অবিশ্বাসী স্বামীর আচরণে মানসিক কষ্ট একটা মেয়েকে মানসিক নরকে পৌঁছে দিতে পারে। রাতের ঘুম হারাম করে দেয়ার জন্যে যা যথেষ্ট। বিশ্বাসের বুকে ছুরি চালিয়ে তার জীবনটাকে রূপান্তর করতে পারে, নরকে।
ঘ. হৃদয়ের ক্রাইসিস নিয়ে খোলামেলা কথা বলা আমার স্বভাবজাত অভ্যেস। বারবার মেয়েরা যে ভুলটা করে, তা হলো, পুরুষকে বিশ্বাস করার যত আত্মঘাতী প্রবণতা। এই প্রবণতা তার স্বভাবজাত। কারণ মেয়েরা নির্ভর করতে চায়। খেলুড়ে পুরুষেরা খেলতে খেলতে হঠাৎ যখন সেই জগৎটাকে ভেঙে নিয়ে চলে যায়, কিংবা বিবাহিত স্বামী যখন দিনের পর দিন গেস্ট হাউজে নিয়মিত খদ্দের হিসেবে স্থায়ী সদস্য হয়, তখন ঘরের বৌয়ের হৃদয়ের ক্রাইসিস কোথায় দাঁড়াতে পারে? সবসময় সন্দেহ, সর্বদা শঙ্কাগ্রস্ত। অন্য নারীর গন্ধ, স্বামীর শরীরে পেয়ে সে শিউরে ওঠে। আস্ত একটি মানসিক নরকে বাস করতে শুরু করে। মানত, তাবিজ, কবজ, দোয়া, ফুঁ, পীর ইত্যাদির আশ্রয় নিয়ে ভাবে, অদূর ভবিষ্যতে হয়তো সব ঠিকঠাক হয়ে যাবে। আশা-ভরসা শেষাবধি তার অপূর্ণই থেকে যায়। এমনই নির্বোধ সে।
স্বপ্ন ভেঙে সারাক্ষণ শূন্যতা। কিছুতেই কিছু ভালো লাগে না। অর্থ, আনন্দ, সুসংবাদ ভালো লাগে না। বুকে নিরন্তর কষ্ট, অন্য সব সুখ নষ্ট করে দেয়। কষ্টগুলো খুঁজে বেড়ায় সেই পাথর, সেই খেলুড়ে, সেই অবিশ্বাসীকেই। হয়তো সে তখন আমেরিকা বা অস্ট্রেলিয়া বা কানাডায় অন্য নারীর বিছানায় মজা করছে। তখন তাকে কে পায়? সব ধরাছোঁয়ার বাইরে সে তখন। হায় নারী! সেসবে তার খেয়ালই নেই! সে তবুও তাকেই দেখে তার অন্ধ চোখে।
হৃদয়ের কান্নাগুলোকে কোনও না কোনওভাবে গুছিয়ে তবুও, জীবন-যাপন করতে হয়। মাতৃহারা শিশু যেমন। যেভাবেই হোক সে বেঁচে থাকে। একদিকে হৃদয়কে শান্ত করা, অন্যদিকে পৃথিবীর মোকাবিলা। সকাল হলেই রাত অবধারিত। ভোর হবে রাতটাকে টেনে নিয়ে যেতে। এই দিন আর রাত টেনে নেয়াই তো নারীর কাজ।
খেলুড়ে পুরুষ বা অবিশ্বাসী স্বামীর নিষ্ঠুরতাগুলো যৌবনে যেরকম অনুভব হয়, মাঝ বয়সে তার অনুভূতি অন্যরকম। অনুভূতি, অনুভবের। অনুভব, তার কৈশোরের যৌবনের লাভক্ষতি, দুঃখ-কষ্ট। অনুভব তার সুখ। অতীতের ভালোমন্দ, মধ্য বয়সে সে অন্য চোখে দেখতে পায়। দেখতে পায় দূর থেকে। দূর-যা অতীত। অতীত, যার সঙ্গে তার বিচ্যুতি ঘটেছে। অতীত, যা নেই তার বর্তমানে, নেই তার ভবিষ্যতে।
