যাদের অন্তরে সুখ নেই, জন্ম থেকেই যারা সর্বক্ষণ দগ্ধ, তারা পৃথিবীর সুখ দেখতে নারাজ। তুমিও তাদেরই একজন। আজ আমার কষ্ট শেষ। তোমার শুরু। যারা জগৎটিকে দেখতে পায় অন্তের বদলে-অনন্ত, সুখ তাদেরই জন্যে রক্ষিত। আমি সেই অর্থে-সুখী। বিত্ত-বৈভব-সন্তান ও সংসার তোমার চোখে তার যে অর্থ, আমার চোখে তা এক নয়। আমি সবখানেই অনন্ত দেখতে পাই। তলের জায়গায়, অতল। আমার কাছে জগৎটা অনেক বড়। সমস্ত পৃথিবীটাই আমার সংসার। যেসব ছেড়ে দিতে পারে, তাকে আর কি দিয়ে অসুখী করবে! তোমার বিলাসিতার শিকার, সংসারের খাঁচা খুলে পালিয়ে গেছে।
তোমার চত্বর ছেড়ে, আজ আমিও মুক্ত। স্ত্রীর পত্রে’র মৃণালের মতো আমিও আর তোমার ঐ নরকের গলিতে ফিরছি না। এমনকি প্রিতুর জন্যেও না। আমি জানি, আমি কত নিষ্ঠুর মা, যে তার মেয়েকে ফেলে চলে যেতে পারে। কিন্তু কোন পরিস্থিতির সম্মুখীন হলে একজন মা এই কাজটি করতে পারে ভেবে দেখছো কখনও? হ্যাঁ, আমি সেই পরিস্থিতিরই শিকার যেখানে বাধ্য হয়ে শক্তি সঞ্চয় করতে হয়। নিজের বোধের মৃত্যু ঠেকাতে, কোলের আদরিনীকেও সাময়িক ছাড় দিতে হয়। সে আমার। চিরদিনের জন্যে আমার। সে ভরে আছে আমার বোধ-হৃদয় আর মনে। আমার সকল পৃথিবীটাই প্রিতু আর প্রিতুময়। যেখান থেকে কেউ তাকে কেড়ে নিতে পারে না। এমনকি তুমিও না। প্রিতু আজ প্রায় প্রাপ্তবয়স্কা। এখান থেকে সে স্বাধীন। এতকাল তুমি তাকে মা ছাড়া করে রেখেছিলে। তাই আজ এই চিঠি লেখা। আর নয়। এবার ফেরার সময়। মায়ের কাছে মেয়ে। জগতের ভ্রান্তির কাছে, সত্যের।
–ইতি,
প্রিতুর মা।
১২. পরিবাদ বা স্ক্যান্ডাল
ক. কেউ জন্মায় নারী, কেউ পুরুষ হয়ে। কিন্তু তা সত্ত্বেও মানুষের ব্যক্তিগত যৌন অভ্যাস আর তার বাহ্যিক লিঙ্গ পরিচয়, দুটো সবসময় এক হয় না। পুরুষ এবং নারীর সত্যিকারের যৌন অভ্যাস নিয়ে আজ যথেষ্ট ঝড় বইছে বিশ্বময়। বিশেষ করে আমেরিকা আর ইয়োরোপে। সেসব দেশেও মানুষের যৌন অভ্যাস এখন আর কোনও রাখঢাকের ব্যাপার নয়। পুরুষ। অথচ সে পুরুষ নয়! নারীর প্রতি তার আকর্ষণ নেই। তার আকর্ষণ, পুরুষ। কিংবা নারী। সে নারী নয়! পুরুষের বদলে তার আকর্ষণ, নারী। যাকে বলা হয় সমকামিতা। কিংবা একজন নারী বা পুরুষ, সে আকর্ষণ অনুভব করে, নারী-পুরুষ দু’জনেরই প্রতি। যাকে বলে, উভকামিতা। এই দু’ধরনের অনুভূতি নিয়ে জন্মানো মানুষ, সারা বিশ্ব জুড়েই রয়েছে। নরনারীর স্বাভাবিক যৌনজীবনের মতোই এদের জীবন। একে অস্বীকার। করার কোনও উপায় নেই। করলে ব্যক্তির জন্যে তা চরম দৈহিক ও মানসিক শাস্তির নামান্তর হয়ে উঠবে। তা সত্ত্বেও আমরা তা মেনে নিতে পারি না। আজকাল