-মানুষীরা তখন, একে অপরের বুকে শরীরের উষ্ণ ওমে আচ্ছন্ন। নববিবাহিত হারুনের শরীরটাও তখন সবেমাত্র শিথিল হচ্ছে। শরীরের তলে ওকে জাপটে ধরে শুয়ে আছে সোহাগিনী নেলী। দু’জনেরই শরীর প্রচণ্ড ঘামে কুলকুল করছে। সপসপে দু’হাতের শেকল খুলে গেলেও, নেলী কষ্ট করে সে শেকল বারবার আরও জোরে বাঁধবার জন্য উত্তাল ঢেউয়ের মতো আছাড়ি-পিছাড়ি চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, যাতে অনুভব, অনুভূতির ব্যাপারটা গভীরতর হয়। দু’জনেরই চোখ বন্ধ। উন্মত্ত অধীর ভালোবাসায় চোখের পাতা ভারি। কণ্ঠ-বেসুরো। ঠিক তখনি শব্দ হলো দেয়ালের ওপাশ থেকে দুটো পায়ের। কে যেন হাঁটছে। থপ-থপ…।
–কে? কে ওখানে? নেলী, হারুনকে এক ঝটকায় ফেলে দিল ওর শরীরের ওপর থেকে। চোর! চোর! বলতে বলতে সে উঠে দৌড়ে বাথরুমের দিকে ছুটে গেল। আওয়াজটা খুব স্পষ্ট। থপ থপ থপ। দ্রুত অপসৃয়মান পায়ের স্পন্দন। হারুন বাথরুমে গেল না। চাঁদর দিয়েই ওর পিচ্ছিল অঙ্গ মুছে কাপড় পরে ফেলো। পরক্ষণেই দরজা খুলে বাইরে এসে জোরে হাঁক-ডাক দিয়ে চেঁচিয়ে বলে উঠলো–কে কে ওখানে? এরপর বাইরের সব বাতিগুলো সে একে একে জ্বালিয়ে দিলো। পেছন পেছন এলো নেলী। ভয়ে ওর সর্বাঙ্গ থরথর করে কাঁপছে। নেলী হারুনের পেছন পেছন ওর শার্ট ধরে কম্পমান পা ফেলছে। ভয়ে বিহ্বল নতুন হাঁটা শেখা এক শিশুর মতো লাগছে তাকে। হারুন ঘরের প্রতিটি কোণ খুঁজে খুঁজে কিছুই না পেয়ে অবশেষে মায়ের ঘরে গিয়ে মাকে ঘুম থেকে জাগিয়ে দিয়ে বললো, মা ওঠো, ওঠো-ও-ও-ও–না। ঘরে চোর ঢুকেছে।
–মা, ওপাশ থেকে এপাশে ফিরে আড়মোড়া ভাঙতে ভাঙতে বিরক্ত কণ্ঠে বললো–কি বলছিস!
–চোর! চোর ঢুকেছে! ওঠো!
–মা উঠলেন স্বাভাবিকভাবে। কি বলিস! চোর! তেমন আশ্চর্য হয়েছেন বলে মনে হলো না। যেন এটাই স্বাভাবিক।
শাড়িটা তার গুছিয়েই পরা ছিল। তিনি বিছানা ছেড়ে বারান্দায় এসে দাঁড়িয়ে বললেন, ছাদে দেখেছিস?
–না-মা! বলেই হারুন দৌড়ে ছাদে গেল আর সেখান থেকে ফিরে এসে বললো,, কেউ নেই।
নেলী বললো, চোরই যদি হবে, তবে তো একটা কিছু চিহ্ন থাকবে। কই, সে রকম কোনও আলামতই তো দেখা যাচ্ছে না। পালিয়ে যাওয়ার মুহূর্তে অন্তত দৌড়ঝাপের শব্দ বোঝা যাবে। তাই নয় কী? তেমন কিছুই তো টের পেলাম না!
–ঠিকই তো। কে বলে বুদ্ধি নেই নেলীর! বললো হারুন।
–শাশুড়ির বিচারে নির্বোধ এই মেয়েটির কথায় মনে হলো একটু নড়ে উঠলেন শাশুড়ি স্বয়ং নিজেই। সেই সঙ্গে ছেলের মুখে বৌয়ের সামান্য প্রশংসায় কেমন যেন বিচলিতও মনে হলো।
অকাল বিধবা অধ্যাপিকা নার্গিস বেগম, ওরফে নার্গিস। মাত্র ত্রিশ বছর বয়সে তিনি এই অযাচিত শাস্তির শিকার হন। স্বামীর অপমৃত্যুর পর থেকে এই একটি মাত্র সন্তানকে ঘিরে শুরু হয় তার জগৎ। অত্যন্ত মায়া মমতা স্নেহ দিয়ে মানুষ করেছেন একমাত্র ছেলেটিকে। এবং এই স্নেহটুকু সম্বল করে, তাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখে দেখে কাটিয়ে দিয়েছেন তার যন্ত্রণাদগ্ধ একাকিত্বের দুঃসহ জীবন। এই জীবনের বাইরে, ছেলের এই বিয়েতে তার বিশেষ ইচ্ছে ছিল না বলে বৌয়ের সাথে কখনোই তার তেমন সমঝোতা গড়ে ওঠেনি।
সে রাতে মন থেকে না চাইলেও, নেলীর সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে একই সুরে তিনি বললেন, তাইতো! সেরকমভাবে ভাঙচুরেরও তো কোনও শব্দ শোনা গেল না। তাহলে নিশ্চয় চোরটোর নয়। এরপর আরো কিছুক্ষণ খোঁজাখুঁজি চললো। দরজা-জানালা কোনওটাই তো ভোলা দেখা গেল না। এমনকি একটা ফুটো বা ভাঙা দেয়ালও কোথাও দৃষ্টিগোচর হলো না। নেলী বললো মনে হয় নিশ্চয় কোনও বেড়াল-টেরালের কাজ হবে নিশ্চয়। দুধ-টুধের খোঁজে। হারুন সঙ্গে সঙ্গে বললো, হতেই পারে। প্রয়োজনে মানুষ স্বস্তির জন্যে সবসময় অজুহাত খুঁজে পায়, হারুনও পেলো–বললো, পাশের বাড়ির হুলোটা তো বেজায় জ্বালাচ্ছে।
