মধ্য বয়সের নিঃসঙ্গতা
যখন অপরপক্ষ মারা যায় বা চলে যায়, বিচ্ছেদ রচনা করে! যখন সমাজ ও ব্যক্তি দুটি প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়ায় নৈতিক ও মানসিক প্রশ্নে! যখন সত্মা বা সৎপিতা কিংবা গার্লফ্রেন্ড বয়ফ্রেন্ড ইত্যাদি জাতীয় সম্পর্ক কোনওরকমেই সন্তানের হৃদয়ে গ্রহণযোগ্য নয়, তখন! কিংবা কন্যার বিবাহ প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায় অমন দ্বিতীয়বার বিবাহিত নষ্ট বিধবা মায়ের চরিত্রের কারণে!
মধ্য বয়সে, বা যে-কোনও বয়সে, যে-কোনও কারণে মানুষ একা হয়ে গেলে, সমাজ সন্তান সংসার ও সংস্কার যখন তাকে সেই অবস্থাতেই বিশুদ্ধ বিধবা নারী বা বিপত্নীক পুরুষ দেখতেই অধিক উদ্গ্রীব থাকে তখন ব্যক্তির জীবনে নিঃসঙ্গতায় যে মৃত্যুর চেয়েও অধিক নিষ্ঠুর অন্ধকার নেমে আসে, এবং সেই অন্ধকার থেকে সৃষ্ট হতাশায় আসল মৃত্যুর প্রত্যাশা, সেই কি ভালো?
তার পাঁজরের তলে রুদ্ধ হয়ে আসা শ্বাস, রাতের অন্ধকারে তার স্নায়ুযুদ্ধ, নিঃসঙ্গতায় ভেঙে আসা বুকে, সঙ্গী বা সঙ্গিনীর স্পর্শ প্রেম আদর ভালোবাসাহীনতায় সৃষ্ট মানসিক শুষ্কতা, প্রত্যহ হারিয়ে যেতে থাকা মানসিক উজ্জীবন! তার প্রতিদিন! তার নিষ্ঠুর রাত্রি! সৃষ্টিশীলতা!
একটি হাতের ছোঁয়া! একটু ছোঁয়া। পাশে এসে বসা। শরীরে স্নেহের আঙুল। তৃষিত, এক জোড়া ঠোঁটের কি করুণ সুধাপান পিঠে হাত রেখে, পায়ে পা ঘষে। মনন্তরের ক্ষুধায় কাঙাল শরীরের, কি নিবিড় বিনিময়!
কোনটি ভালো? নিঃসঙ্গতা ক্যান্সারের চেয়েও কঠিন ব্যামো। দীর্ঘ-দীর্ঘ দিন বিধবা বা বিপত্নীকদের দ্রুত মানসিক ভারসাম্যহীনতার পরিসংখ্যান সে কথাই কি প্রমাণ করে ছাড়েনি? কেন জানবো না যে পঁয়ত্রিশের পর যে-কোনও নারী, বা পঁয়তাল্লিশের পর যে-কোনও পুরুষ মানসিক ভারসাম্যহীনতার মুখোমুখি দাঁড়ায়! জীবনের অর্ধেকের বেশি সময় ইতোমধ্যেই চলে গেছে। নতুন করে দেখার পাওয়ার চাওয়ার কিছু নেই। জীবনের রঙ সব জলে গেছে। জীবনের সুখ সব ঝরে গেছে। ফিকে আকাশ। সমুখে তাকিয়ে শুধুই পড়ন্তবেলার সূর্য ছাড়া কিছু নেই। আর নতুন কোনও ভোর হবে না এই বয়সের পর। যা হবে তা অস্ত। এবং এর সঙ্গে যখন জমা হয়, মধ্য বয়সের নিঃসঙ্গতা সেখানোই সমূহ সর্বনাশ। মধ্য বয়সের মন এবং শরীর যখন নদীর টলটলে জল, যখন জলের উৎস সরোবর থেকে সৃষ্ট ঝরনাধারা বাধাপ্রাপ্ত হয়। তখন সে নদীর কি দশা?
