আমি জানি, কামালের উপস্থিতি এই সংসারে, তোমাদের একেবারেই পছন্দ নয়। তোমরা ওর নামটি পর্যন্ত শুনতে চাও না। এবং এটাই স্বাভাবিক। এবং আমিও যে বুঝি না তা নয়। বলেছ–কখনো আর আমার মুখ দেখবে না। মা, কামালকে বিয়ে করে আমি ভুল করেছি কিনা তার চেয়ে বড় কথা ওকে বিয়ে করেছি বলে এখনো সুস্থ মনে বেঁচে আছি। কামালকে পেয়ে আমি মানসিক রোগ থেকে মুক্তি পেয়েছি। বিয়ের পর মানসিক রোগের ওষুধ ছাড়তে পেরেছি। ও আমার কথাসঙ্গী। আমার বলার মানুষ। খাওয়ার টেবিলে পাশে বসার মানুষ। তোমাদের তো বরং তাতে খুশি হওয়া উচিত ছিল যে, তোমাদের মা রাস্তার পাগল হয়নি যাকে দেখলে লোকেরা পেছন পেছন দৌড়তো আর ঢিল ছুঁড়ে মারতো, সেটাই কি ভালো হতো। তোমাদের চলে যাওয়ার পর একদিন ঘরে যে শূন্যতা এসেছিল পিঙ্কি এসে তা কাটিয়ে দিয়েছে। কিন্তু তার মানে এই নয় যে পৃথিবীর কেউ-ই তোমার বা সুজনের শূন্যস্থান পূরণ করেছে। তোমরা রয়েছে আমার অন্তরে যে যার জায়গামতো। কামাল, সুজনের স্থান কখনোই পাবে না। কিন্তু তাই বলে কামালকে আমি ছোট বলেও ভাবতে পারবো না। কামালকে তোমরা গ্রহণ করবে কি করবে না সেটা তোমাদের ব্যাপার। কিন্তু তোমরা যে বিষয়টা বুঝতেই চাইবে না, সেটাও ঠিক নয়। অন্তত যুক্তি দিয়ে বিচার করে দেখো। আমি কতটা প্রয়োজনে বা অ প্রয়োজনে দ্বিতীয়বার বিয়ে করলাম। মা, একা একা বাস করা যায় না। মানুষ যখন জঙ্গলে ছিল তারাও দল বেঁধেই থাকতো। বনের পশু-পাখিও এমনকি জলের মাছেরাও দল বেঁধে থাকে। প্রাসাদের চেয়েও বড় মানুষ, আর মানুষের চেয়ে বড় তার সঙ্গ। নিঃসঙ্গ তাজমহলের চেয়ে জনাকীর্ণ বস্তি অনেক অনেক ভালো। নয় কি? মানুষ মানুষকে দেখতে পারে না। মনে রেখো, মানুষ ছাড়া মানুষ থাকতেও পারে না।
শূন্যতার চেয়ে বড় অভিশাপ কিছু আর নেই। নিঃসঙ্গতার কারণে হঠাৎ একদিন আত্মহত্যার চিন্তাও মাথায় এসেছিল। গিয়েছিলাম দক্ষিণের ছাদে, আমাদের পাঁচতলার ঐখানে। কামাল তারই বিকল্প। পিঙ্কি তোমাদের ছোট বোনটি তারই ফল। সে সন্তানের চেয়েও বরং বেশি বন্ধু। আমি ওর মধ্যে তোমার ছবি দেখতে পাই। পিঙ্কি তো তুমিই। আর এভাবেই চলে যায় আমার জোড়াতালি জীবন। আগামীর স্বপ্ন নেই। আশা নেই কোন। শুধু মাঠ মাঠ অতীত আর সামান্য বর্তমান। অতীত, যার মধ্যে রয়েছে তোমরা তিনজন, থাকবে যেখানে যার স্থান। দিন চলে যায়। দিন আমিও পার করে দিচ্ছি। একে যদি বলো বেঁচে থাকা, তাহলে আমি বেঁচে আছি। তার বেশি নয়। সুতরাং কি পরিস্থিতির শিকার হয়ে কেন আমি আবার বিয়ে করলাম হয়তো সামান্য হলেও বোঝাতে পেরেছি। জীবন একটি সুন্দর অনুভূতি। বইবার মতো যথেষ্ট কারণ বা আনন্দ না থাকলে তা হতে পারে একটি বোঝা। এই বোঝা বইবার শক্তি যখন ফুরোলো তখন ভাঙলো আমার প্রতিজ্ঞা।
