খাদু সবচেয়ে অভিভূত হয় ভেবে যে এক সংসারের বাপ ছেলে মেয়ে পুরুষ সবাই মিলে এমন চমৎকার সার্কাস দেখাচ্ছে। ভেতরে ঢুকে দলের সবাইকে দেখার পর এতে আর তার সন্দেহের লেশটুকু নেই। চেহারার মিল নয় না-ই ধরতে পারল সে ওদের, বয়স কখনো সবার খাপ খায় এমনভাবে এক পরিবারের না হলে-বুড়ো একজন বাপ, মাঝবয়সী, জোয়ান, কিশোর আর ছেলেবয়সী এই চার ছেলে; তিন-চার বছর বয়সের ফারাকের দুটি জোয়ান আর ন-দশ বছরের একটি, এই তিন মেয়ে। মা বুঝি নেই ওদের। বৌ মরেছে বুড়ো বেচারার। আহা।
জোয়ান মেয়ে দুটির দুজনেই মেয়ে, না একজন ছেলের বৌ আর একজন মেয়ে কিংবা দুজনেই ছেলের বৌ, এই একটু খটকা থাকে খাদুর। সিঁদুরও দেয় না যে আন্দাজ করে নেবে। কালো মেয়েটা এদের সঙ্গে কেন, সেও আরেক ধাঁধা খাদুর।
আমাগো মাইয়াটা কী করে চীনাগো লগে? সে শুধোয় সঙ্গীকে।
ভাড়া করছে।
এরা নাকি সাধারণত অল্প বয়সে চুরি-করা অথবা অনাথা মেয়ে, সংসারে যাদের দেখবার শুনবার কেউ নেই। বড় হলে কাউকে দিয়ে করানো হয় দেহের ব্যবসা, কেউ শেখে চুরিচামারির কায়দা, কেউ শেখে কসরত। এ মেয়েটা হয়তো ভাড়াও খাটছে, নতুন খেলাও শিখছে চীনাদের কাছে, পরে আরো দাম বাড়বে। অবাক হয়ে শোনে খাদু। বিরাট এ জগৎ সংসার, অদ্ভুত কাণ্ডকারখানার সীমা নেই তাতে। কোথাকার এই বিদেশি পরিবার সার্কাস দেখিয়ে পয়সা রোজগার করছে, কোথায় কার ঘরে জন্মে আজ ওদের সঙ্গে খেলা দেখাচ্ছে এই কালো মেয়েটা। এক দুর্বোধ্য বিস্ময়কর অনুভূতিতে বুকটা তার কেমন করে, ঘুরিয়ে ফিরিয়ে সে ভাবে, মানুষ কী যে করে সংসারে আর কী যে করে না!
নাগরদোলায় বুক-শিরশির-করা সুখটা তিন-চার পাকের বেশি সয় না খাদুর, কাতর হয়ে বলে, নামুম। থামান যায় না?
যায় না?
জোরে হাঁক দিয়ে নাগরদোলা থামাতে বলে লোকটি, যেন হুকুম দেয়। আর এমন আশ্চর্য, তার হুকুমে প্রায় সঙ্গে সঙ্গে থামতে আরম্ভ করে দোলা। পাশ থেকে উঠে লোকটি আগে নামতে গেলে খাদুর খেয়াল হয়, লজ্জাশরম ভুলে দুহাতে কীভাবে ওকে সে আঁকড়ে ধরেছে।
ডর করে নাকি?