বার্ধক্যে নিঃসঙ্গতা
মৃত্যুর চেয়েও ভয়ঙ্কর। অন্ধকার আকাশের চেয়েও, কালো। বার্ধক্যে যারা বিধবা বা বিপত্নীক তাদের নিঃসঙ্গতার কষ্ট যৌবনের নিঃসঙ্গতার চেয়ে আরো গভীর কালো। এবং শুধু সেই বোঝে, যার এ দশা হয়। বার্ধক্যে একটা সঙ্গীর প্রত্যাশা সবকিছু ছাড়িয়ে যায়। একজন কথা বলার সঙ্গীর বিকল্প নেই তাকে ডাক্তার, ওষুধ কাউন্সিলিং থেকে দূরে রাখতে। একজন রক্তমাংস, যৌবনে তাকে যত নয় প্রয়োজন তার উপস্থিতি, বার্ধক্যে যা লক্ষগুণ অধিক যাচিত।
কর্মবিহীন জীবন যখন সঙ্গীবিহীনতার সঙ্গে যুক্ত হয় তখন সে ঘোলা নরকের মুখোমুখি। জীবন তখন বোঝ। তার বেঁচে না থাকা, সমান। বেঁচে থাকাটাই অপচয়। ঈশ্বরকে সে মাথা কুটতে কুটতে দোষ দিয়ে বলবে কেন সে বেঁচে আছে! কেন? কি পাপ করেছে সে! মনে হবে। বোঝ। সার্বক্ষণিক পাথরের পাহাড়, পাহাড়, পাঁজরের তলায় চেপে বসে শুধু কষ্টই দেয়। যার তলায় চাপা পড়ে থাকে, রুদ্ধশ্বাস। কখনো যা পুরোপুরি বের হয় না, মনে হয় কে যেন তার গলা টিপে তাকে চব্বিশ ঘণ্টাই শুধু কষ্ট দিচ্ছে। তার কষ্ট হয় হাঁটতে, বসতে, শুতে, খেতে, বলতে, নিশ্বাসে, প্রশ্বাসে…।
যদি কেউ ভুল করেও ভাবে বার্ধক্যে, পুনর্বিবাহ বা বন্ধুত্ব গড়ে ওঠা অসামাজিক এবং নিন্দনীয়, তবে সে জীবন সম্পর্কে কিছুই জানে না। বরং বার্ধক্যে বিধবা ও বিপত্নীক হয়ে দ্রুত তাদের পুনর্বিবাহ বা স্থায়ী বন্ধুত্ব, যৌবনের কারণের চেয়ে এতটুকুও কম নয়, যখন মানুষ পরনির্ভরশীল। প্রায় বৃদ্ধ। এবং অপরের বিরক্তি। সেই বোঝা বিরক্তির জন্যে তাকে চাই যে নিজেও অন্যের বোঝা বিরক্তি। সঙ্গীবিহীন বার্ধক্য=ওষুধ+মানসিক অসুখ+অভিযোগ। অতএব বার্ধক্যের সঙ্কট, এই পুরুষ বোঝ বিরক্তি+নারী বোঝা বিরক্তি=সমাধান। অর্থাৎ মাইনাসে মাইনাসে প্লাস (- – = +) বিছানায়, শূন্যতার বদলে উষ্ণ ওম। ঘরে নিস্তব্ধতার বদলে, কোলাহল। টেবিলে একাকিত্বের বদলে মুখোমুখি নিশ্বাস। এতে সমাজেরই-বা কি সমস্যা, সংস্কারেরই-বা বলার কী? সমাজ কি মানুষের প্রকৃত সঙ্কট, জানে? জানলে, ছিছিক্কারে কেন ভরে ওঠে বাতাস, যখন কোনও বৃদ্ধ বিধবা বা বিপত্নীকের বিয়ে হয়! কেন সন্তানেরা তাদেরকে এত দ্রুত ত্যাগ করে? কেন আত্মীয়েরা ঘৃণায় মুখে দেখে না? কেন পড়শিরা ঘরে ঘরে রটিয়ে দেয় কোন দুশ্চরিত্র বা দুশ্চরিত্রার গল্প! কেন শ্বশুড়বাড়ি থেকে বিতাড়িত হয়, কারো ছেলের বৌ ছেনাল বাপের জন্যে? অলস দুপুর কেন অলস থাকে না, কেন বৃদ্ধ ছেনালের গল্পে। নিঃসঙ্গতার নরক সংবাদ কি কেউ রাখে?
বার্ধক্যে নিঃসঙ্গতার সঙ্কট, যতটুকু জানি, যা ভাবি, তার চেয়েও গভীর। অন্ধকারে কত পথ হাঁটা যায়? চেনা পথটুকুও, অন্ধকারে ভুল হবে।
কেই-বা বুঝতে চায় বয়স্কদের সমস্যা! সে সময়, কার আছে? তবুও বুঝতে হয় যে বার্ধক্যে মানুষ আরো বেশি অসহায় আর পরনির্ভরশীল। অনেক বেশি বাঁচাল। হরমোনের শুষ্কতায় শরীরে ও মনে তারা অনেক বেশি জটিল। তাদের মৃত্যু দুয়ারে। বিরক্তি লাগে, দেখলে এড়িয়ে যেতে হয়, মুরুব্বির চেয়েও তারা অধিক বোঝ। কোন পুত্রবধূর সংসারে ওরা ওষ্ঠাগত প্রাণ। হায় খোদা কেন বেঁচে আছে, মরে না কেন? মনে হয়! মেকি আদর। মেকি ভদ্রতা। মেকি সম্মান। মেকি সব মেকি। যাচিতের চেয়ে তারা বরং অযাচিত। কার সময় আছে! ওষুধ পথ্য খেলো কি খেলো না, এত কে দেখে? গু-মুতের কাপড় কে ধোবে? কেন এসব অতিরিক্ত বালাই! খেয়ে কাজ নেই? সংসার নেই। স্ত্রী নেই? স্বামী নেই! ছেলেমেয়ে নেই? এই প্রশ্নগুলো, প্রশ্ন যা যথেষ্ট সামাজিক। কিন্তু কেউ এর সমাধান খুঁজে নিলে তা ‘অসামাজিক।’ হয়, ‘অযাচিত’ বা ‘ছেনাল’।
