আজো সুজনের জন্যে আমার একান্ত গোপন ভালোবাসা। এইসব প্রেমানুভূতি এতই ব্যক্তিগত যে সেসব আমি কারো কাছে কখনোই বলিনি। বলবোও না। সুজনের চলে যাওয়ার পর আত্মীয়-স্বজনেরা অনেকেই এলো বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে। হায়! আফসোস করে বলতে শুরু করলো মেয়েটার এত কম বয়স! দুটো সন্তান, এত দায়িত্ব! এত বড় সংসার এদের মানুষ করতেও তো মানুষ লাগে। বিয়ের জন্যে অনেক ছেলে নিজেরাও প্রস্তাব নিয়ে এলো। মানুষের চোখে আমি সুন্দরী, শিক্ষিতা, কর্মজীবী। কিন্তু আমি তোমাদের মুখের দিকে চেয়ে নিজের কথা কক্ষণো ভাবিনি। সবাইকেই ফিরিয়ে দিতে দিতে বলেছি, না-না-না! কিছুতেই না। আমার দুটো সন্তান। ওরা কষ্ট পাবে। কক্ষণো না। তোমাদেরকে আমি একা হাতে মানুষ করার প্রতিজ্ঞা করেছিলাম তোমার বাবার কাছে। মৃত্যুশয্যায় তাকে কথা দিয়েছিলাম, আমার সন্তানদের জীবনে দ্বিতীয়বার কোনও বাবা আসবে না। কিন্তু মৃত্তিকা আমিই আমার সেই প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করেছি। আমি অনুতপ্ত। কিন্তু তার পেছনেও কারণ আছে। যুক্তি আছে। কি কারণে এই কাজটা আমি করলাম তা তোমরা কেউ বুঝতে চাইলে না। তোমরা শুধু আমার বাইরেরটাই দেখলে, সন্তান হয়ে আমার ভেতরের জ্বালাটা একবার ভেবে দেখলে না। অপার এক শূন্যতায় কিভাবে আমি ভেতরে ভেতরে ক্ষয়ে যাচ্ছিলাম আমার দুই চোখের নিচে এক আঙুল কালি, দেখনি! শোননি আমার প্রলাপ গভীর রাতের বেলায়! কিন্তু বুঝতেও চেষ্টা করলে না। দুঃখটা আমার সেখানেই। তোমরা আমার আত্মজা হয়েও উল্টো আমাকেই ভুল বুঝলে।
তোমরা দু’ভাইবোন ছিলে আমার প্রাণ। সুজন চলে যাওয়ার পর আমি ভালোমন্দ অনেক কিছুই করতে পারতাম। সে সুযোগ, সে প্রলোভন এবং স্বাধীনতা আমার ছিল। তোমরা কিন্তু সেসব কিছুই জান না। দেখতে দেখতে একদিন তোমরা বড় হয়ে গেলে। সমাজের রীতি অনুযায়ী একদিন তোমাদের বিয়ে হয়ে গেল। সেই সঙ্গে আমার কাজও ফুরিয়ে গেল। আর আমি হয়ে পড়লাম খাঁচায় বন্দি একটা পাখি। বেকার বিধবাবিধুর। মাঠ মাঠ সময়। তেমন কিছুই করার নেই। থাকলেও যাই না। যাও যেতাম সব বন্ধ করে দিয়ে চলে গেলাম স্বেচ্ছা নির্বাসনে। ডাক্তার বললো, ডি প্রেশন।
আজ খোলাখুলিভাবে তোমাদের বলতে কোনও বাধা নেই যে বিশেষ করে একজন মাঝ বয়সী মানুষের জন্যে এই সংযম ও সংস্কার কোনও সহজ কাজ নয়। তোমাদের নিয়ে যেদিন রুকু খালার মেয়ের বিয়েতে গেলাম সেদিন যে লোকটি তোমাকে কোলে নিয়ে সমস্ত বাড়ি ঘুরে বেড়ালো, মনে আছে! তুমি বললে, আম্মু এই আঙ্কেলটা আব্দুর মতন ভালো। ওকে বিয়ে করো না কেন! আমাকে না খুব আদর করেছে। তুমি জানতে না যে, সেই কোটিপতি লোকটা কতবার আমাকে বিয়ের প্রস্তাব পাঠিয়েছিল। বড়ই ভালো মানুষ সে। রফিক আমাকে হৃদয় থেকে চেয়েছিল। কিন্তু মা, আমি তো সুজনকে কথা দিয়েছিলাম। আর রফিক অপেক্ষায় থেকে থেকে শেষে অন্য জায়গায় যেদিন বিয়ে করে ফেলো, সেদিন একসঙ্গে অনেকগুলো ঝড়ের তাণ্ডব সহ্য করতে না পেরে এত কেঁদেছিলাম যে তুমি ভয় পেয়ে রুকু খালাকে লুকিয়ে ফোন করে নিয়ে এলে যখন, তখন কত রাত! মনে আছে সেকথা!
