আমি এই সমস্যার নাম দিয়েছি, সময়ের কালসাপ। যা সময়ের ব্যবধানে অনেক রকম খেলা দেখায়। কেউ কেউ তা বোঝে, অধিকাংশই বোঝে না। আমার মধ্যে এক শিল্পীর সম্ভাবনা যা এত কাল সুপ্তই ছিল, অনিলের সঙ্গে পরিচয়ের পর তা প্রথম আবিষ্কার করলাম। এক অন্য আমি। যেন নিজেকে দেখে নিজেই চমকে উঠি। ভাবি একি সত্যিই আমি! নাকি আমার প্রেতাত্মা। জীবনে এরকম অনেক আচমকা ঘটনা ঘটে যায়। তবে আমরা তা চিনতে ভুল করি। রাজ আমার এই হঠাৎ পরিবর্তনে চমকে ওঠে। আমার সঙ্গে ওর একান্ত পৃথিবীতে অনিলের উপস্থিতি ওকে ঈর্ষান্বিত করে তোলে। এবং রাজের এই চমকে ওঠাই স্বাভাবিক। এটা ওর দম্ভের রাজত্বে কুঠারাঘাত। আমাকে নিয়ে ওর একার রাজত্ব। একচ্ছত্র। কিন্তু তা সত্ত্বেও, প্রশ্ন থেকে যায়। প্রশ্ন, রাজের মধ্যে কেন এই সঙ্কীর্ণতা? ওতো আমার সঙ্গেই কাটিয়েছে, জীবনের অনেকটা সময়। তাহলে কেন এই, প্রথার বাড়াবাড়ি! এখন বুঝি সব মানুষের বোধ এবং ধারণ ক্ষমতা এক নয়। যদি হতো তাহলে সংসারে কেন এত বিচ্ছেদ, এই শান্তি হীনতা!
রাজ একাধারে আমার জীবনে অনিলের উপস্থিতি এবং আমার সৃজনশীলতা দুটোকেই প্রত্যাখ্যান করলো। সেজন্যে দায়ী, রাজ। সেজন্যেই আমি আর অনিল আজ এক সমান্তরালে দাঁড়িয়ে। অনিল আর আমার একমাত্র ভাষা, এবং আমাদের একটি মাত্র ভাষা এবং তাহলো, শিল্প।
অনিলের স্ত্রী অপর্ণা, পক্ষাঘাতে অসুস্থ। ভীষণ খিটখিটে, দজ্জাল এক মহিলা। দীর্ঘদিনের অসুস্থতায় অনিলের জীবনটাকে সে এক আস্ত নরকে পরিণত করেছে। কিন্তু অসুস্থ বলে ইচ্ছে সত্ত্বেও ওর প্রতি কোনওরকম অমানবিকতাও অনিল দেখাতে পারে না। অপর্ণা বিশ্বাস করে অনিল ভুল পথে চলেছে। তাকে সে দেখতে চায় গৃহস্থ স্বামীর চরিত্রে। অপর্ণার সঙ্গে যন্ত্রণার জীবন অনিলের বৌদ্ধিক যন্ত্রণাকে তীব্র করেছে বলেই সে এতদিন উল্লেখযোগ্য কোনও কাজ করতে পারেনি। সুতরাং একথাই কি সত্য নয় যে সংসার সবার জন্যে নয়? তাহলে একথাই কি সত্য নয় যে সৃষ্টিশীল মানুষদের সংসারে জড়াতে নেই! কারণ সংসার, সময়কে ধরতে দেয় না। বুঝতেও দেয় না। সময়, দিনের আলো পরিবর্তনের মতো এসে মিলিয়ে যায়। সময়ের সঙ্গে সংসার শুধু বৃদ্ধি পায়। আমাদের দুর্ভাগ্য আমরা ওসব স্বীকার করতে শিখিনি। তার কারণ, সংসার যা তার নিজের সময় অনুযায়ী জীবনের সঠিক সময়কে ফেলে চলে যায়। সমুদ্রে জোয়ার আর তার তরঙ্গ যেমন, নির্ভর করে আকাশের চন্দ্র সূর্যের ক্ষণের ওপর, জীবনের তরঙ্গ তেমন নির্ভর করে, সময়ের জোয়ারের ওপর। সময়, দেয়। সময়, নেয়ও। সময় যেমন মানুষের জীবনে সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ। তেমনি সবচেয়ে বড় অভিশাপও। সবচেয়ে বেশি সুন্দর, সর্বাধিক নরকও।
