অবৈধ কাম
নিষিদ্ধ বলে যা অশ্লীল। অবৈধ বলে যা লোভনীয়। অবৈধ কাম! যদিও সামাজিক নয় কিন্তু সুখের তাড়না রতির তাড়নাকেও ছাড়িয়ে যায়। ফলে রতির সুখ সম্পূরক হয়ে দাঁড়ায় অন্য অন্য সার্বিক সুখভোগের। কিসের বৈধতা! রতির তাড়না মানে কী, কোনও বৈধ-অবৈধতা? এই সুখের পেছনে শুধু সুখানুভূতি ছাড়া চাওয়া-পাওয়া নেই বলে সুখের স্থায়িত্ব প্রগাঢ়। কিন্তু যখনই রতি সুখকে বৈধতা দিতে বিবাহ বন্ধনে তাকে আবদ্ধ করা হয়, চাওয়া-পাওয়া তখন রতি সুখের চেয়েও অন্যদিকে প্রাণ পায়। দাম্পত্যের সুখ, ক্ষণজীবী। এখানে থাকে সংসার সন্তান সমাজ ও সংস্কার। এই চার স’ মিলে ক্রমাগত। উৎপাটন করতে থাকে সুখের সকল চাষাবাদ।
আমি সর্বাণী রায়
প্রেমের বিষয়ে পৃথিবীতে অবৈধতার প্রশ্ন, প্রশ্নই থেকে যাক। কেননা প্রেমের বৈধতা নিয়ে বিতর্ক আমার সাধ্যে সাহসে কুলোবে না। আমি সর্বাণী রায়। প্রেম আমি খুব ভালো করে চিনি। কারণ আমি প্রেম করেছি। একাধিকবার। একাধিক জন। তার মানে একাধিক ব্যক্তিত্ব আমায় প্রেমের অনুভূতি দিয়েছেন। সে অর্থে আমার অভিজ্ঞতা ফেলনা নয়। প্রেমের অনুভূতি দিয়েছেন। সে অর্থে আমার অভিজ্ঞতা ফেলনা নয়। প্রেমের ব্যাপারে প্রতিটি ব্যক্তিত্ব আসে যার যার নিজস্বতা নিয়ে। প্রেমে, একেকজনের চাওয়া, প্রকাশ, রুচি, অভ্যেস, সংস্কার ভিন্ন যেমন কোনও কোনও মানুষের কাছে প্রেমের অনুভূতিই সব। কেউ, শরীর। কারো শরীরই সব, কারো অনুভব। কারো দুটোই আবার কেউ প্রেমই বোঝে না। কেউ বোঝে স্বর্গীয় আলোকে। কেউ কেউ হতাশায় শুধু রিক্ত ও ক্লান্ত হতে হতে। এবং এও সত্য যে-যে-কোনও প্রেম, ব্যাখ্যার ঊর্ধ্বে। বৈধ-অবৈধতার বিতর্কের ঊর্ধ্বে। পরকীয়া, সেও প্রেম। প্রকৃত প্রেম। হৃদয়ে নব-যৌবন। স্বামী-স্ত্রী, সেও। লেসবিয়ান হোমো বাইসেক্যুয়াল ওরাও প্রেম করে।
প্রেম অনন্য। প্রেম ছাড়া মানুষ বাঁচে না। যে বেঁচে আছে, সে সত্যিই বেঁচে নেই। সে অন্ধকার। নিয়তই মানসিক ও শারীরিক নিষ্ঠুরতার চাবুকে বিধ্বস্ত। সে নিয়ত মরে যেতে চায়।
মানুষের বিচিত্র জীবনে বিচিত্র সব ঘটনা ঘটে। আমি সর্বাণী। আকাল বিধবা। তবে এখন অবৈধ প্রণয়। পরকীয়া কি আমি তা বুঝি না। এই মুহূর্তে বুঝতে চাইও না। বুঝি, প্রেম। বুঝি প্রেম বদলে যায়। এক মানুষ থেকে, অন্য মানুষে। এক দেহ থেকে অন্য দেহে। যেতেই পারে। কারণ বিষয়টা বহুমাত্রিক। আমরা ক’জন জানি যে প্রেমের রয়েছে নিজস্বতা, যা মানুষের নিজস্বতার উর্ধ্বে। সুতরাং সমাজ, পরকীয়া বলে যাকে সহজেই ভুল বোঝে, বুঝে তাকে কঠোর সব প্রাচীন অবাস্তব শাস্তির কাছে আজও হেনস্তা করে, বাস্তবে তা প্রমাণ করে কতিপয় ব্যক্তি –তাদের বীর্য ও সমাজে, বুদ্ধির নিরক্ষরতা।
