এদিকে প্রবীণদাকে কেন্দ্র করে তোমার সঙ্গে আমার মানসিক দূরত্ব দ্রুত বাড়তে থাকে। একটা অকারণ জেদ, প্রতিশোধের আগুন, অধিকারবোধ তখন থেকে আমার মনে তীব্রভাবে কাজ করতে শুরু করলো। দেখা হলেই ঘৃণা। দেখা হলেই এড়ানোর প্রতিযোগিতা। চললো তাচ্ছিল্যের ম্যারাথন।
বাতিকগ্রস্ত তুমি সব পুরুষকেই সন্দেহ করতে। কথা বলতে দেখলে, কোথাও একসঙ্গে বসলেই। সন্দেহ যা একটা অসুস্থতা। একটা নরক। এই নরক পুরুষের নিজস্ব। আর তুমি হলে সেখানকার স্থায়ী বাসিন্দা। তোমাদের ধারণা কথা বললেই মেয়েরা পুরুষের সঙ্গে শোয়। অসীমকে তুমি সবচেয়ে বেশি সন্দেহ করতে। ভাবতে, ওর সঙ্গে আমার শুধু প্রেমই নয়, দৈহিক সম্পর্কও আছে। ভাবতে সাহিত্য-টাহিত্য কিছু নয়। সব, ছুতো। তবে হ্যাঁ, অসীম আমার বিশেষ বন্ধু। আমার সবচেয়ে বেশি মানসিক যোগাযোগ ওরই সঙ্গে। তোমার সঙ্গেই বেশি করে আমার সেই যোগাযোগ থাকার কথা। কিন্তু শূন্যতা মেটাতে তোমার স্থান পূরণ করলো অসীম। অসীমকেও তুমি একদিন তাড়িয়ে দিলে। আর সেইসঙ্গে হৃদয়টা ওর জন্যে ব্যথায় গুমরে উঠলো। শুধু সন্দেহ আর সন্দেহ নিয়ে ভরে গেল তোমার পৃথিবীটা।
দেশে ফিরে যাবো সেই প্রস্তুতিই নিচ্ছি। এদিকে ডিভোর্সের কাজ চলছে। এর মধ্যে জীবনের আরেকটা মোড় হঠাৎ ঘুরে গেল। সেবার কবি-সাহিত্যিকদের একটা সম্মেলন হবে আপ স্টেইটে। অসীম ফোন করে বললো, আমাকে সেখানে যেতে হবে। অসীমরা দল বেঁধে যাচ্ছে। শুনে মনটা খুশিতে নেচে উঠলো। গেলাম আমিও। আর সেখানেই কখন যেন তোমারই সন্দেহ আর গুমরে ওঠা হৃদয়, ভালোবাসা হয়ে ফুটে উঠলো। হলো, অসীমের প্রতি অসীম ভালোবাসা।
আপ স্টেইটের পাহাড়ের কোলে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দিলাম, নতুন অভিজ্ঞতার ঝুলিভর্তি অসীমের ভালোবাসায়। আমার ভালোবাসাহীন শুকনো হৃদয় আর দীর্ঘদিনের বিবর্ণ ঘাসে যেন অনন্ত জলধারা গড়িয়ে পড়তে লাগলো। ফিরে এলাম, তোমারই সংসারে অন্য মানুষের জন্যে, অন্য অনুভূতি হৃদয়ে নিয়ে।
প্রিতুর তখন পাঁচ বছর। আর আমার বয়সটা মেয়েদের জীবনে নানারকম পরিবর্তন আর জটিলতার সময়ে। তোমার সন্দেহকেই শেষ পর্যন্ত সত্যি করে তুলোম। পরকীয়া। যা আগে কোনওদিন আমার ভাবনায় উদয় হয়নি। অসীম আমাকে শূন্যতার যন্ত্রণা থেকে সাময়িক মুক্তি দিয়েছিল। পরকীয়া, আমার দুঃসময়ে আমাকে বাঁচায়নিই শুধু, মুক্তিও দিয়েছিল সীমাহীন যন্ত্রণা থেকে।
