কিন্তু খানিক এগিয়েই লোকটা থামতে বলে রিকশাওয়ালাকে। ঘনিষ্ঠ সুরে বলে, আমার ঘরখানা চিনাইয়া দেই তোমারে, কী কও?
পুরনো একটা পাকা গ্যারেজ ঘর, দরজা এখন তালাবন্ধ। এখানে সে থাকে, রাধে বাড়ে খায়, ঘুমোয়। পাশে গায়ে-গায়ে লাগানো টিনের চাল ও টিনের বেড়ার একটা ঘর, সামনে দোকানের মতো মস্ত দু-পাট কপাট, ওপরে-নিচে দুটো তালা সাঁটা। ওপরে একটা তেরাবাঁকা সাইনবোর্ড, দু-পাশে সাইকেলের দুটো পুরনো টায়ার ঝুলছে। এটা তার সাইকেল মেরামতি দোকানদামোদর সাইকেল ওয়ার্কস।
নাম কই নাই তোমারে? আমার নাম দামোদর।
রিকশার জোয়াল নামিয়ে রিকশাওয়ালা দাঁড়িয়ে আছে তাদের নামবার অপেক্ষায়। শক্ত করে পাশটা চেপে ধরে ঝোঁক ঠেকিয়ে খাদু কাঠ হয়ে বসে থাকে।
নামবা না?
না। তুমি নামো।
চাঁদের আলোয় পথের আলোয় বেশ দেখা যায় মুখে যেন তপ্ত রাগের ছাকা লেগেছে দামোদরের। একহাতে সে খাদুর আংটিপরা হাতের কব্জি চেপে ধরে, এত জোরে ধরে যেন খেয়াল নেই ওটা মেয়েছেলের নরম হাত, হাড় ভেঙে যেতে পারে মট করে, আরেক হাতে সে মুঠো করে ধরে খাদুর বুকের কাপড় শেমিজ।
মারো। আমারে মাইরা ফেলাও। খাদু কেঁদে ফেলে হুস করে, জোরে নয়, চেপেচুপে, কহাত দূরে রিকশাওয়ালাও টের পায় কি না পায়! আগে থেকে সে যেন তৈরি হয়েই ছিল এমনিভাবে কাঁদবার জন্য।
দামোদর ভড়কে গিয়ে বুকের কাপড় হাতের কব্জি ছেড়ে দেয় তৎক্ষণাৎ। থবনে গিয়ে গুম হয়ে থাকে কয়েক লহমা। তারপর রিকশাওয়ালাকে চলতে বলে কলাপাড়ার দিকে।
রিকশাওয়ালা চলতে আরম্ভ করলে খাদুকে বলে, ব্যারাম স্যারাম নি আছে মাথার?
সে রাস্তা থেকে বড় রাস্তায় পড়ে রিকশা, আবার ইটের রাস্তায় বাঁক নেয় শহরতলির শান্ত নিঝুম উঠতি দ্রপাড়ার এলাকায়। মাঠ, পুকুর বাগানের ফাঁকে ফাঁকে ছড়ানো নতুন বাড়ি, ছোট সীমানায় ঠাসা গরিবের পুরনো বস্তি। শরীর-জুড়ানো হাওয়া বইছে, অবাধে, শোনা যাচ্ছে ঝিঁঝির ডাক, কোনো বাড়ির ছাদ থেকে ভেসে আসা বাঁশির বাবুয়ানি মিহি সুর।
আকাশে মুখ তুলে চাঁদ দেখতে হয় না, চারদিকে চাঁদের আলো চোখের সামনে ছড়ানো।
নন্দ লেনের মোড়ে ঘন তেঁতুলগাছের ছায়া। খাদু দাঁড়াতে বলে রিকশাওয়ালাকে। তোমার লগে দেখলে বাড়ির লোক কী কইব? আমি নামি।
নামো।
খাদু রিকশায় বসে থেকেই হাত বাড়িয়ে দত্তবাবুর বাড়ির হদিস তাকে বাৎলে দেয়, বলে, ডাইনা দিকে তিনখান বাড়ির পরের বাড়িখান, দোতলা বাড়ি। দেইখাই চিনবা।
বাড়ি চিনতে হাঙ্গামা কী। দামোদর বলে উদাস গলায়, নন্দ লেনে দত্তবাবুর বাড়ি খুঁইজা নিতে পারতাম না?