প্রেম পাল্টায়। তার মানেই পরকীয়া নয়। স্রেফ প্রণয়। সে অর্থে পরকীয়া আসলেই পরকীয়া নয়। বিবাহিত স্বামী-স্ত্রী পরবর্তীকালে অধিকাংশ সময়েই তারা শরীর, যা মিটে গেছে। তা সত্ত্বেও দাম্পত্যের সীমানা। এর বাইরে গেলেই অবৈধ। এবং যে প্রেম শুকিয়ে যায়, সঙ্কটে, বিচ্যুত বিধ্বস্ত দাম্পত্য সে, বিকল্প খুঁজে নেয় অন্য মানুষে, অন্য শরীরে, যেখানে প্রেম আছে। শরীরের প্রকৃত সুখ আছে। আছে দুস্থ রতি ও কামনার স্থলে, স্বর্গময় সুখভোগ। যা থেকে শরীরসর্বস্ব প্রেমবিহীন স্বামী-স্ত্রী বিচ্যুত বহুদিন। সংস্কার চৌকাঠ পেরোলে তা, অবৈধ কেন হবে?.খুব সঙ্গতভাবেই প্রেম শুকিয়ে গেলে, পরকীয়ার প্রশ্ন আসে। সমাজের অন্যদের মতেই এটাও জীবনের অঙ্গ। না চাইলেও বেঁচে থাকার অন্যতম উপাদান। অনেকের জন্যে পরকীয়াই একমাত্র উপাদান। কারণ, ঘরে ঘুণধরা দুটি সম্পর্ক যা শুধু দুটি, থাম।
প্রেম শুকিয়ে যায় কেন তার কি কোনও হিসেব আছে? সমমনা না হলে শরীর কদিন ধরে রাখবে দুটো উল্টো মনের মানুষ! পা যায় তখন ঘরের বাইরে। হাত বাড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে হয় নিষিদ্ধ ফুল। সেই দুর্গন্ধ ব্লাউজ সেই বিবর্ণ পেটিকোট যার গন্ধে, পেট উগরে বমি আসে। সেই অমসৃণ উপত্যকা যার চামড়ায় নাক ঘষলে নাকে উঠে আসে তীব্র গন্ধ, যা মোটেও পরিচ্ছন্ন নয়। অথচ ঘরে পরিচ্ছন্নতা রেখে অপরিচ্ছন্ন নিষিদ্ধ পরিবেশে পতিতার আড্ডা তার শরীর সমাজের সব কঠিন প্রশ্ন, প্রশ্ন এড়িয়ে সত্য হয়ে দাঁড়ায়। কিসের এত প্রশ্ন যখন নারী তার পুরুষের পুরুষ বৃন্তের শৈথিল্যে মানসিক যুদ্ধে পরাস্ত। যখন সে মাসের পর মাস অনুপস্থিত। স্বামী যখন প্রবাসে। স্ত্রী যখন প্রবাসে। যখন ঘরের চেয়ে সুখ টানে পতিতালয়! স্ত্রী নয়। যখন পতিতাই উজ্জীবিত করে তার প্রয়োজনীয় সৃষ্টিশীল মনমানসিকতা! যখন পরকীয়ার তীব্রতা বৈবাহিক বন্ধনকে ছাড়িয়ে যায়। যখন তার নিষ্ঠুরতা, অমনোযোগ, আকর্ষণ করে অন্য প্রেম। যখন তার হাতের তলে সে ফোটে না বসন্ত মহিমায়! অসম মনমানসিকতা যখন দু’জনের মধ্যে ফুটে বের হয়, দূরত্বে। যখন দূরত্ব এত দীর্ঘ হয়, যা অতিক্রম করে দু’জনে আর পৌঁছতে পারে না দু’জনের কাছাকাছি তখন, যখন একটি ছোট বিছানায় পিঠ ফিরিয়ে শোয় দু’জন মানুষের মধ্যেকার দু’হাত ফাঁকে, অনন্ত ফাঁক! হাহাকার। হাজার হাজার মাইল ফাঁক। যখন তার তারুণ্য তুঙ্গে। আর অপরপক্ষ শীতল। যখন সে কণিকায়, মল্লিকা দেখে। সে দেখে অরূপে, শিশির। যখন দোহের মিলনে সৃষ্ট সন্তান সংসার দশ বছরশেষে তাকেই হঠাৎ মনে হবে আগন্তুক, এবং পরম তিতিক্ষার আবেগ প্রেম মাধুর্য বসন্ত, নতুন করে মেলে দেবে তার কুঁড়ি, খুঁজে নেবে প্রেমের প্রকৃত সম্ভার, অন্যজনে! যা নতুন! যা যাচিত! যা স্বর্গীয়! যা জীবনে কখনো এর আগে ঘটেনি বা এমন সৌরভে, মহিমায় ফেটেনি!