মধ্য বয়সে ক্রাইসিসের এই অনুভূতি সত্য। নিষ্ঠুর কখনো কখনো সুন্দরের সাক্ষী। এই ক্রাইসিসও সুন্দর। নিষ্ঠুর কিন্তু সবচেয়ে সুন্দর। সবচেয়ে বাস্তব। যেহেতু সে বাস্তব। বাস্তব সুন্দরকে প্রতিষ্ঠা করে, কুৎসিত থেকে জীবনটাকে আলাদা করে। আমি এই অনুভূতির, একজন ধারক ও সেবক। মধ্য বয়স আমাকে দিয়েছে অনন্ত অভিজ্ঞতা এবং উপলব্ধির অফুরন্ত সম্ভার। নারীকে তার যৌবন আর বার্ধক্যের এই সন্ধিক্ষণে, তার সকল সাফল্য আর ব্যর্থতা উপলব্ধির আমন্ত্রণ জানাই, বার্ধক্যের পথে হাতেগোনা বাকি ক’বছর ভুলভ্রান্তি ছাড়া, সুন্দরভাবে এগিয়ে যেতে। বাঁচতে।
ঙ. দেবদাস ছবি দেখে বই পড়ে অনেক আগেই আমার এই অনুভূতি হয়েছিল যে, শরৎ বাবুর দেবদাস কল্পনার পৃথিবীতে শুধু একবারই জন্ম লয়। যে দেবদাসরা পার্বতীর বিরহে মরে যায়। এই কি আসল সত্য? সত্যিই কি নিরীহ প্রেমিক পুরুষ। এতই নিরীহ এতই প্রেমিক যে নিষ্ঠুর পাষাণ পার্বতীর জন্য সে মদ খেতে খেতে মরে যায়! এই পাষাণ পার্বতী যদি সত্য হয় যে পুরুষকে অমন কষ্ট দেয়, তবে আমি তার মৃত্যু কামনা করি। যে অমন সোনার মতন, নরম হৃদয়ের প্রেমে টইটম্বুর দেবদাকে কষ্ট দিয়েছে। আহা! এই পুরুষের জন্যে আমার কান্না পায়। দেবদা বললো–”পারু! পারবি তুই আজ রাতে আমার সঙ্গে পালিয়ে যেতে?” পার্বতী বললো,”তা হয় না দেবদা!” আহা! কি ভালো এই দেবদাস! কি। মানবিক! কি বঞ্চিত! হায়!
না-না উচ্ছ্বসিত হওয়ার কোনও কারণ নেই। কারণ এই দেবদাস বাস্তবের পুরুষ নয়। এই দেবদাস কখনো বাস্তবে জন্ম নেয় না। নিতে পারে না। কারণ ওরা পুরুষ। এরা শরৎ বাবুর গল্পের গুজব। মিথস বা ইউএফও। নাগরিক বিশ্বাসে এই দেবদাস সত্য নয়। রুচিতেও নয়।
তবে প্রকৃত অর্থে দেবদাস যদি কেউ হয়, সে নারী।
বাস্তবে, আমার দেবদাসী = শরৎ বাবুর দেবদাস।
বাস্তবে, আমার পুরুষ = শরৎ বাবুর পার্বতী।
বাস্তব কঠিন। আমার ইচ্ছে হয় শরৎ জেঠুর দেবদাস যদি কালেভদ্রে কখনও সত্যি হয়! অহো! বড়ো দুরাশা আমার!
১৬. মধ্য জীবনের দোলাচল
সেলিমের কথা
সেদিনের পর থেকে সেলিমের শুধু মরে যেতে ইচ্ছে হয়। পৃথিবীর কোনও কিছুতেই তার আকর্ষণ লাগছে না। রুচিও নেই। কি নিরন্তর লেগে থাকা কষ্ট তার বুকের গভীরে। দুই পাজরের তলে। কষ্টের অতল সাগর। মন নেই অগাধ বিত্তে। কি রিক্ত মনে হয় নিজেকে তার! অথচ কি নেই! তার যা আছে অনেকেরই নেই। তবু মরে যেতে ইচ্ছে লেগে থাকছে সারাক্ষণ। এত বিত্ত মনে হয় রক্তহীন পানসে জামরুল। এই দালান ধূসর বালি! কি নিঃস্ব পৃথিবী তার যেখানে এত আলোর জগতে তার হৃদয় জুড়ে বসে থাকছে বাদুড়ের ডানায় লেগে থাকা কালো কালো অন্ধকার।
বাঁচা কী শুধুই, বেঁচে থাকা? শরীরটাকে ঘুম থেকে ওঠানো, ঘুমোতে যাওয়া! জীবন মানে কি শুধু ঘৃণা আর অবিশ্বাসের অভিজ্ঞতার পুঁজি করা! এই যে আরেকটি দিন গড়িয়ে যায় জীবন থেকে শুষ্ক, প্রেমহীন! দাম্পত্যের চিহ্ন নেই। দু’জনের দু’বিছানা।
