জীবন যখন সাময়িক, তাহলে দুয়ে দুয়ে মিলে যদি চার হয়, দুয়ে দুয়ে বিয়োগ দিলে তো শূন্যও হয়। সংসারে দুয়ে দুয়ে কেন সবসময় যোগ দিতে হবে। যদি মেলাতেই হয় তাহলে দুয়ে দুয়ে বিয়োগ দিলেও তো মিলে যায়। অধিকাংশ মানুষ দুয়ে দুয়ে চার মিলিয়ে সুখী। এবং এই চার যখন মিলে যায় তখন চাহিদা আরো বেড়ে যায়। কোটিপতি দাশবাবুর তেতলা প্রাসাদের আঙিনায় এখন গরু ঘাস খায়। মিত্র বাড়িতে আলোর বদলে আলেয়া জ্বলে। চৌধুরী বাড়িটা এখন মদ্যপদের স্বর্গ। তাহলে এত কিছু করে শেষ পর্যন্ত কি হলো! ‘চার’ না ‘শূন্য’। আমি তো দেখি শুধু শূন্যতা। সংসারে শূন্য মেলানো খুব সহজ! এবং তাতে শান্তি আসে। তা, না বুঝলো অনিল না বুঝলে রাজ। না বুঝেছিল আমার বাবা। মারা যাওয়ার মাত্র দু’বছর আগে মাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন অন্য নারীর কাছে ‘৪’ মেলাতে। কিন্তু ‘৪’ তো আর মেলেইনি বরং উল্টো ‘শূন্য’ ঘরে এসে, মাকে হারিয়ে এক মহা শূন্যতায় নিমজ্জিত বাবা, অবশেষে গলায় কলস বেঁধে গাঙিনার জলে ডুবে মরে যায়।
রূপালি তোকে আমি বোঝাতে পারবো না যে সমমনা সঙ্গী না হলে বিয়েটা কতবড় ব্যর্থতা! সমমনা না হলে প্রেম জাগে না। আর প্রেম না জাগলে শরীর জাগে না। অন্ধত্ব যে কারণে কষ্ট পাচ্ছে রাজ, পাচ্ছে অনিলের স্ত্রী। রাজের কষ্ট আমি বুঝি। দোষ রাজের নয়, দোষ আমারও নয়। দোষ, সময়ের। আসলে কি জানিস, সৃষ্টিশীল মানুষের সংসারে জড়াতে নেই। এই অনন্য মানুষগুলোর জন্যে সংসার একটি ভুল চৌরাস্তার মোড় যেখানে এসে সে কষ্ট দেয় নিজেকে, তার চারপাশের মানুষদেরকে। কুলিয়ে উঠতে না পেরে কত প্রতিভাই তো নষ্ট হয়ে গ্যাছে! কত সৃষ্টিই তো বৃথায় পর্যবসিত হয়েছে। ঘুম থেকে উঠে একজন অনন্য মানুষকে যখন অন্য দশটা মানুষের। অন্ন জোগানোর জন্য কাজে যেতে হয় তখনই সেই মানুষটির সর্বনাশের আর বাকি থাকে কি? তার প্রয়োজন নিরঙ্কুশ-অব্যাহত সময় এবং মন। দাম্পত্যে, গৃহস্থে পেলেও তা যথেষ্ট নয়।
যাই হোক, একটা সময় ছিল প্রথম যৌবনে, যখন ভাবাবেগ স্থান পেয়েছিল সবার ঊর্ধ্বে। সময়োচিত তখন তার সবটুকু করেছি। আমি আজ আমার নিজের জন্যে সময় ব্যয় করতে চাই। সেখানেই বিরোধ এবং সেজন্যেই আমাদের জীবনের মোড় ঘোরানোর সিদ্ধান্ত। কারণ আমি গতানুগতিক মেয়েদের মতো হতে পারি না, ভাবতে পারি না, চাইও না। যেমন আমি কিছুতেই বুঝতে পারি না আমাদের মেয়েদের সময়। অপচয়ের মাত্রা! শিক্ষিত মাস্টার্স ডিগ্রি পাস মেয়েগুলো যখন কিন্ডারগার্টেন স্কুলের সামনে দাঁড়িয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় শাড়ি-গয়না-রান্না-সিনেমা-রেস্টুরেন্ট-ফ্যাশনের। মতো আষাঢ়ে সব গল্পে মেতে ওঠে। নিজের সব সময়গুলোকে অপচয় করে সন্তানের জন্য। আর যখন এই মেয়েগুলো স্কুল থেকে ঘরে ফিরে সংসারের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে তখন শিক্ষিত মেয়েদের পুরুষগুলো সব অফিস করছে। তখন আমার মনে প্রশ্ন জাগে-কেন ওদের সন্তান হয়? কেন সংসার হয়? মনে হয়, মরে যাক সেই ‘জরায়ু’। চুলোয় যাক ওদের ‘চুলো’। আবার ভাবি, ওরা তো নির্বোধ! কিন্তু নির্বোধই যদি হবে। তবে, ভার্সিটি পাস ওরা করলো কি করে! জানিস, আমি সত্যিই বিভ্রান্ত!