প্রচুর সমকামীদের বিয়ে হচ্ছে। তারা নিয়মিত ঘর-সংসার করছে। তবে, সমকামী আর উভকামিতার বিষয়টা কোনও পরিবারের জন্যেই সুসংবাদ নয় এবং নিঃসন্দেহে যে-কোনও বাবা-মায়ের জন্য তা হৃদয়বিদারক। কিন্তু এই অনুভূতি নিয়ে জন্মানো মানুষটির কষ্টও কি কম। বাবা কাঁদে। মা কাঁদে। বোঝায়। কিন্তু তার অনুভূতি আলাদা। তার ভিন্নতাকে সাধারণভাবে আমাদের পক্ষেও গ্রহণ করা দুরূহ। তবে স্বস্তির সংবাদ এই যে, পশ্চিমে বিষয়টি, রাজনৈতিক ও সামাজিক দিক দিয়ে দ্রুত প্রতিষ্ঠা পাচ্ছে। সেসব দেশে সমকামীরা বিয়ে, পালক সন্তান, সম্পত্তি সবকিছুতেই সমান অধিকার পেতে শুরু করেছে। কিন্তু পূর্বে অধিকাংশ দেশেই বিষয়টি যেমন ধর্ম-বিরুদ্ধ, তেমনি সমাজ-বিরুদ্ধ। কিন্তু তা সত্ত্বেও একে রোধ করা যাচ্ছে না।
সমকামীরা আমাদেরই আশপাশে। ছোটবেলায় হঠাৎ দেখেছি, গলির ভেতরে, ঘরের পেছনে, হঠাৎ নিরু কাকা আর নিমাই, তুলি আর মালতী, মিজান-শমসের মিজান-মালেকা। ওদেরকে দেখেছি অন্যরকম ব্যবহার করতে। হঠাৎ হয়তো ওদেরকে দেখেছি জড়িয়ে চুমু খেতে। তখন ঠিক বুঝতে পারিনি। তবে আজ বুঝি যে ওরা আসলে সম বা উভকামী।
সমকামী বা উভকামীদের হাবভাব চলাফেরা কথা বলার ভঙ্গি সব অন্যরকম। কিন্তু আমাদের রক্ষণশীল সমাজে এই নিগূঢ় সত্যকে ওদের লুকিয়ে চলতে হয়। এবং এই অনুভূতি যাদের আছে তাদের সঙ্গে অন্য লিঙ্গের মানুষের বিয়ে হলে সেই বিয়ে সবসময় টেকেও না। আর টিকলেও সুখের হয় না। আবার দেখা গ্যাছে কখনো কখনো অনেকেরই বিয়ের পাশাপাশিও গোপন জীবন চলছে। ঘরের বৌ অসুখী, অতৃপ্ত। স্বামীর এই গোপন অভ্যাস, সে জানে না। নিজের সমস্যাগুলো ঠিকমতো মোকাবিলা না করতে পারার ফলে স্বামী ও স্ত্রী উভয়ের যৌনজীবনের সঙ্কট, মধ্য বয়সে পৌঁছে আরও অনেক সমস্যায় রূপ নিতে পারে। শরীরকে অস্বীকার করতে করতে, মানুষ একসময় বাধ্য হয় পরাজিত হতে, অনুভূতি এবং অভ্যাসের কাছে। শরীরের প্রতিবাদের মুখে, প্রকাশ হয়ে যায়–গোপন পরিচয়। যা সে একা বহন করে করে শেষ হয়ে যাচ্ছে। একসময় জানাজানি হয়ে যায় সেই অজানা।
অনেকেই সম বা উভয়কামিতার বিষয়টি নিজেরাও ঠিক বুঝতে পারে না, বিয়ে না হওয়া অবধি। বিয়ের পরে দ্বিতীয় শরীরের প্রতি অনীহা থেকে সমস্যার প্রথম আবিষ্কার। এবং যতই সে ভাবে ঠিক হয়ে যাবে বা সেরে যাবে, কখনোই তা ঠিকও হয় না, বা সেরেও যায় না। সম বা উভয়কামিতা দুটোই সত্য। সত্য, যা সত্য। সত্যকে অস্বীকার করা যাবে না। কিছুতেই না। কারণ ওরাও ভালোবাসে, ঠিক আপনার এবং আমার মতোই। যেমন ভালোবাসে স্বামী ও স্ত্রী। সম বা উভকামিতা, এক ধরনের প্রবৃত্তি। ক্ষুধা ক্ষুধাই।
