দোলার কথা
আজ আমার স্বামী বুঝতে পেরে বিশাল এক সঙ্কীর্ণতা থেকে নিজেকে মুক্ত করলেন, যা মানবদর্শনের নিয়ত সত্য। আমি দোলা যে কথাটি আমার স্বামী সেলিমকে এতদিন ধরে বোঝাতে চেয়েছিলাম আজ তিনি স্বেচ্ছায় তা বুঝে নিলেন। বিবাহ বিচ্ছেদের কাগজে আমার অজান্তেই সই করে এসে আজ প্রথম তিনি আমার সঙ্গে যে দূরত্ব অনুভব করেছেন, যে দূরত্ব থেকে তিনি আজ প্রথম আমায় স্পষ্ট করে দেখছেন–সেই দূরত্ব, জীবন সম্পর্কে তার পৌরাণিক দৃষ্টি আর বদ্ধমূল ধারণাগুলোকে পাল্টে দিয়েছে। এখন থেকে তিনি একজন মুক্ত মনমানসিকতার মানুষ। বোধের অন্ধত্ব ছেড়ে মুক্ত স্নায়ুর মানুষ। মুক্ত জীবনদর্শনের প্রকৃত রূপ দেখতে পারার অপারগতা থেকে মুক্ত মানুষ। দূরত্ব, যা তাকে দিয়েছে দেখার ক্ষমতা দূর থেকে। আজ আমার জয় হলো। আজ আমারও জীবনদর্শনের জয় হলো যে আমরা বনের পশুপাখির চেয়েও মূর্খ। কারণ আমাদের দাম্পত্য জীবনে রয়েছে ১৪৪ ধারা।
আজ আমার স্বামী স্বীকার করলেন, ১৪৪ ধারা ভুল। দোলাকে ধরে রাখার চেষ্টা করে করে শুধু কষ্ট পাওয়া। শুধুই কষ্ট পাওয়া। তিনি বুঝলেন, বিবাহ কখনো আমৃত্যু আজীবন হয় না। হতে পারে না। প্রেম ভালোবাসা অনুভূতি বিবাহের মাধ্যমে তাকে আমৃত্যু আবদ্ধ করা যাবে না। করা যায় না। সম্ভবও নয় তার প্রমাণ, বিবাহ ভাঙে। কলমে না ভাঙলেও এক বিছানায় পাশাপাশি শুয়ে শুয়েও বিচ্ছেদ হয়। নীরবতার অন্ধকার। দূর দূর তফাত। পাশাপাশি শুয়েও মাঠ মাঠ দূরত্ব।
এই যে একটার পর একটা শয্যা পাল্টাচ্ছি, পুরুষ পাল্টাচ্ছি, এটা যেমন আমার একটা ফ্যান্টাসিতে রূপান্তর হয়েছে, তার চেয়েও এটা ছিল আমাকে ধরে রাখার ব্যাপারে তার অক্ষমতা। যা সৃষ্টি হয় দোহের মধ্যে ভিন্ন ব্যক্তিত্বের দুই মানুষের মধ্যে বিবিধ অসমতার কারণে। এবং যাকে উন্মোচন করতে পারে শুধু সময়। অক্ষমতা। যা নিশীথের আঁধারে রচিত হয় ঘরে ঘরে নারী আর পুরুষের মিলনে, যখন তারা দু’জন স্নায়ুযুদ্ধ করে করে ক্লান্ত হয়। এবং সত্যকে লুকিয়ে যাচ্ছে বেমালুম আর নিয়ত দোষ দিয়ে যায় তাদের ভাগ্য, বয়স আর পরিস্থিতিকে। তারা অনুভব করছে তবে স্বীকার করছে না। তারা অতৃপ্ততায় মারা যাচ্ছে তবু মুখ ফুটে বলছে না। তবে ক্ষয়ে ক্ষয়ে যখন তারা সত্যিই বুঝলো তাদের মধ্যে নেই ভালোবাসা, নেই প্রেম, ইটস টু লেইট। আজ সেকথাই সেলিম ধুকে ধুকে অবশেষে বুঝতে পেরেছে যে নিশীথের অন্ধকারে এই যে আমাদের অতৃপ্ততার অভিনয় আসলেই তা বানানো, সাজানো। আমাদের ছিল গভীর সমস্যা দূরের ও কাছের। আর অবশেষে সে আমার অসুবিধের চিহ্ন চিনেছে। সেজন্য বিচ্ছেদের পরেও আজ সে ধীর। ধীর স্থির শান্ত। এবং আমি এজন্যেও সুখী যে এখন তার ভাবনাকে আন্দোলিত করবে অন্য নারীর