তোমাকে আবারো বলছি, আমার মতো পরিস্থিতি হলে একা থাকার মধ্যে কোনও বীরত্ব নেই। বাকি জীবন বিধবা থেকে দিনের পর দিন শূন্যতার সঙ্গে যুদ্ধ করার মধ্য দিয়ে সুনাম অর্জন করা যেতে পারে, মানুষ বাহবা দিতে পারে, কিন্তু বাস্তবে এর কোনও মানে নেই। এবং ব্যক্তির নিজের জীবনের ওপর তা চরম নিষ্ঠুরতা।
বুঝতে পারলে, ক্ষমা নিষ্প্রয়োজন। জানি, একদিন তোমাদের বোধোদয় হবে। মান-অভিমান ভুলে ফিরে আসবে। আমার হৃদয় সে আশায় আমৃত্যু খোলা রইলো।
সবশেষে রবি ঠাকুরের শেষের কবিতা থেকে বলছি —
‘আমারে যে দেখিবারে পায়,
অসীম ক্ষমায়
ভালমন্দ মিলায়ে সকলি …।’
তোমাদেরই স্নেহের মা (মালবিকা)।
১৪. কালসাপ
রূপালি,
ভালো আছিস আশা করছি। আমিও আছি। আমাদের তো ভালো থাকতেই হয়। নয় কী? নইলে জগৎ সংসারের এই ঘানি টানবে কে? সেদিন জানতে চেয়েছিলি রাজ আর আমার ব্যাপারে। জিজ্ঞেস করেছিলি, এসব কি শুনছি! তোদের নাকি ডিভোর্স হয়ে যাচ্ছে! তুই-ই বল, জীবনের মতো সূক্ষ্ম এতো গুরুত্ববহ ব্যাপারগুলোর উত্তর কি এত দ্রুত কোনও চাইনিজে বা কোনও ক্যাফেতে বসে চা খেতে খেতে দেয়া যায়? যায় না রে! রাগ করিস না, সেদিন তোর প্রশ্নের জবাব দিইনি বলে। বিচ্ছেদ, কখনোই সুখের নয়। তুই দেশে এসেছিলি বহু বছর পরে। তাই সেদিন আমার বিচ্ছেদের কথা বলে, তোকে বিষণ্ণ করতে চাইনি। তুই তো জানিস আমার এমন কোনও কথা নেই যা তোকে আমি বলতে পারি না।
তোকে যা বলতে পারি, শুধু তোকেই পারি। অপেক্ষা ছিল সময়ের। সময়টা ঠিকঠাক না হওয়া অবধি, লিখতে বসতে পারিনি। যা বলার, গুছিয়ে, আজ মনে হলো এই সাত সকালের বৃষ্টি ঝরা বিষণ্ণ আকাশের দিকে চেয়ে, হ্যাঁ! আজই লেখার সময়।
সময়, মন আর জীবন। এই তিনটে শব্দ গত দু’বছরে আমাকে সম্পূর্ণ নড়িয়ে দিয়েছে। আমার ভালো-মন্দ, দুঃখ-সুখ, ঘটনা-দুর্ঘটনা তিনরঙা ত্রিবেণীর জলের মতো সময়-মন আর জীবনের সঙ্গে যুদ্ধ করতে করতে, বিচিত্র এক রঙ ধারণ করেছে, যেখানে আমি, রাজ এবং অসীম অনবরত একই আবর্তে পাক খেয়ে চলেছি।
রাজীবের সঙ্গে আমার সম্পর্ক এখন কতটা মন্দ তার চেয়ে বড়, রাজের সঙ্গে আমার অতীতের সুন্দর দিনগুলো। রাজের মতো স্বামী দুর্লভ। ওর থেকে আমি কি পাইনি? তা সত্ত্বেও, পরবর্তী সময়ে একটা প্রশ্ন এসে উপস্থিত হলো। প্রশ্নটা হলো সময়ের সঙ্গে মানুষের মনের পরিবর্তন। আমি বিশ্বাস করি সময় মানুষের জীবনকে ধারণ করে। মানুষ, সময়কে ধারণ করে না। কিন্তু প্রথাভিত্তিক অধিকাংশ মানুষই ভাবে তার উল্টো। ফলে আমরা পিছলে পড়ি না শুধু, পিছিয়েও পড়ি। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে আমারও মধ্যে যে পরিবর্তন এসেছে তাকে আমি একেবারেই অস্বীকার করিনি। এবং করিনি বলেই, সেদিনের সেই আমি, আর আজকের এই আমি, এক নই। আমি সময়ের পরিবর্তনে বিশ্বাসী। এবং রাজের সঙ্গে শুধু নয়, পৃথিবীর সব প্রথাভিত্তিক মানুষের সঙ্গে আমার মূল ক্রাইসিস, এখানেই।
