আশ্চর্য যে, এমনকি খেলুড়ে পুরুষদেরকেও মেয়েরা জেনেশুনে বিশ্বাস করতে চায়। ইচ্ছে করে সত্যকে অস্বীকার করবে। নিজেকে ইচ্ছে করে ভুল বুঝতে চায়। নিজেকে ভুল বুঝে ভাবতে চায়, না! না! সে খেলুড়ে নয়। সে সত্য। সে শুধু আমাকেই ভালোবাসে। আমি তাকে ভুল বুঝেছি। এই যে বিভ্রান্তি, নিজেকে অস্বীকারের এই যে বিড়ম্বনা এরই নাম সর্বনাশ। রবীন্দ্রনাথ একে বলেছেন দ্বিতীয় ভ্রান্তিপাশ। কথাটি মেয়েটির বেলায় ধ্রুব সত্য। তখন মন হয় এলোমেলো, দিশেগুলো হয় দিশেহারা, উদ্দেশ্য হয় উদ্দেশ্যহীন। পুরুষকে বিশ্বাস-অবিশ্বাস করতে করতেই সুরঞ্জনারা শেষ হয়ে যায়। চোখে দেখছে, কানে শুনছে কাজে কর্মে বুঝছে, সে প্রতারক। তা সত্ত্বেও হৃদয়ের ব্যাপারে সে অবুঝ। সে শিশু। এতদ্সত্ত্বেও সে তাকেই ভালোবাসে।
প্রকৃত ভালোবাসা আর ভালোবাসার খেলা, দুটো দুই জিনিস। বিভ্রান্তিতে ভুগতে ভুগতে মেয়েরা এই দুটোকে এক সময় আর আলাদা করে চিনতে পারে না। তবে সন্দেহ তাদের যে নেই তাও ঠিক নয়। কোথায় যেন একটা কিছু গোলমেলে ব্যাপার মনে হতে থাকে। মনটা মাঝে মাঝেই উদাসীন থাকবে। বুকে, হাহাহার। খারাপ লাগবে, কান্না পাবে, সর্বক্ষণ একটা সন্দেহ। একটা বিচ্যুতি, কি যেন! কোথায় যেন! এই যে সন্দেহ, এখানেই সমস্যা। এটাই প্রথম চিহ্ন, তার কাছ থেকে দূরে সরে যাওয়ার। কিন্তু দ্বিতীয় ভ্রান্তিপাশে পড়ে মেয়েরা এ কাজটা সহজে পারে না। প্রতারক পুরুষটির প্রতারণাও তার ভালো লাগে। তাকে কিছুই নিরুৎসাহ করে না। ভালোবাসা তাকে তাৎক্ষণিক অন্ধ করে দেয়। বিশেষ করে যখন তা একতরফা। একতরফা ভালোবাসায় দুইয়ের মানসিক সংযোগ না থাকায়, শুধু শরীরের কারণে হলে তা, ধসে পড়তে বাধ্য।
হঠাৎ একদিন সব নিয়ে বা ছেড়ে উধাও হয়ে যায় খেলুড়ে পুরুষ। খেলুড়ে পুরুষ, যাকে ঘিরে মেয়েটি স্বপ্ন দেখেছে। স্বপ্ন নামের গাছ বুনেছে। বুনে তাতে আগাম ফল ও ফুল দেখেছে ছোট্ট সংসারের। জল সিঞ্চিত করে যত্ন করেছে পুরুষটিও তার সঙ্গে সঙ্গে সেই স্বপ্নের পথ ধরে হেঁটে হেঁটে তার সর্বস্ব চুরি করে নিয়ে পালিয়েছে। মেয়েটি যে কিছুই টের পায়নি তা ঠিক নয়। সে জেনেশুনেই ফাঁদে পড়েছে। কিন্তু ইচ্ছে করেই সে সন্দেহকে সন্দেহাতীত করে ভেবেছে। খেলুড়ে পুরুষ পালিয়ে গেলে স্বপ্নভঙ্গ মেয়েটির অবস্থা তখন কেমন হতে পারে? মানসিক রোগ! আত্মহত্যা! হয়তোবা। না হয় ফের সে স্বেচ্ছায় পা বাড়াবে, অন্য আরেক খেলুড়ে পুরুষের কাছে। কেননা দুর্বল হৃদয়ের মেয়েরা, একবার পা পিছলে পড়লে, বারবার সেই ভুলের দিকেই পা বাড়ায়। ভাবে, না এবার সে ঠিক মানুষ খুঁজে পেয়েছে। একবার পা পিছলে পড়া মেয়েগুলো বারবার যায়, পিছল খেতে। এটা মেয়েদের অভ্যেস বদভ্যেস! এরই নাম দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ, ভ্রান্তি-পা-শ! হৃদয়ের ক্রাইসিস