ক্ষুধা পাকস্থলীর। ক্ষুধা যৌনাঙ্গের। তীব্র ক্ষুধা পেলে ওরা প্রতিবাদ জানাবে। পাকস্থলী আর যৌনাঙ্গ দুটো দুই জিনিস; ক্ষুধার যন্ত্রণা এক। শরীরের অন্যান্য অনুভূতির মতোই সম বা উভয়কামিতাও। যদিও এগুলো মধ্য বয়সের সমস্যার ফ্রেইমে ঠিক আঁটে না, তবুও বলা চলে এই সঙ্কটকালে এসে তীব্র হয় যে বয়সে সেটাই মধ্য বয়স। মানুষের যৌন অনুভূতি একটি মানবিক বিষয়। সূক্ষ্ম, ব্যক্তিগত এবং গোপন।
নিজেকে ভালোবাসার, ভালো লাগার বিষয়। যা স্বাভাবিক, যা প্রাপ্য। দেহের অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মতো যৌনাঙ্গেরও রয়েছে নিজস্ব তাড়না। অনুভূতি ও মন। ওদের একটা আলাদা পৃথিবী আছে। ওরাই ঠিক করে নেয় কার কি চাই। যৌনাঙ্গের বুদ্ধি, অনুভূতি ও মনের বিরুদ্ধে যে-কোনও রকম বিধিনিষেধ বা বিরোধিতা, বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টির জন্যে যথেষ্ট। আর এই বিরূপ প্রতিক্রিয়াই বিশেষ করে দেখা যায় ধর্ম প্রতিষ্ঠানগুলোতে, যেখানে প্রচণ্ড রকমের ধর্মীয় অনুশাসনের কারণে মানুষের এই মৌলিক চাহিদার বিরুদ্ধে দিয়েছে নানারকম বিধিনিষেধ। লিঙ্গের ওপরে যারা ঢাকনা দিয়েছে বা ১৪৪ ধারা। চলে না। চলবে না। কিছুতেই না।
খ. চার্চের মধ্যে, ক্যাথলিক চার্চের অনুশাসনে রয়েছে যাজকদের বিয়ে বা সহবাস নিষিদ্ধ। কিন্তু ২০০২ সালের শুরু থেকে ক্যাথলিক চার্চের ভেতরে যেসব লোমহর্ষক কাহিনী আবিষ্কার হতে শুরু করেছে খোদ আমেরিকাতে, তারপরেও কি কোনও সন্দেহ থাকা উচিত যে, লিঙ্গেরও রয়েছে নিজস্ব মন ও অনুভূতি যার কাছে ধর্মীয় অনুশাসন টাসন সবই বৃথা। প্রবৃত্তির তাড়না বলে কথা। চার্চের যাজকদের হাতকড়া পরিয়ে কোর্টে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, কারণ তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, বছরের পর বছর নাবালক ধর্ষণ। রামকৃষ্ণ মিশনেও রয়েছে, ক্যাথলিক চার্চের মতোই কঠোর বিধিনিষেধ। কিন্তু তাই বলে কি মিশনারিরা ক্ষুধার্ত বসে থাকে? গবেষণাশেষে যখন কোনও মতবাদ দেয়া হয়, তার বিরুদ্ধে বা পক্ষে বিতর্ক সম্ভব। কিন্তু বৈজ্ঞানিক গবেষণা ব্যতিরেকে যে-কোনও সিদ্ধান্ত ভিত্তিহীন। এবং সমাজের জন্যে অকল্যাণকর বলে তা তাৎক্ষণিকভাবে পরিত্যাজ্য হওয়া উচিত।
মাদ্রাসা শিক্ষার ক্লাসে, সম বা উভকামিতার সংবাদ সেভাবে না ছড়ালেও, ভুক্তভোগী ছেলেগুলো এর শ্রেষ্ঠ সাক্ষী। ওরাই বলবে, মৌলবীরা কি নিষ্ঠুরভাবে ধর্ষণ করে। সন্তানতুল্য কিশোরীদেরকে। চার্চ-মিশন, মাদ্রাসা, সমকামিতার পিঠস্থান এবং অভ্যেস সৃষ্টির ফ্যাক্টরি। মানুষের যৌন অনুভূতি প্রতিষ্ঠানের বিধিনিষেধ দিয়ে মস্তিষ্ক ধৌত করে উপশম করা যাবে না। লিঙ্গের অনুভূতিগুলোকে অনুশাসনের শেকল পরিয়ে ক্ষণিকের জন্য নিস্তেজ করা