পারিবারিক জীবন বলে একটা কথা আছে। একটা নির্দিষ্ট সময়ে এই জীবনেরও একটা প্রয়োজন রয়েছে। এই সময়টুকুতে ওরা যৌথভাবে সৃষ্টি করে, সংসার এবং সন্তান। একসঙ্গে তারা উপভোগ করে তাদের এই সৃষ্টিকে। একসঙ্গে এই হেঁটে যাওয়ার সময়টা বড়জোর জীবনের পনেরো থেকে কুড়ি বছর, তবে অজস্র ফুল আর কাঁটা বিছানো পথ ধরে। যখন তাদের সন্তান-সন্ততিরা বড় হয়। তখন তাদের কিছু সামাজিকতা পালন করতে হয়। তখন তাদেরকে একে অপরের পরিপূরক স্বামী-স্ত্রী হতে হয়। তবে এখানে কিছু প্রথার নষ্টামো, কিছু ভণ্ডামো, কিছু-অতিরঞ্জিত ব্যাপার স্যাপারও থাকতে পারে, থাকবেও। বিয়ের প্রথম কুড়ি বছর পরেও গৃহস্থ প্রথাগত মানুষের বিশ্বাস করতে থাকে যে, আগামী কুড়ি বছরও একই সমতলে থাকবে। মানুষ যে বদলে যেতে পারে একথা তারা বুঝতেই চায় না। প্রকৃত সমস্যা এখানেই। বার্ধক্যে তার কৈশোর, থাকবে কি করে? আর ভরা বার্ধক্যে, যৌবন? সেও ভাবলো সাধারণ সবাই যা ভাবে।
তারপরেও সংসারী মানুষগুলো কি সুখে আছে? দিনরাত তাদের হা-পিত্যেশের কি শেষ আছে? এই হলো না, সেই হলো না। এ অসুখ, সে অসুখ। টাকা নেই–দুঃখ আছে। সুখ নেই, টাকা আছে। কত রকমভাবে মানুষ যে সংসারে অসুখী, তার কি কোনও শেষ আছে! সংসারে অসুখী মানুষের যেমন শেষ নেই, তেমনই শেষ নেই তাদের চাহিদার। চাহিদা আর অসুখী মানুষেরা পাশাপাশি হাঁটে।
শুধু চেয়ে চেয়েই এরা গরিব হয়। এবং এই চাওয়ার সমুদ্রে ভাসতে ভাসতে এরা শত পেলেও যা পায়নি তারই খোঁজে আজীবন ভাসতে থাকে। কূল দেখা যায়। কিনারা দেখা যায়। তবু অসুখী মানুষেরা কূল-কিনারা পাওয়ার সুখ না নিয়ে, দুঃখ পেতে অকূলে ফিরে ফিরে আসে। ওদের চাওয়া, ওদের অসুখীপনার কোনও শেষ নেই। যেমন ছিল না রাজের। ওকে আমি সংসার দিয়েছি–সন্তান দিয়েছি। সামাজিকতা দিয়েছি, কুড়ি বছর একটানা। কিন্তু ওর মনে তবুও সুখ হলো না। যা দিয়েছি তা নয়। যা দিইনি বা দিতে পারিনি তার জন্য সারাক্ষণ সে অসুখী। অথচ যা আছে যতটুকু আছে তা কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় প্রচুর। তারপরেও যা নেই, সেটুকুর জন্যেই–ওর কাঙালপনা। সংসার থেকে আমার কিছুটা বিরতি ওকে করে তুলেছে দরিদ্র থেকে দরিদ্রতর।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে পৃথিবীর সবকিছুই আপেক্ষিক। সবকিছুই অস্থায়ী। রাজ আর আমার সম্পর্ক হয়ে গেল স্থায়ী থেকে অস্থায়ী। আমার বাবা-মায়ের সম্পর্ক ছিল স্থায়ী। কিন্তু বাবা যেদিন মাকে ছেড়ে চলে গেল, সেদিন ওদের সম্পর্কটা হয়ে গেল অস্থায়ী। বাবাকে হারিয়ে মা একা হলো। ছেলেমেয়েরা তখন কেউ কাছে নেই। মাকে এভাবে দেখে মনে হলো মানুষ কত অসহায়! বিয়ের মাধ্যমে মেয়েরা সংসার গড়ে তোলে, সন্তান সৃষ্টি করে, বহুজনকে ঘিরে যে রকম গড়ে ওঠে সে তেমনি, তাকে ঘিরে গড়ে ওঠে বহুজন। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে, সেই মানুষই, যেমন আমার মা, আবার একা হয়ে ফিরে যায়, কুমারী জীবনের একাকিত্বে। যখন বাবা ছিল না। আমরা ছিলাম। যখন সংসার ছিল না। সময় বৃত্তাকারে ঘোরে। তাহলে বল, কেন এই দুঃখ পাওয়া! চলে তো একজন যাবেই প্রথমে। হয় রাজীব! না হয়, আমি! যদি সঙ্গেই না গেলাম, তবে সাময়িক এই হারানোর জন্য কেন এই দুঃখ পাওয়া!
