রুমা কাদলো মায়ের আশ্রয় চেয়ে। কিন্তু মা কিছুতেই রাজি নয়! রুমা চেয়েছিল বিবাহ বিচ্ছেদ। আমাদের সমাজ যেখানে মা-মাসিরা পুরানো মনের মানুষ। মা রুমাকে বাধা দিয়ে বললো, ভালো না বাসলে কি দুটো সন্তান হয়! যদি তুই ডিভোর্স করিস তবে তোর দুটো মেয়েরই বিয়ে হবে না। হবেই না। মা বলেন, রুমা ভয়ে পিছিয়ে যায়। তাই তো!
নববিবাহের শরীর মিটে গেলে, দু’জনের মানসিক দূরত্ব দাম্পত্যে ফাটল জোগায়। আর রুমা সেই ফাটলে আটকে যায়। আর এমনি করে একযুগ সময় নিষ্ঠুরতায় কেটে যায় পাশাপাশি শুয়ে যখন দুটো মানুষ যারা স্বামী-স্ত্রী যারা সমস্ত রাত নীরব থাকে। আর সেই বিছানায় তোশকের আশপাশ থেকে পুরোনো দীর্ঘ-দীর্ঘশ্বাস উঠে আসে এক অতন্দ্র নারীর বুকের তলা থেকে কি গভীর বেদনায়! আর গভীর বেদনা থেকে সৃষ্টি হতাশায় একদিন সে আলিঙ্গন করে নেয় যাকে সমাজের তথাকথিত সতী-সাধ্বীরা, নিজেরাও যারা গোপনে মেলে শরীর, পরকীয়া।
অবৈধ প্রণয়। রুমা সুস্থ হতে থাকে হেলালকে ঘিরে। নতুন স্বপ্ন নতুন আগামীর কুঁড়ি বাঁধে ওর মনে। শিশুসমেত হাসি উঠে আসে তার ঠোঁটে। জাগে, বেঁচে থাকার নতুন তীব্রতা। দাম্পত্যে, স্নেহ প্রেম ভালোবাসাবিহীন রুমা নতুন অভিজ্ঞতায় উজ্জীবিত হতে থাকে যেখানে সে স্পষ্ট দেখতে পায় শরীফ আর ওর কেউ না। শূন্য সাদা খাতা। এক ঘর এক বিছানা দুটো সন্তান সত্ত্বেও ওরা মাঠ মাঠ দূর। এদিকে ছিছিক্কার পড়ে যায় পাড়ায়। পাড়া ছাড়িয়ে শহরে। মানুষ হাতের কাজ ফেলে উৎসুক হয়ে যায়। এক মুখ থেকে অন্যমুখ। এক ঘর ছেড়ে অন্য ঘর। কাজ ফেলে যেচে জানিয়ে যায় হায় খোদা! একি! দু’সন্তানের মা! একি? কি করে পারলো! কি নির্লজ্জ! হায় খোদা কি বেহায়া কেমন বেহায়া! ঘরে অমন সুন্দর স্বামী রেখে অন্য পুরুষে যার চোখ, সে নির্ঘাত নরকে যাবে। দোযখে যাবে। যা-বেই। মুখে মুখে রটে যায় রুমার নষ্টামো যা, ছেনাল।
রুমা পারলো না এই সমাজের সঙ্গে যুদ্ধ করে। শরীফ ওকে গরু পেটা করে। প্রতিবেশীরা জানালা খোলে, সামান্য দেখে পাপ হবে তাই বন্ধ করে, আবার খোলে। মা এসে তিরস্কারশেষে নির্লজ্জ মেয়ের ঘরের মাটিতে নিতান্ত লজ্জায় আর দাঁড়াতে না পেরে মুখে কাপড় ঢেকে চলে যায়। মেয়ে দুটো মুখে কাপড় খুঁজে ছেনাল মায়ের দিকে পিঠ ফিরিয়ে চোখে চোখে কাঁদে।
