দোলা, থেকেও সে নেই। এই যে সে আছে শুয়ে-বসে একই ঘরে, এক ছাদের তলে, কিন্তু নেই। থেকেও নেই। সে মিশে আছে অন্যে। তার অনুভূতি জুড়ে অন্য পুরুষে। সেলিমের কষ্ট হয়। সেদিন নিজ চোখে সে যা দেখেছে তারপর দোলার ছায়াও ওকে যন্ত্রণায় দগ্ধ করে। আত্মপীড়নে, পেষে। তাপিত বুক, আরও জ্বলে ওঠে। মরতে ইচ্ছে করে। ওদের প্রেমের বিয়ে। মধ্য বয়সের অতৃপ্ত শরীর তারুণ্যের সুখের সময়গুলোকে নিষ্ঠুরভাবে ছাড়িয়ে যায়।
বিয়ের পর থেকে দোলাকে সেলিম ভালোবেসে কাটিয়ে দিয়েছে বারোটি শীত বসন্ত। সেলিম দোলা ছাড়া কাউকে জানতে চায় না। দোলা জানে অন্যকে। এবং সেই জানা না জানার সঙ্গে বাঁচার কারণ দোলার বাড়লেও, সেলিমের দিন দিন কমতে থাকে।
আজকাল দোলাকে সেলিম এড়িয়ে যায়। কেন যাবে না? এই দোলা যে অন্য দোলা! প্রেমহীন। ভালোবাসাহীন। তার সব প্রেম অন্য পুরুষে। তার হৃদয়ে লেগেছে নববসন্তের ছোঁয়া। অনভ্যস্ত শরীরের স্বাদ। নতুন শয্যা।
কিন্তু সেলিম এত অবিশ্বাস আর ঘৃণার পরেও আজও দোলা ছাড়া কাউকে ভালোবাসতে পারছে না। এবং সমস্যা এখানেই। যদি সেও ভালোবাসতে পারতো, তবে সেও জুড়োতে পারতো। এবং জুড়োতে পারলে ভুলেও যেত। দোলা ছাড়া পৃথিবীতে, তার নিঃস্ব হয়ে যায় সবকিছু। স্বর্গসমেত সম্পূর্ণ অতীত বৈভব। দাম্পত্য অবিশ্বাস প্রতিষ্ঠা পেলে, তা শত্রুতায় রূপান্তর হয়। তখন তার বাতাসটুকুকে বিষ। দোলার বাতাসও সেলিমের কাছে বিষ লাগছে। কারণ সে বাতাসটুকুতে মিহিরের ঘ্রাণ থাকে। তার স্পর্শ থাকে। না চাইলেও সে ঘ্রাণ পায়। মিহিরের ছোঁয়া পায়। দোলা যেখানে দাঁড়ায়, বসে, শোয়, সেলিম মিহিরের স্পর্শ পায়। কতবার সে চেষ্টা করে এই গন্ধ থেকে মুক্তি পেতে, কিন্তু দোলা আর সেলিমের সম্পর্ক দাম্পত্যের বারো বছর শেষে, ঘুণপোকা। এবং দু’জন পরস্পর পরস্পরের থেকে যতদিন যায় দূরে সরে যেতে থাকছে। এই দূর ক্রমশ দীর্ঘতর হয়। এরপর একদিন স্বচক্ষে সেই ঘটনা। যার পর সেলিম প্রস্তুত হয়, বিবাহ বিচ্ছেদের।
কারণটা খুব অস্বাভাবিক নয়। সঙ্গতও নয়। তবে মানবজীবনের কোনও এক সময়ে হঠাৎ ফের অনুভূতির বদল হলে, হতেই পারে। তার মানে এই নয় যে, দোলা ভুল করেছে। তারপরেও সম্পর্কটা ধুকে ধুকে হলেও টিকে ছিল।
সেলিমের যে হঠাৎ মরে যেতে ইচ্ছে হয়েছিল তার কারণটা একটু বিশেষ। সেদিন রাতে সেলিম, দোলাকে দেখেছিল, মিহির নয়, শান্তনুর বিছানায়। মিহিরের পর শান্তনু! অবিশ্বাস্য! শান্তনু ওদের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। মিহির, তারপর শান্তনু! দোলা কি সেফ পাগল হয়ে গেছে! বিকারগ্রস্ত! কিন্তু দেখে তো মনে হয় না। দোলা ঠিক আগের মতোই চঞ্চল ও ধীর একইসঙ্গে। কোমল ও কঠিন এক পলকে। বার্ধক্য আর কৈশোর এক মুহূর্তে। একি! সেলিম ভেবে কুলিয়ে উঠতে পারছে না।