বন্ধন ছিন্ন করার প্রস্তুতি প্রায় শেষ। এবং সেই চুলোয় আরো আগুন জ্বালাতে হঠাৎ উপস্থিত হলো রমা। যেন ভূত দেখার মতো। কি করে যেন ভিসা জুটিয়ে ওরা দু’জনেই চলে এলো। আর ওদের দেখেই তুমি উঠলে জ্বলে। হলো ঝগড়া। আমাকে সেদিন। জখম করেছিলে বেল্ট দিয়ে পিটিয়ে। তোমার ভাগ্য ভালো-যে, প্রিতুর জন্ম হয়েছিল। তাই ওর কষ্ট হবে ভেবে পুলিশ ডাকতে চাইলেও পারিনি।
তুমি ভুলে গিয়েছিলে যে, এই দেশটা সম-অধিকারের। ভেবেছিলে যে মানা না মানার ক্ষমতা আমারও ছিল! তোমার মতো পশুর সঙ্গ দ্রুত ত্যাগ করতে হলে, প্রিতুকে সাময়িক হারাতে হবে। আমি তো সে সত্য মেনে নিয়েছি। সুতরাং আমার আবার ভয় কিসের? যুদ্ধ হবে, রণাঙ্গন তৈরি। রমাকে বললাম, কোথাও যাবি না। এ বাড়িতেই থাকবি যতদিন আমি আছি। এ নিয়ে হাঁকাহাঁকি পুলিশ ডাকাডাকি হলো। ঝগড়া, কান্না, চিৎকার। আমি রইলাম অনড় আমার অধিকারে। পুলিশই সেকথা বলেছিল। আর তুমি। ভয় পেলেও, জেদটাকেই অধিক তুলে ধরলে।
প্রস্তূতি খুব দ্রুত চলছে। এবং সেজন্যে আমি উকিলকে অতিরিক্ত কিছু অর্থও দিলাম। এ দেশের আইনে বলে, ছোট বাচ্চাকে নিয়ে দেশের বাইরে যাওয়া যাবে না। তোমারই জয় হলো। সে এক দৃশ্য! আমি সুটকেইস হাতে। তুমি প্রিতুকে কোলে করে। আমি বিদায় নিলাম তোমার সংসার থেকে। জেনে রেখো, মাতৃত্ব কেড়ে নেয়া যায় না। যেমন যায় না পিতৃত্ব। প্রিতু, আমাদের দু’জনের। আমি জানি প্রিতু ফিরে আসবে আমার কাছে, আসতে বাধ্য। আজ না হোক, কাল। কথা আর না বাড়িয়ে, অপেক্ষমাণ ট্যাক্সিতে বসে চলে এলাম রমাকে নিয়ে, বন্ধুর বাড়িতে। তারপর সেখান থেকে-এখানে।
পুরুষ, তোমরা সবই পারো। আমার মতো আধুনিক, শিক্ষিত মেয়েকেও তোমরা যখন ছাড়লে, তখন বিশ্বের হাজার হাজার সখিনারা তো কোন ছার! আমার মতো কর্মক্ষম একটি মানুষকেও ধরেবেঁধে তোমরা ঘরে বসিয়ে রেখেই শুধু নয়, তার দিকে ছুঁড়ে দিয়েছ ঘৃণিত সন্দেহের তীর। নিয়ত হেলাফেলা। মৌখিক আর শারীরিক অত্যাচার। আমায় ঠেলে দিয়েছো পরকীয়ায়। মধ্য বয়সে পৌঁছে আমার উপলব্ধি, মৃণালের উপলব্ধির সাথে দেখলাম হুবহু মিলে যাচ্ছে। যৌবনের সব পুঞ্জীভূত অবিচার, মধ্য বয়সে এসে আমাদেরকে বাধ্য করে তোমাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে। যা মৃণাল করেছিল শত বর্ষ আগে। কিন্তু দু’জনেরই সমস্যা শত বর্ষ আগে ও পরে, এক। কারণ, আমরা পাল্টালেও পাল্টাওনি তোমরা। মৃণালের চিঠিতে কবিগুরু একে কোনও সঙ্কট নামে চিহ্নিত করেননি, তবে আমি জানি মৃণাল আর আমার সমস্যা এক এবং অভিন্ন। অর্থাৎ উপলব্ধি জীবনের একটা নির্দিষ্ট বয়সে পৌঁছে দেয় একটা সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা। এবং মৃণাল এবং আমি দু’জনই তা অর্জন করেছি, সাহসের সঙ্গে। নয় কী?