অস্তিত্ব। যে হবে তার সমমনা। এই ভাবনা ভালো। নতুন অলঙ্করণ। নতুন উজ্জীবন। এবং আমি তাতে সুখী। ঈর্ষা নয়, শাসন নয়, শাস্তি নয়, দাম্পত্যে গোপন ও করুণ তবে নিষ্ঠুর সত্য গ্রহণ করার মধ্যে যে শান্তি আছে সেই ত্যাগ সেটাই খুঁজে নেয়া আমাদের কাম্য। বিবাহ মানেই কি আমৃত্যু? সম্ভব কী? প্রতিটি নারী-পুরুষ বিবাহ বন্ধন সত্ত্বেও যে যে যার যার মতো আলাদা। এবং চলার পথে এমন কিছু পরিবর্তন তার মধ্যে ঘটতে পারে যখন একটি সম্পূর্ণ আলাদা মানুষ যে বিবাহ সূত্রে এক যুগ ধরে এক, হঠাৎ সে নিজেকে খুঁজে পায় আবার আলাদা করে। যখন বিবাহ বন্ধন তাকে আর বাঁধে না। তার রোচে না। কুলোয় না। নাগরিক রুচি ও অভ্যেস। যখন দাম্পত্য তাকে আর টানে না। যখন তার মধ্যে হঠাৎ পরিবর্তন সবকিছু ধুলো নস্যাৎ করে দেয়। চিড়ে চ্যাপটা। যখন দাম্পত্য হয় ঝড়ের সম্মুখীন। যখন বিবাহ ভাঙে। যখন মানুষ না পেরে আত্মহত্যা করে এবং নিরুপায় সে পাল্টায়। শয্যার পর শয্যা। দাম্পত্যে এমন ঝড় স্বাভাবিক। ফুসলে ওঠা না ওঠা নির্ভর করে ব্যক্তির ওপর।
আমি আর সেলিম সত্যেরই জ্বলন্ত প্রমাণ। আমাদের জীবনের শুরুতে ওর মধ্যে খুঁজে পেয়েছিলাম দারুণ কৌতূহল। তারুণ্য। সব-সবই যখন ভালো। সুন্দর সেক্সি। কোথাও কোনও একটু অপূর্ণতা আমাদের ছিল না। সময় যেতে থাকে। হঠাৎই এক দমকা হাওয়ায় একদিন প্রথম যৌবনের নিমগ্নতা ধরা পড়লো, দুর্বলতায়।
এত বছর ধরে আমি অভিনয় করে চলেছি, বিছানায়। সেলিমের হাতের বলে নিজেকে ঠিক ফুটিয়ে তোলা বা অলঙ্করণের অভিনয়। আমি যে নিজের সঙ্গে অভিনয় করে যাচ্ছিলাম, জানতাম। তবে জেনেশুনে এই ভালোমানুষটিকে আমি কষ্ট দিতে চাইনি। তাই কল্পনার আশ্রয় নিয়ে কষ্ট পার হতাম। কল্পনার সুখে ভাসলাম বহু বছর সমমনা পুরুষের সঙ্গে যেখানে আমার শয্যা রচিত হয়, মনে, শরীরে। গীতিময় রেণু রেণু সুখে, সুখ সঞ্চারিত হয় স্বর্গে। কিন্তু বাস্তব তো, বাস্তব। কল্পনার সুখ শেষে দুস্থতা আবার গ্রাস করে আমার শূন্য পৃথিবী। আমি কাঁদি। নিতান্ত প্রয়োজনে সেলিমের সঙ্গে ফের শরীর হয়। এবং আমি ওর থেকে অপেক্ষা করতে থাকি আরও অন্য কিছুর। এই করে করে মনের বিনিময়বিহীন অতৃপ্ত শরীর এক সময় ক্লান্ত হয়ে যায়। সেলিমের অতৃপ্তি আসে না কারণ সে বিনিময় জানে না। কারণ সে, সে-গভীরের মানুষ নয়। ক্রমশ আমার ক্লান্তি বাড়ে। আর আমি অধিক আশ্রয় নেই কল্পনায়। ধীরে ধীরে সেলিমের সঙ্গে আমার সম্পর্কটা হয়ে ওঠে মেকি। স্রেফ উগরে ফেলা। আর বন্ধনটি আলগা হতে থাকে। তবুও সেলিম আমাকে দেখে বুঝতে পারে না। আমি নিরন্তর অভিনয় করে চলি। অতৃপ্ত থেকেও তৃপ্ততার অভিনয়। এবং যা পেরে তাই শুরু হলো বিকল্প এবং অন্যান্য সম্ভাবনা…।
