আমি সর্বাণী রায়। ব্যর্থ দাম্পত্য শেষে আজ বিধবা। অলস দুপুরে হা-হুঁতোশ বসে আজ অতীত সুখের মুহূর্তগুলো আমিও স্মরণ করছি। হ্যাঁ, তিনি এসেছিলেন। নিশ্চয়ই এসেছিলেন তিনি! তবে এসে বিশেষ বসেননি। এতই দেমাকি তিনি যে এসেই চলে যেতেন। অহঙ্কারী অধ্যাপিকা শাশুড়িসমেত। ভীষণ দেমাকি আর অস্থির প্রকৃতির। জোয়ারের চেয়েও, ঘূর্ণির চেয়েও, বিদ্যুৎচমকের চেয়েও দ্রুত। তিনি কমেট। একশ’ বছরে একবার উদয় হন। অস্ত যাওয়ার আগে দান করে যান প্রচণ্ড স্বর্গীয় আলো। দুধে ধোয়া চৈত্রের খাঁ-খাঁ রোদ্দুরের আলো। …তখন আমার সমস্ত পৃথিবীটা পাল্টে যেতো। তখন আমি স্পষ্ট দেখতে পেতাম আমার মস্তিষ্কের ভেতরে স্নায়ুস্থল যা আমার সহসা চঞ্চল অন্ধকার মনটাকে নিয়ন্ত্রণ করে। এবং সেই আলোর স্মৃতি মনে করে আমি আজও স্পষ্ট দেখতে পাই সেই স্বর্গ, আমার স্বর্গীয় অনুভূতি। তখন আমার কাউকে ভালো লাগে না আর। সুখ এমনই। জ্যোৎস্নার আলপনায় বোয়া আলো। নীরবে চলে যায়। এবং আমি এই তাৎক্ষণিক সুখে আরও অধিক বিভ্রান্ত হই। ভাবি এইতো সে। এই তো। আমি ভুল বুঝি। ভাবি তিনি চলে যাবেন না। কিছুতেই না। কারণ তিনি আমার জন্যেই এসেছেন। তিনি থাকবেন। এই সঘন সুন্দর শ্যামলিমায় মহিমান্বিত তিনি কখনোই আর যাবেন না। কিন্তু…চলে যান। তিনি চলে যান। চাঁদের আলোর মতোই তিনিও, ধরা দিয়েও না দিয়ে সব নিয়ে নিভে যান। তবুও, আবার উদয় হবেন এই আশায় মানুষ অপেক্ষায় রয়। আমি এস রায়। আমিও, সেই আশাতেই, হাঁ-মুখো বসে রই।
তিনি যান অসুখী মানুষদের ঘরে ঘরে তার যেখানে কর্মব্যস্ততা। বিশেষ করে পৃথিবীতে ধর্ম আসার লগ্ন থেকে। নেই বলেই তো তাকে পাওয়ার এমন তীব্রতা। থাকলে হতো না। এই কান্না! আহা! বটে! তিনি এলেন তবে? এলেন যদি, তবে কেন। তিনি এমন ক্ষণজীবী!
যা যাচিত, যাহা কাম্য, পৃথিবীতে সেই-ই হয় ক্ষণজীবী। যা চাই না, তা লেগে থাকে যার প্রয়োজন নেই, সেই-ই চোখের সামনে। যাহা চাই তাহা পাই না। সুখ তাদেরই একজন। সুখ! আছে বলে কোনও কথা নেই। ছিল, সেই-ই স্মৃতি। সেই সুখের স্মৃতি আগলে থাকা। অনুভবে তাকে পাওয়া। এইটুকুর নামই সুখ।
স্বামী স্ত্রী সন্তান নিয়ে গড়ে ওঠে একটি পরিবার। জীবিত অবস্থায় একজনের বিরুদ্ধে অন্যের সর্বক্ষণ অভিযোগ। কিন্তু হঠাৎ একজন ইহজগৎ ছেড়ে চলে গেলে সেখানে যে শূন্যতার সৃষ্টি হয়, সকল কষ্ট উপেক্ষা করে বড় হয়ে দেখা দেয় তখন তার অতীতের যা কিছু সুখ। তার সঙ্গে কিঞ্চিৎ মধুর স্মৃতি বড় হয়ে দাঁড়ায়। সব মন্দ তুলে রেখে ভালো। সুখ অতীতের। যখন তিনি বেঁচে ছিলেন। মনে হবে মাতালটা যখন বেঁচে ছিল তখন তার উপস্থিতি সহসাই এনে দিতো অভিযোগ আর কলহ। আর তার মৃত্যুর পর সব ছাপিয়ে শুধু তার বেঁচে থাকার মধুর স্মৃতিই সবচেয়ে বড় উপলব্ধি হয়ে দাঁড়ায়। মনে হয়, না হয়, পেটাতো! না