না। খাদু জোর দিয়ে বলে, গা গুলায়।
মেলায় মানুষ কমতে শুরু করেছে। বিকালে মানুষের জোয়ার এসেছিল, তাতে ধরেছে ভাটার টান। মেলা আর ভালো লাগে না, শ্রান্তি বোধ করে খাদু। মেলায় ছড়ানো নিজেকে এবার গুটিয়ে নিয়ে বিশ্রাম করতে ইচ্ছা হয়। ফিরে গেলে ঘ্যানঘ্যান। করবে দত্তগিন্নি, কৈফিয়ত চাইবে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে। তারপর দত্তবাবুর বুড়ি মায়ের ঘুপচি ঘরটির মেঝেতে বিছানা বিছিয়ে শোয়া। সারারাত বুড়ি কাশবে, বার বার উঠবে। ভাবলেও মনটা বিষণ্ণ হয়ে যায় খাদুর।
কিন্তু বাড়ি সে যে যাবে, বিশ্রাম সে যে করবে, সে তো এতক্ষণের সাথীটি রেহাই দিলে তবেই? এবার সময় হল ওর মতলব হাসিলের। বেশ ভালো করেই জড়িয়ে জড়িয়ে ফাঁদে ফেলেছে তাকে। এতক্ষণ ভুলিয়ে ভালিয়ে বাগিয়েছে, এবার কোন। ভয়ংকর স্থানে নিয়ে যাবে কে জানে, যা খুশি করবে তাকে নিয়ে, হয়তো ছেড়ে দেবে দলের খুনে গুণ্ডাদের হাতে, হয়তো শেষরাতে গলাটা কেটে ফাঁক করে ভাসিয়ে দেবে খালে। বুকটা ঢিপঢিপ করে খাদুর। কেমন যেন চুপচাপ হয়ে গেছে লোকটা কিছুক্ষণ থেকে, বার বার চোখ বুলাচ্ছে তার পা থেকে মাথা অবধি। গায়ে কাঁটা দেয় খাদুর।
যাইগা অখন রাইত হইছে। সে বলে ভয়ে ভয়ে।
যাইবা? রাইত হয় নাই বেশি। ক্ষুব্ধ চিন্তিতভাবে লোকটা খাদুর নতুন ভাবসাব লক্ষ্য করে, চলো যাই, দিয়া আসি তোমারে। কলাপাড়া নন্দ লেন কইলা না?
আমি যাইতে পারুম। ক্ষীণস্বরে খাদু বলে। পারবা না ক্যান?
বাড়িটা চিনা আসুম, বুঝলা না?
বোঝে না? সব বোঝে খাদু। চলুক সাথে, বড় রাস্তা ধরে সে যাবে, রাস্তায় এখন গাড়ি ঘোড়া লোকজনের ভিড়। পাড়ায় গিয়ে নির্জন গলিতে ঢুকবে, কিন্তু পাড়ার মধ্যে তার ভয়টা কী, লোকজন জেগেই আছে সব বাড়িতে এখন।
কী কিনা দিমু কও।
তিণ্যটি না।
তোমার খালি না আর না। লোকটা বলে বেজার হয়ে।
কংক্রিটের পুলের গোড়ায় বড় রাস্তার পাড়ে লোকটা রিকশা ডেকে বসে একটা, খাদুকে চমকে আর ভড়কে দিয়ে।
না, না, রিকশা লাগব না।
লাগব। ধমকে দিয়ে বলে এবার লোকটা, সব কথায় না না কর ক্যান? উইঠা বসো রিকশায়, কও তো হাইটা যামুনে আমি লগে।
খাদু কিছু বলে না, কী আর বলবে। লোকটা তার পাশে উঠে বসে। আংটিপরা হাতে একবার হাত বুলিয়ে দেয়, ধমক দেবার দোষ কাটিয়ে সান্ত্বনা দিতে। ঘেমে জল হয়ে গেছে খাদুর গা তখন, হাত-পা যেন অবশ হয়ে এসেছে।
রিকশা চলে ঘণ্টা বাজিয়ে, চলতে চলতে লোকটা হঠাৎ বলে রিকশাওয়ালাকে, ডাইনে যাও।
না, না, বড় রাস্তায় চলুক।
এইটা রাস্তা না?
রিকশা ঢোকে ডাইনের রাস্তায়। এটা সোজা পথ কলাপাড়া যাবার খাদু জানে, কিন্তু বড় রাস্তা ছেড়ে রিকশা যখন ঢুকেছে এই গলিতে তখনি খাদু জেনেছে কলাপাড়ায় নন্দ লেনে দত্তবাড়িতে আর সে পৌঁছবে কি না সন্দেহ। দু-পাশে ঘিঞ্জি বস্তি, টিন আর খোলার চালে জোছনা, সরু সরু গলিতে অন্ধকার। ওর মধ্যে কোথায় যেন জোরালো হল্লা চলেছে, মেয়েমানুষ গানও গাচ্ছে হারমোনিয়ামের সঙ্গে! এর মধ্যে নিয়ে যাবে কি নোকটা তাকে? এ অঞ্চল পেরিয়ে রিকশা রাস্তায় বাঁক ঘুরলে খাদু একটু স্বস্তি পায়। এ অঞ্চলটা শান্ত, দু-পাশে কাঁচাপাকা বাড়িতে গেরস্ত, আধা-গেরস্তের বাস।