এমনি করে একসঙ্গে বাবা-মায়ের দায়িত্ব একাকী হাতে পালন শেষে যেদিন আমি তোমাদেরকে ভালোভাবে বিয়ে দিতে পারলাম সেদিন চারপাশের সবাই বাহবা দিলো আমার ত্যাগ আর ধৈর্যের। বলতে গেলে সবাই এক নিশ্বাসে প্রশংসার ফুলঝুরি ছিটিয়ে বলতে থাকলো, আহা! কি ত্যাগী নারী! কি ভালো! কিন্তু ওরা কি কেউ আমার মন প্রাণের আসল খবর জানে? আমার হতাশা! দুঃখ! নিঃসঙ্গতা! কতখানি দারিদ্র এই ঐশ্বর্যের নিচে কাজ করছে! কতখানি আগুন এই গলিত লাভার বুকে! কেউই জানলো না।
তোমরা যাওয়ার পর বাড়িটা হঠাৎ নতুন করে ফের শূন্য হলো। এত বড় বাড়িতে আমি ছাড়া আর শুধু রেনুর মা। বহুদিনের পুরোনো কাজের লোক সে। বুড়ো হয়ে সেও ঝিমিয়ে গেছে। দেখি সেও শুধু পড়ে পড়ে খায় আর ঘুমোয়। কাজ যা থাকে, দু’ঘণ্টায় শেষ। কোনও রকমে দুটো খেয়ে আমিও শুয়ে-বসে শুধু দেখি সামনে বিশাল শূন্যতা। আর নিজেকে মনে হতে লাগলো, অপচয়–। নিষ্প্রয়োজন। অকারণ বাঁচা।
খবরের কাগজ, টেলিভিশন, ম্যাগাজিন, চা, টেলিফোন এসব বড়জোর ঘণ্টা দুই’র জিনিস। তারপর থেকে শুরু হয় বাকি সারাদিনের জন্যে বুকের মধ্যে একটা হালকা চিনচিনে ব্যথা। ভয় হয় এত সময় কি করে কাটাবো! একরাশ রুদ্ধশ্বাস, দমকা হাওয়ার মতো দাপিয়ে বের হয়ে যায় তীব্র যন্ত্রণায়। এক ধরনের পাগলামো। আমাকে গ্রাস করে বসলো। আরো মাস দুয়েক পর। এমনি এক রাতে একদিন হঠাৎ ঘুমের মধ্যে, তোমার বাবার মূর্তি, অন্ধকারে আমার সামনে এসে যখন দাঁড়াল আমি চিৎকার করলাম। দৌড়লাম। দৌড়েও পথ খুঁজে পাই না। সেও বারবার ফিরে আসে কল্পনায়, এসে কথা বলে। চা খায়, খাবার খায়। শোয়, বই পড়ে। গল্প করে। দাম্পত্য করে। জেগে খুঁজি, হাতরাই, নেই-নেই কোথাও কেউ নেই। ভয়ে আমি বিছানা ফেলে রেনুর মায়ের পাশে শুয়ে পড়ি। আর যখন অনুভূতির রোলার কোস্টার আমাকে নির্মম শারীরিক কষ্ট দিতে শুরু করলো, আমি যেন নিজের কাছে হয়ে উঠলাম একটা ক্লাউন। ক্ষণে হাসি, ক্ষণে কাঁদি। ক্ষণে পাগলি, ক্ষণে পণ্ডিত। শিউলি আমার ঘনিষ্ঠ বান্ধবী। ব্যাপারটা সে খুব সিরিয়াসলি নিয়ে ডাক্তারের সঙ্গে যোগাযোগ করলো। ওর জোরাজুরিতেই শুরু করলাম মানসিক রোগের চিকিৎসা। ডাক্তার বললো বিয়ে করুন। সঙ্গীর প্রয়োজন আছে। আপনার মানসিক হতাশা চরমে। রোগের নাম ”ম্যানিক ডিপ্রেসিভ সাইকোসিস”, সঙ্গী ছাড়া এই রোগ নিরাময় হবে না। মন-শরীর এখন আপনার বিরুদ্ধে। চললো পাগলের চিকিৎসা আর ওষুধপত্র। আর শিউলী গোপনে গোপনে–কামালের সঙ্গেও গভীর যোগাযোগ করতে থাকলো।