হয় মদ খেয়ে গভীর রাতে এসে ছিন্নভিন্ন করতে শরীর। ক্রোধে আক্রোশে ঘৃণায় না হয় ফালাফালা করতো এই না খাওয়া দুর্বল দেহটুকু। তবুও তো মাতালটা বেঁচে ছিল! দিন শেষে বাড়ি ফিরে এই যে পেটাতো, তবুও তো চিৎকার করে জানাতাম বেঁচে আছি। আর আজ এই নিঃসঙ্গতার উপকূলে এত নির্জনতা মনে হয়, মৃত্যু। কাঁদি মনে করে। তখন বাবা বেঁচে। ভাইবোন সব এক ঘরে, এক সঙ্গে বড় হচ্ছি। মার মাথা ভর্তি কালো চুল। ভরা যৌবন তার। ক’টি শিশু আমরা হাঁসের মতো কৌতূহলে চষে বেড়াই পুকুর পাড় থেকে সি এন্ড বি রাস্তার ওপাশে কাঁচা ট্যানারির দুর্গন্ধ ঘরে। কাঁদি কৈশোরবেলার সুখে। মনে হয় বিয়ের রাত্রির কথা। চিত্ত উথলে ওঠে সুখে। বাসর রাতের স্মৃতি যখন তিনি বলেছিলেন আমাকে তোমার পছন্দ হয়েছে! তোমাকে আমার খুব পছন্দ হয়েছে। আমি এক ভীত মেষশাবকের মতো, স্তব্ধ। মনে আছে তিনি হেসে, আমাকে তার বুকে অনেক্ষেণ চেপে ধরে বসে বসে কি যেন সব বলছিলেন। আর আমি ক্রমশ শীতল থেকে তাপিত আগুন হচ্ছিলাম। তারপরই সব উধাও। কি যেন হলো। তিনি চলে গেলেন চিরদিনের জন্যে। আমি নিরন্তর একা! সুখের মুহূর্তগুলো এমনই ক্ষণিক হলো। এমনই অপার্থিব। নশ্বর।
সুখ শুধু সময়ের গায়ে তীব্র আঁচড় কেটে রক্তাক্ত করে চলে যায়। আর সেই ক্ষত আগলে বসে আমরা বাকি জীবন সুখের আক্ষেপ করে করে শুধুই দুঃখ পোহাই। জীবটা শুধু দুঃখসার।
সুখের সীমানা যদি হয় পুকুরের তল, দুঃখ তবে অতল সমুদ্র। সুখ যদি হয় জলাশয় হঠাৎ বৃষ্টি, দুঃখ তবে বৃষ্টির অভাবে তাপিত স্থবির জলাশয়।
কৈশোর ও যৌবনের কত অজানা
কিছু কিছু বিশেষ পরিস্থিতি ছাড়া, কৈশোর বা যৌবনের প্রারম্ভে মনে যে বসন্তের আঁচড় লাগে তাকে বড়ই স্থায়ী বলে ভাব হয়। জীবন মুহুর্মুহু রঙ বদলায়। নীল-হলুদ-খয়েরি। কৈশোর ও তারুণ্যের শরীরে বসন্ত খুঁজে পায় তার নিকেতন। এই বসন্তের রঙ সবুজ, লাল, নীল, কমলা।…মন হয় রঙধনু। প্রিয়ার কণ্ঠের সাতনরী। বা কমলার কোয়ার মতো তার ঠাসা পুরু এক জোড়া অর্ধচন্দ্র ঠোঁট। এই তো কৈশোর। এর মানেই কণ্ঠস্বর ভাঙা। মানেই বয়োসন্ধির আয়োজন। স্বপ্নে জাগরণে রতি সুখ। কিশোরের ঠোঁটে গোফের রেখা। কিশোরীর বক্ষে এক জোড়া পর্বত চূড়ার আগাম আবছা আভা। কিংবা নাইকুন্ডুলীর নিচের অমসৃণ উপত্যকায় মাতৃত্বের ফাটলে মাসিক শিশুর লাল রঙের চিৎকার। শরীরে ইলেকট্রিক শকের মতো সুখ যন্ত্রণা যা মাথা থেকে পা অবধি কালো পশমাবৃত উপকূল বেয়ে নেমে যায় কত রিক্টার স্কেলে কে জানে! ভেজে নিম্নভূমি। ভেজে পুরুষ। ভেজে নারী। সব ভালো। সব ভালো লাগে। তখন সবকিছুই ভালো লাগে যখন স্বপ্নসুখে আমূল উত্তাল হয় পুরুষ, হয় নারী। এই মধুক্ষণে মনে হবে পৃথিবীর সব অন্যায় ক্ষমার যোগ্য। মানুষই দেবতা। সব মানুষ, দেবতা। মনে হবে পৃথিবীর সব সুখ শুধু শরীরভিত্তিক।