গরু পেটা রুমা, ছুটে গেল মায়ের কাছে। একমাত্র মা-ই তাকে আশ্রয় দিতে পারে এই দুঃসময়ে। কিন্তু মা সব জেনেশুনে নির্লজ্জ মেয়েকে পাঠিয়ে দেয় স্বামীর হাত-পা ধরে সব পাপের ক্ষমা চেয়ে নিতে। রুমা সেসব কিছুই করে না। সে সহজ পথ বেছে নিতে ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়ে মরে যায়।
জীবনপ্রবাহে এ ধরনের বিচ্যুতি সত্য। সত্য যা সত্য। এবং সত্য যে দাম্পত্য। নিতান্তই মনের ব্যাপার, যা কখনো সামাজিক নয়, তবে নিশ্চিত মানবিক। যা মানুষের মনের আবহাওয়াসাপেক্ষে।
আমাদের বিচ্ছেদের সেই রাতে। আমি সেদিন একটু তাড়াতাড়ি ঘুমিয়েছিলাম। হঠাৎ কার হাত অনুভব করলাম আমার মাথায়। ভারি কোমল। স্পর্শটা অচেনা ছিল না। তবে তার গভীরতা ছিল বিশাল। আমি মুখ তুলে আর্ত তাকালাম তার দিকে। অশ্রুসিক্ত দুটি চোখ দিয়ে সে আমায় স্নেহ দিল। প্রগাঢ় মায়া দিয়ে বললো, দোলা তুমি আমায় অনেক শিখিয়েছে। আজ আর আমার মধ্যে ক্রোধ-ক্ষোভ নেই। তোমার এই পরিবর্তন আমি গ্রহণ করে, তোমায় মুক্ত করে দিয়ে এলাম আজ। আর নয় এই অস্থিরতা। নয় লুকোচুরি। আমরা শত্রু নয়, বন্ধু। আমরা ভুলে যাবো না। সেই দিন। আমরা অনেকক্ষণ কেঁদেছিলাম। যেদিন আমার জীবনটা সহজ করে দিয়েছিল। মনে হলো সেলিমের মতো সবাই যদি বুঝতো! কেন বোঝে না? বুঝলে দাম্পত্যে এত ক্রটি। থাকতো না। রুমা, কলি, অর্চনা, নদী ওরা জীবন রেখে মৃত্যু নিতো না। আজ আমি সুখী পৃথিবীর সব সেলিমদের জন্যে। আর দুঃখী, সব রুমাদের জন্যে।
বিবাহ বড় কঠিন। দুটো মানুষ সম্পূর্ণ দু’রকমের ব্যক্তিত্ব সত্ত্বেও সব বিষয়ে তাদেরকে এক হয়ে দেখতে হয়। দাম্পত্যের কাছে এটা বড় বেশি প্রত্যাশা, যা নিষ্ঠুর। দুরূহ এবং অবাস্তব। দাম্পত্য একটি মঞ্চ, বিবাহ একটি বিষয়। দুটো মানুষ, প্রধান চরিত্রের দুই অভিনেতা, অভিনেত্রী প্রচণ্ড প্রতিকূলতা ছাপিয়ে লুকিয়ে স্নায়ুযুদ্ধ করে যায় সুখের। না পেরে, ভাঙে অঙ্কের পর অঙ্ক, শুধুই ফুরিয়ে যাওয়ার তাগিদে নাটক ফুরোয়।
প্রতিটি হাততালির শেষে –নীরবতা।
প্রতিটি মিলন দৃশ্য–বিষাদের সূচনা।
প্রতিটি সুখ–অসুখের প্রসূতি রচনা হয়।
একদিন –কোনও একদিন এই নাটকের একটি কথাও কেউ আর মনে রাখবে না। কিন্তু নাটকের পর নাটক রচনা হয়। হতেই হয়। এটাই নিয়ম। এবং এজন্যেই আমরা তথাকথিত সামাজিক জীব।
১৭. মধ্য জীবনের সঙ্কট, ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে
১. নিজের সমস্যা অন্যকে বলতে না পারলে কি প্রাণ জুড়োয়! আমরা ফুলের কোমল পাপড়ি। চাই গন্ধ বিলাতে। নিজেদের সমস্যা সবসময় নিজের থাকে না। সঁইসাঁই সীমানা অতিক্রম করে ওরা পৌঁছায় অন্যের সীমানায়। নাগরিক বিশ্বাস ও সংস্কার, সমস্যা ছাড়িয়ে যায় সবরকম সামাজিক বাধ্যবাধকতা। রুচি। আমরা সামাজিক প্রাণী। মানুষকে ঘিরে সৃষ্ট হয় সমাজ আর সভ্যতা। আর মানুষের জন্যে, মানুষকে দিয়ে এবং তার শত্রুও মানুষ। মানুষ একে অপরকে মানিয়ে নিতে পারে না। আবার ছাড়া, চলতেও পারে না। সুখে দুঃখে মন্দে ভালোয় দুধে ভাতে আমাদের একে অন্যের প্রয়োজন হয়। দুটো কথা বলার জন্যে কাউকে চাই। শ্বাসের গন্ধ পেতে-চাই। জানাতে বেঁচে আছি, আমি একা নই। নিঃসঙ্গও নই। আমাদের মানুষ চাই। সে অর্থে নিঃসঙ্গ সন্ন্যাসী, বা নির্ঘাত ব্রহ্মচারী–ওরা মৃত। ওরা নিশ্চিত জীবন্ত। ওরা শ্মশানাচারে অভ্যস্ত। আর আমরা গৃহী। কথায় বলে জীবনটাই ক্রাইসিস। বয়স যত এগিয়ে যায়, সমস্যা তত বড় হয়। আর সবরকমের সমস্যা মানুষকে চারিদিক থেকে ঘিরে ধরতে থাকে। তার কারণ আমরা সামাজিক প্রাণী। সমাজে বাঁচতে হলে সমাজের নিয়ম পালন করতে হয়। এবং এই নিয়মের মধ্যে লুকিয়ে থাকে বাধা-ধরা প্রচুর সমস্যা। ক’জন মানুষ আর সন্ন্যাসীর ধর্মাচারের সৌভাগ্যে মহিমান্বিত হতে পারে যেখানে গৃহ নেই! আমাদের পরিচয় ঘটে তথাকথিত সংসারের সঙ্গে। জন্ম-মৃত্যুর মতো সত্যের সঙ্গে। এখানে ছে দাম্পত্য সন্তান সমাজ কতকিছু! এক সময় সঘন আনন্দ। কখনো দুঃখের সাইক্লোন। তবে সুখের চেয়ে দুঃখই অধিক অনুভূত হয় তার কারণ সংসার করতে করতে যেতে হয় বহু বিরহ বিচ্ছেদ রোগ শোক মৃত্যু দারিদ্র্য অপূর্ণতার মধ্য দিয়ে। সুতরাং সুখ যদিও আসে বা, সে এলেও তা তাৎক্ষণিক। এবং তা যৎসামান্য সময়ের জন্যে। সুখ যেন পাখির মতো ডালে বসতে না বসতে উসখুস্। আপন ডানা মেলে ফুরুৎ। উড়াল আর দুঃখ যেন বিষময় ভারি পাথর অনড়, অটল। বিবাহের কথাই ধরা যাক। এই ঐশ্বর্য মানবজীবনের একটি দারুণ যাচিত সুখের সময়। অথচ বিবাহের উল্লাসটা কত ক্ষীণ! কি ভীষণ সামাজিক! দু’দশ দিনের উৎসব। বছর না যেতেই দায়িত্ব কর্তব্য সংসারের চাপ এসে ঘাড়ে চাপে যখন, শুরু হয় মা মাসিদের পুরোনো অভিযোগ, কলহ। দাম্পত্যে, বাস্তবের অত্যাচারে সুখ গিয়ে ওঠে মাচায় মগডালে। তবে বিবাহ না করে শুধু প্রেমের মধ্যে যদি সম্পর্কটা সীমাবদ্ধ থাকে, তবে সমস্যা নেই। সমস্যা নেই কারণ শুধু প্রেমের সম্পর্ক হলে তাতে দায়িত্ব নেই। এত লুকোছাপি এত সতর্কতা আর ভয়! আর এতসব সঙ্কট বুকে পুষে, বাহ্যিক উল্লাস এবং স্বেচ্ছায় এই দুঃখ ধারণ।