মৃত্যুকেও কৌশলে ফেরানো যায়, সময়কে নয়। সময় ক্ষমাহীন এবং নিষ্ঠুর। যারা পরিবর্তন বুঝতে পারে, পেরে তাকে স্বাগত জানায় বৌদ্ধিক অর্থে তারা জীবিত। বাকিরা, মৃত।
আমি এই মৃতদের দলে থাকবো না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছি। যা শুনেছিস ঠিকই শুনেছিস। মনে রাখিস জীবন একটি সাময়িক পত্রিকার মতো। যতক্ষণ ছাপা হরফে চোখের সামনে থাকে, মানুষ পড়ে এবং যতক্ষণ চোখের সামনে থাকে, মনে রাখে। ভাঙা-গড়ার জোয়ারে জীবনের এই সাময়িক যাত্রাও ঠিক তাই। এতকাল তো কেবল গড়েইছি। না হয় এবার ভাঙলাম! দেখি না কি হয়। ভাঙায় যদি কিছু মেলে। শূন্য না হলে পূর্ণ হবো কি করে। জায়গা লাগবে তো! জীবন বৈচিত্র্য চায়। জীবন–সুধা চায়। মাধুরী–স্বর্ণলতা, চায়। জীবন, এমনি করে করেই তার বৈচিত্র্য, খুঁজে পায়। তার প্রকৃত ঠিকানা খুঁজে পায়। সন্ধান পায় সত্যের। যে সত্যের জন্যে তার জন্ম। সময় খুঁজে পায় তার পরিবর্তনের গতি, আরেক ধাপ বিবর্তনের। মধ্য বয়সে, যৌবন আর বার্ধক্যের সন্ধিক্ষণে এখন আমি এই বিবর্তনের মধ্য দিয়ে চলেছি। আশা করি তোর উত্তর মিলবে।
আদরের, তোরই মৌ
১৫. মেয়েদের ক্রাইসিস পুরুষ
ক. মানুষের ক্রাইসিস নিয়ে লেখার বিষয়গুলোর মধ্যে হৃদয়ের ক্রাইসিস আমার সবচেয়ে পছন্দের। হৃদয়ের ক্রাইসিস, যা অন্য সব ক্রাইসিসকে ছাড়িয়ে যায়। ক্ষুধার যন্ত্রণার চেয়েও তীব্র। অকাল বিধবার রাতজাগা কামার্ত শরীরের অনুভূতির চেয়েও যন্ত্রণার। আমি ক্ষুধার্ত থেকে দেখেছি। হৃদয়ের ক্রাইসিস জাগিয়ে তোলে শরীর। জাগায় স্নায়ুকোষ। জাগায় অপ্রাপ্তির, মৃত্যুযন্ত্রণা। মাসের পর মাস, স্বামীর কাছে থেকে, দূরে থেকেও দেখেছি। কিন্তু হৃদয়, সেখানে ক্রাইসিসের মুচড়ে ওঠা ব্যথা, বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সকল ব্যথার চেয়েও একমাত্র মৃত্যুযন্ত্রণা বাদে ছাড়িয়ে যায়। দুঃসহ এই ব্যথার কোনও ওষুধ নেই। কোনও ডাক্তার-বদ্যি নেই। সুতরাং কোনও নিরাময়ও নেই।