যাবে, কিন্তু ১৪৪ ধারা দিয়ে নিঃশেষ করা যাবে না। অবশেষে বলল রাখা ভালো যে, বিশ্বব্যাপী প্রায় সব ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানেই চলে নিষিদ্ধ জীবন। অত্যন্ত গোপনে। মাঝে মাঝে যা গোপন থাকে না। স্ক্যান্ডাল কোথায় নেই? চার্চগুলোতে ২০০২ সালের এই তোলপাড় করা কেলেঙ্কারির সংবাদে এটাই প্রমাণ হয় যে লিঙ্গের বিরুদ্ধাচরণ সব ধর্মের মানুষের সবরকম শাসনকে তুচ্ছ করে দেয়।
১৩. মৃত্তিকা, মা আমার
স্নেহের মৃত্তিকা,
তিন বছর পর সাহস করে তোমাকে লিখতে বসেছি। বুকটা আজ খুব ভারি। তোমাদের কথা মনে করে, কেঁদেছি সারা দিন। আজ তোমার বাবার দশম মৃত্যুবার্ষিকী। সে চলে যাওয়ার পর, দু’ভাইবোন তোমরা সামান্য কারণে, যে নিষ্ঠুরতা দেখিয়ে আমাকে ত্যাগ করলে, তা আজো আমার বোধের অনধিগম্যই রয়ে গেল। সে সূত্র নিয়ে আমি তোমাদেরকে আজ দু’চার কথা লিখবো বলে এতদিনের সঞ্চিত সাহস বুকে নিয়ে বসেছি।
তোমরা কেউ বুঝতে চাইলে না, কি যন্ত্রণায় আমি বাধ্য হয়েছিলাম তোমার বাবার মৃত্যুর দীর্ঘদিন পর কামালকে বিয়ে করতে। যেজন্যে আজ তোমাদের সঙ্গে আমার এই অকারণ ভুল বোঝাবুঝি। মৃত্তিকা, আমি জানতাম, উন্নত দেশে গেলে মানুষের চিন্তা শক্তিও উন্নত হয়, হয় উদার। কিন্তু তুমি বিদেশে থাকলেও আমার দুঃখ যে, তোমার বেলায় সে কথাটি আমি ঠিক বলতে পারিনি। সোহেলের কথা না হয় ছেড়েই দিলাম। কিন্তু মা, তুমি তো পশ্চিমে রয়েছে অনেক বছর। তাহলে তোমার মনে কেন আজো এই সঙ্কীর্ণতা! কেন এই কষ্ট, এত পুঞ্জীভূত অভিমানের মেঘ! তুমি কেন বুঝতে চেষ্টা করলে না–ব্যক্তিজীবনে নিঃসঙ্গতার বোঝা কত ভারি। তুমি যেখানে আছ তুমি কি দেখোনি সেখানে জীবন কতটা রঙধনু রঙে রাঙানো!
প্রথমেই বলে নেয়া ভালো, তোমার বাবাকে আমি কোনও রকমেই ভুলে যাইনি। ভুলে যাওয়ার কথাও নয়। তাকে আমি ভালোবাসি, সম্মান করি। এবং তার সমানে সমানে কাউকে দাঁড় করানোর মতো স্পর্ধা আমার নেই। কোনদিন হবে বলেও মনে করি না। সুজন আজও আমার প্রাণ। সেই ছোটবেলায় তাকে পেয়েছিলাম খেলার সাথির মতো। কিন্তু কালব্যাধি এতই দুরারোগ্য হলো যে লিভারের ক্যান্সার তাকে তার জীবনের সবচেয়ে সুন্দরতম কিন্তু বড় অসময়ে নিয়ে গেল। আর সুজন চলে যাওয়ার পর তোমাদের নিয়ে আমি হয়ে পড়লাম সম্পূর্ণ একা। দুঃখেকষ্টে ভারি একা। তার মৃত্যুর পরপরই, তোমরা দুই ভাইবোন ঘুমের মধ্যে প্রলাপ বকার মতো প্রায়ই কেঁদে উঠে বলতে বাবা কই! বাবা কখন আসবে? বলতাম, হ্যাঁ, বাবা ফিরে আসবে। তোমরা এখন ঘুমোও। তোমরা, বিশেষ করে তুমি বলতে, সত্যি বলছো তো! আবার মিথ্যে না তো? তোমাকে বুকে নিয়ে কতদিন যে মিথ্যে বলেছি আজ সেসব আর মনে নেই। মা, আমি ঘুমোই। আব্ব এলে ডেকে দিও। এসব যে কত কঠিন কাজ ছিল মা-মণি সে কি করে বোঝাব তোমাকে।
