আমার গোপন জীবনের ঘটনার শুরুতে। সেবার একটা কনফারেন্সে যেতে হয়। সেলিমকে যেতে বললাম। কিন্তু সে যাবে না। মিহির আমাদের বন্ধু। সেও যাচ্ছে। আমি মিহিরের সঙ্গেই গেলাম। কনফারেন্সটা হচ্ছিল আপস্টেইট নিউইয়র্কে। জায়গাটা সবুজে ঘেরা জল-কাদায় প্রকৃতির অকৃপণ শোভা। আমার সমস্যা আমি একা একা থাকতে পারি না। আমার মধ্যে একটা দারুণ অনিশ্চয়তা কাজ করে। একা ঘরে আমার ঘুম হয় না। তাই দু’জন মিলে এক হোটেলে এক ঘরে উঠলাম। বন্ধু মানুষ। যথারীতি মধ্যরাতে দু’জন দু’বিছানায়। স্তব্ধ রাত। বাইরে অন্ধকার। ঘরে রোমাঞ্চময় নীরবতা। শুধু শোনা যায় দুই নারী ও পুরুষের শ্বাসের গন্ধ। দুই অতৃপ্ত। এবং আমি কি কৌতূহলে যেন পাশাপাশি বিছানায় শুয়ে মিহিরের দিকে তাকিয়ে রইলাম দীর্ঘ-দীর্ঘ রাত। কি সুন্দর সে! কি আকর্ষণ! দেখতে দেখতে নামলো আবছা ভোর। হঠাৎ কি যেন হলো! এই প্রথম আমার অনুভব হলো, পরপুরুষ! হ্যাঁ, আমার মিহিরকে চাই। অতৃপ্ত শরীর কাঁদলো। হু-হুঁ করে কাঁদতে শুরু করলো। রোমাঞ্চ। আমাকে অবাক করে দিয়ে ওপাশ থেকে মিহিরও নেমে এলো আমার দিকে। এক অলৌকিক আহ্বান। অসম্ভব টান। ওর চেহারায়, রিক্ততা। ওর শরীরও কাঁপছিল। আমি নিরুপায়, তবে উচ্ছ্বসিত। কাঁধে, ঠোঁটে দু’হাত নামিয়ে দিলাম, রাতের মতো, নীরবে। আমি, মুহূর্তেই শুষে নিলাম কল্পনা।
সেই রাতে। সেই গভীর রাতে। কেউ জানলো না শুধু দুটো তৃষ্ণার্ত–আর্ত মানুষ ছাড়া। যাদের মানসিক সমতা ছিল। যাদের চোখে বিনিময় ছিল। প্রতিটা মুহূর্ত যেখানে প্রেমের আবিরে আবিরে লাল হয়ে যেতে থাকে অশান্ত দুটি শরীরে, কেউ জানলো না কি সুখ রচিত হয়েছিল সেই শয্যায়। এবং সেই প্রথম আমি সম্পূর্ণ মুক্ত হলাম নিজের অনুভূতির দায় থেকে অন্য কারো হাতের তলায়, আবিরে বসন্তে, যেখানে ফুল ফুটলো তার সবগুলো পাপড়ি মেলে বসন্ত শরীরের সম্ভার। মিহির আমাকে প্রথম বুঝিয়েছিল নারী। ওর শয্যাতেই প্রথম নিজেকে এমন করে উন্মোচিত হতে দেখলাম। সেও। নব আবিষ্কারে আমি অভিভূত।
কনফারেন্স থেকে ফিরে আমরা আরও গম্ভীর হতে থাকি। মনের বিশাল এক সমতা আমাদের তীব্র টানে। টেনে আরও নিয়ে আসে কাছে। না হলে, না দেখলে, পাগল পাগল লাগে। পাশাপাশি সেলিমকে এত দেখি তবুও দেখি না। মিহিরের স্ত্রী মালা কাজে গেলে আমি লুকিয়ে চলে যাই ওর বাড়িতে। সেখানে ওর সঙ্গে ধুম আড্ডা হয়। হাতে হাত রেখে ভাব বিনিময় হয়। একটু ছুঁয়ে থাকা কোথাও কখনও। এই করে করে ও আমাকে শেখায়–শরীরবিহীন প্রেম। যৌনতা ছাড়া দাম্পত্য। আমি ও মিহির যে দাম্পত্যে পুরোনো হয়েছি, ক্ষয়েও গেছি। এবং সেজন্যেই কোনও অপরাধ বোধ হয়নি আমাদের।