কুলিয়ে ওঠার মতো মানসিক শক্তি সব মেয়েরই একই তরঙ্গের হবে এমন কোনও কথা নেই। সব মেয়ের মানসিক আবহাওয়াও এক মৌসুমের নয়। আমাদের সমাজ বুঝতেই চায় না মেয়েদের সমস্যাগুলোকে। এ ব্যাপারে সমাজ এখনো জাহেলিয়াতের যুগে। সেক্ষেত্রে বিপদগ্রস্ত নারীর পারিবারিক সমর্থন বা সহানুভূতির আশাও বৃথা। যে মেয়ের মানসিক শক্তি আছে, তাকে নিয়ে আমার ভাবনা নেই। কিন্তু যার নেই, তাকে নিয়ে আমার যত দুশ্চিন্তা। পশ্চিমে যে কোনও হৃদয়ের ক্রাইসিসকে জরুরি বলে বিবেচ্য ধরা হয়। ফলে মানসিক কাউন্সেলিং পারিবারিক সমর্থন সবই সম্ভব। ফলে ব্যর্থ প্রেমের কষ্ট, ওরা পরিবার বন্ধু এবং ডাক্তারদের সহায়তায় কাটিয়ে উঠতে পারে। কিন্তু আমাদের সমাজ ঠিক সেরকম নয়। কৈশোর বা যৌবনের কোনও প্রতারণা, খেলুড়ে প্রেম একটা। মেয়ের বাকি জীবনকে ধ্বংস করে দিতে পারে। তাকে বাকি জীবনের জন্য মানসিক রোগী বানিয়ে রাখতে পারে। সে আত্মহত্যাও করে।
গ. প্রত্যেক সমাজেই রয়েছে, নারী নির্যাতক পুরুষ। পুরুষের শাশ্বত চেহারা, ঘরের বৌদেরকে মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন। ধরুন একজন বিবাহিত পুরুষ। সেও খেলে ঘরের নারীর হৃদয় নিয়ে। তাকে ভালোবাসার কথা বলে যায়, অন্য নারীর কাছে। তাকে মিথ্যে বলে, গোপনে আশ্রয় নেয় অন্য নারীর শয্যায়। গেস্ট হাউজ, পতিতালয়, পরকীয়া। বাড়ির কাজের মেয়ে। ঘরে কাজের মেয়েরা সবচেয়ে বড় নাগালের। ওদেরকে মায়া বড়ি খাইয়ে, কিছু হাত খরচা দিলেই ঢুকে যাওয়া সম্ভব ওদের মশারির তলায়। পেট হয়ে গেলে অস্বীকার তো হাতের পাঁচ আছেই! নইলে কিছু টাকা হাতে দিয়ে মিটিয়ে দেয়া এমন কিছু অসম্ভব নয়। এমন ভগ্ন হৃদয়ের নারীর সংখ্যা কি খুবই কম, যাদের প্রতারক স্বামী বারবার তাদের বিশ্বাস ভঙ্গ করেনি। কাজের মেয়ে, গেস্ট হাউজ, পতিতালয় করেনি! আছে! অনেক আছে। সন্দেহের, সবটাই মিথ্যে নয়। যা রটে তার কিছু তো বটে। বিবাহিত পুরুষগুলোকে নিয়ে মেয়েদের সন্দেহ, অবিশ্বাস, সবটাই মিথ্যে হয় না। স্ত্রীকে ভালোবাসে না, এমন পুরুষ যদিও বিরল নয়, কিন্তু স্বামীকে ভালোবাসে না এমন নারী বিরল। স্ত্রীর মৃত্যু হলে, ক’জন পুরুষ মেয়েদের মতো আমৃত্যু বিধবা থাকে! স্ত্রীর মৃত্যুর মাসখানেক পরেই শুরু হয় নারীর সন্ধান। বলে, ধৎ, একা থাকা যায় না-কী? আমি বলি, যায়। অধিকাংশ মেয়েই বৈধব্য জীবনে, মৃত স্বামীর কথা ভেবে বাকি জীবন কাটিয়ে দিতে পারে। কিংবা নিষ্ঠুর সমাজের তুচ্ছ সংস্কারের কাছে ওরা বাধ্য হয় বৈধব্য জীবন কাটিয়ে দিতে। তবে মধ্য এমনকি বৃদ্ধ পুরুষদের মতো নারী কখনোই বিয়ের জন্য এমন খোলামেলা হয় না। হতে পারেও না। মধ্য বয়স্ক একজন বিপত্নীক পুরুষ নিঃসন্দেহে বিয়ে করবে। এমনকি বৃদ্ধ পুরুষও। কিন্তু নারী সেকথা ভাবে না। ভাবতে জানেও না। সে স্বপ্নও তার নেই।