ফুরফুরে হাওয়ায় তেঁতুলগাছের ছায়া ঘেঁষে জোছনায় দাঁড়িয়ে খাদু যেন চোখের সামনে দেখতে পায় দত্তবাড়ির অন্তঃপুর, খোকার কান্নায় স্বামীর পাশে শুতে দেরি হচ্ছে বলে রেগে গজর গজর করে শাপছে তাকে, মাছের মতো মরা চোখে চেয়ে দেখছে ঘুমকাতুরে গাল-চুপসানো দত্তবাবু, নিজের ঘরে চৌকিতে কাথার বিছানায় বসে দত্তবাবুর বুড়ি মা কেশে চলেছে খক খক করে আর মেঝেতে শুয়ে খাদু ঝি এপাশ ওপাশ করছে অজানা কষ্টে। আজ রাতে কব্জিটা টন টন করবে।
হাতটা মুচরাইয়া দিছ একেবারে, ব্যথা জানায়। আহত কব্জি তুলে ধরে খাদু তাতে অন্য হাতের তালু ঘষে আস্তে আস্তে।
ষাইট, সোনা ষাইট। দামোদর বলে ব্যঙ্গ করে, কবিরাজি ত্যাল আইনা লাগাইও, মাথায়ও মাইখো ঘইষা ঘইষা।
লোক আসতে দেখে খাদু তেঁতুলগাছের ছায়ায় পিছিয়ে যায়। রিকশা আর গাছের ছায়ায় তার আবছা মূর্তির দিকে চাইতে চাইতে মানুষটা চলে গেলে এগিয়ে আসে। রিকশাওয়ালা তখন জোয়াল তুলে ধরেছে রিকশার।
আসি গো ঠাইরান। বলে খাদুর কাছে বিদায় নিয়ে দামোদর রিকশাকে বলে, যাও জোরসে চলো। বকশিশ দিমু।
খাদু বলে শোনো, শুনছ? একটা কথা ভাবতেছিলাম।
রিকশা থেকে ঝুঁকে মুখ বাড়িয়ে দেয় দামোদর।
খাদু বলে, তুমি তো বাড়ি চিনা গেলা আমার। কই দিয়া ঘুরাইয়া ফিরাইয়া আনলা আমারে, তোমার ঘর চিনা নিতে পারুম কি না ভাবি।
কী করবা তবে? দামোদর জিজ্ঞাসা করে ভয়ে উৎকণ্ঠায় গলা কাঁপিয়ে।
গিয়া দেইখা চিনা আসুম? খাদু বলে প্রায় অস্ফুট স্বরে। দামোদর স্পষ্ট শুনতে পায় প্রত্যেকটি কথা। রাসপূর্ণিমার বিদ্রি রাত্রি হলেও সেখানে তাদের আশপাশে আর তো কোনো শব্দ ছিল না।
রোমান্স
কলসি কাঁখে পাতলা ছিপছিপে একটি বৌ বেগুনক্ষেতের পাশ দিয়ে বাড়ি ফিরছিল। কলসির ভারে একটু সে বাঁকা হয়ে পড়েছে। পিতলের প্রকাণ্ড কলসি, মাজা ঘষা চকচকে। বৌটির পরনের কাপড়খানি ভেজা, এখানে ওখানে গায়ে এঁটে গেছে, লটপট করছে। গড়ন পাতলা হলেও স্বাস্থ্য তার খুব ভালো। গায়ে রীতিমতো জোর না থাকলে অতবড় কলসির ভারে কোমর তার মচকে যেতে পারত।
সূর্য এখন প্রায় মাথার উপর। রোদের তাপে পায়েচলা সরু পথটির পাশে ঘাসে-ঢাকা মাটি পর্যন্ত তেতে গেছে। ভিজে গামছা ভাঁজ করে বৌটি মাথায় বসিয়েছে।
বেগুনক্ষেতের পরে ছোটখাটো আম-কাঁঠালের বাগান। গাছে গাছে বাগানটি জমজমাট। কিন্তু কেমন যেন শুকনো নিষ্ফল চেহারা গাছগুলোর, কয়েকটি গাছে শুধু কাঁচাপাকা দু-চারটি আম ঝুলছে। বাগানের ওপাশে টিনের চাল আর দরমার বেড়ার বাড়ি আছে টের পাওয়া যায়, গাছের ফাঁকে ভালো করে চোখ পড়ে না। বাকি তিনদিকে দূর বিস্তৃত মাঠ আর ক্ষেত, এখানে-ওখানে বাড়িঘর গাছপালার ছোট ছোট চাপড়া বসানো। বেগুনক্ষেতের চারদিক নির্জন, দিনে-রাতে সবসময় কারো কারো এখানে কমবেশি গা ছমছম করে।