তার একবছর পর। একদিন হঠাৎই মিহির এলো অসময়ে। এমন চেহারা নিয়ে আমার অফিসে এলো যেন ওর কেউ মারা গেছে। একেবারে ঝুলে পড়া, চোখ গাল ঠোঁট। বললো, বিদেশে ওর পোস্টিং হয়েছে। যেতেই হবে। উপায় নেই। আমি একেবারে নিরুপায়। কি বলবো! যেও না? তাতো সম্ভব নয়! এবং সে যথারীতি চলে গেল।
এরপর। আবার শুরু হলো শূন্যতার সঙ্গে স্নায়ুযুদ্ধ তার কল্পনার স্বর্গসন্ধান। কষ্ট পেরুবার স্বর্গপথের কল্পনা। মিহিরের সঙ্গে মানসিক বন্ধন আমার এমন গম্ভীর হয়েছিল যে ওর চলে যাওয়ায় রিক্ত আমার বিভ্রান্তি আরও বাড়লো। কি করি নিজেকে নিয়ে, কিছু ভালো লাগে না। শূন্যতা সৃষ্টি করে গভীর কুয়ো। সেলিম ততদিনে একটি জীবন্ত মূর্তি। ওকে দেখলে মায়া হয় তবে কোনও রকম ইচ্ছে জাগে না। আমি ওকে এড়াতে অভ্যস্ত হই। তবুও না পেরে ওর শরীর নিই। আমি অনিচ্ছায় দাঁতে দাঁত আটকে রাখি।
পা একবার ঘরের বাইরে গেছে। শরীর একবার প্রেম জেনেছে। এবং মিহিরের পর এই সুবিধে-অসুবিধেগুলো নিয়ে সেলিমের সংসারে এরপরের কাহিনী দ্রুত এবং সংক্ষেপ। এরপর এলো শান্তনু। তার…। সব কারণ ফুরিয়ে গেলে, একমাত্র যাওয়া ব্যতীত, গন্তব্য নেই। আমি তা সমূহ অস্তিত্ব দিয়ে বুঝলাম। সমমনা না হলে অতৃপ্ততা কখনো যাওয়ার নয়। এবং এই অতৃপ্ততা মোটেও শারীরিক নয়। এবং এসব সমূহ কারণেই হয় দাম্পত্য ভাঙে, নয়, মানুষ অসুস্থ হয়। কেউ বিকার, কেউ কেউ পরকীয়া আবার কেউ মানসিক ভারসাম্যহীন। আর আমি যাচ্ছিলাম মানসিক ভারসাম্যতার দিকে।
যে কারণে আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু রুমা ভোররাতে ছাদ থেকে লাফিয়ে আত্মহত্যা করেছিল। যে কারণটা কেউ খুঁজে দেখেনি। সবাই জানলো রুমা হেলালের শয্যায় গিয়েছিল। হেলালের সঙ্গে তার পরকীয়া ছিল। সে দুই সন্তানের জননী। কি করে করলো! কি করে করলো অমন কাজ! মাসি একেবারে ছেনাল অমন স্বামী থাকতেও, মাসি ছেনাল। অমন কলঙ্কের চল্লিশায় যাওয়া যাবে না। গেলে গুনাহ্ হবে। না-না-না। মারা যাওয়ার একবছর পরেও কেউ বুঝতে চাইলো না অমন সোনার স্বামী ফেলে মাসিটা কেন হেলালের কাছে গেল!
রুমার জীবনের প্রকৃত ঘটনা, জানতো একমাত্র ওর মা। মাকে রুমা সব বলেছিল। বলেছিল শরীফের নিষ্ঠুরতার কথা। বিয়ের তিন বছর পর থেকে একযুগ সময়, এই এক যুগ সময়, শরীফ ওকে আর ভালোবাসলো না। এক বিছানায় ওরা যেন অতিথি। এবং মাঝে মাঝে শরীফ যখন শুধু ওর শরীরটা নিয়ে নাড়াচাড়া করতে মধ্যরাতে এগিয়ে আসতো, রুমা ভুল বুঝতো। আকাঙ্ক্ষার স্বপ্নময় জগতে যা হয়। ভাবতো এই বুঝি ঠিক হয়ে যাবে। যাচ্ছে যাবে। ঠিক হয়ে যাবে। রুমাকে সে উতলা করে ফালাফালা করে নিংড়ে নিতো শরীর। এবং পরমুহূর্তেই সে ফের অচেনা এবং এই বিড়ম্বনা চলে বছর তিনেক।