ঠিক তার দু’মাস পর। সেলিম, ডিভোর্সের কাজ সম্পন্নশেষে বাড়ি ফিরে এলো। দোলা কিছুই জানে না। মধ্যরাত। খোলা জানালা দিয়ে উত্তরে বাতাস ঢুকছে। সেলিম চুপচাপ বসে উদাস চোখ মেলে আকাশে তাকিয়ে আছে। রাতটা বড় বেশি ঘন লাগছে ওর কাছে। অসংলগ্ন লাগছে। ভাবছে…। আকাশে তারা আর মেঘ এক সাথে। উড়ে যাচ্ছে তারা। মেঘ থাকছে। উড়ছে না।
সে ভাবছে। এরপর, দোলাকে সে ধীরে ধীরে ভুলে যাবে। দোলার জন্য বুকে কষ্ট আগলে রাখা ভালোবাসা, সে ভুলে যাবে। শুধু দোলাকে ভালোবেসে বেঁচে থাকা ভুলে যাবে। যেতেই হয়। যেতে হয় কারণ আজ ডিভোর্সের কাগজে সই করে কোথায় যেন এক পুঞ্জীভূত রাগ আর ঘৃণা থেকে সে হঠাৎ মুক্ত হলো। চুলে তার একগুচ্ছ বাতাস লাগে। মুখেও লাগে। তারপর গায়ে। সে ভাবছে, এরপর হয়তো দোলার সাথে হঠাৎ দেখা হলে মনে হবে কৃষ্ণচূড়া। মনে পড়বে সময়। ভোরবেলাকার উথিত শক্ত পুরুষে দোলার দুষ্টুমি। পেটে ‘দ’ হয়ে থাকা। কিংবা দোলার চেঁচামেচি শীকার, সঙ্গমের সময় কি সব আবোল-তাবোল। সে অনর্গল বলে যেতো! ইস। সেলিমের হাসি পায়। মনে পড়ে হাসি হাততালি, দোলার গর্ভাবস্থায়, বাধ্য হয়ে হাত দিয়ে নিজের পুরুষ পেষণ মৈথুন করে নিজেকে মুক্ত করা। ওতে দোলারই প্ররোচনা ছিল। তখন যে দোলার সব সব কথা শুনতো। ইস কি লজ্জা। দোলাকে আজ ওর লজ্জা লাগছে। ভারি লজ্জা লজ্জা। কেন? আগে লাগেনি তো! লজ্জা শুধু তাকেই হয় যে আপন নয়। আজ দোলা তার আপন নয়। বুকের মধ্যে সেই ভালোবাসা কোথাও আর অনুভব হয় না। কোথাও কিছু আর টানে না। সেই টান আর নেই। কোথায় যেন সব সব হারিয়ে গেল। স্মৃতি ছাড়া বাকি সব যা, মুছে গেল জলে ছাপা অক্ষরের মতো মুছে গেল।
আজ মনে হচ্ছে দোলা ওকে শিখিয়েছে। অনেক শিখিয়েছে। বিয়ে দাম্পত্য সংসার মানে একসঙ্গে আজীবন আবদ্ধ থাকা নয়। মনের পরিবর্তন হতেই পারে। তখন ছেড়ে দিতে হয়। কষ্ট না পেয়ে বরং সিদ্ধান্ত নিতে হয়। দুটো ব্যক্তিত্বকে এক করা অসম্ভব। দোলাই ঠিক। সেলিমের নিজের নির্বুদ্ধিতায় তার লজ্জা বোধ হয়। সে তাকায় আগামীর দিকে। উত্তরে হাওয়ায় সে আচ্ছন্ন হয় নতুন সম্ভাবনায়। পৃথিবীতে কোথাও কারও জন্যে কিছু আটকায় না। শরীরে তার নতুন পুলক হচ্ছে, বহুদিন পর তার পুরুষ উত্থিত হয়ে প্যান্টের বোতাম ছিঁড়ে ফুড়ে ওঠে এসে দাপিয়ে সে নীলিমাকে চায়! মনের কোণায় দেখা দেয় কোনও, নীলিমা। কে সেই নীলিমা! কোথায় সে! সেলিম জানালা খুলে বাইরে তাকায়। তারপর দোলার দিকে একবার তাকালো সে। কোথায় সেই অনুভূতি! সব মেকি। সব গুজব। মনে হয় সেলিমের। মনে হয় রবীন্দ্রনাথ বলেছেন পৃথিবীতে কে কার। তাইতো! পৃথিবীতে কে কার?
